বুধবার, ৭ মার্চ, ২০১২

মন্তব্য প্রতিবেদন : সাগর-রুনিকে দ্বিতীয়বার খুন

ফ্যাসিবাদী সরকারের চিরাচরিত স্বভাব অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার গত তিন বছরে গণমাধ্যমকে তার অন্যতম প্রতিপক্ষরূপে বিবেচনা করেছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করার হেন অপচেষ্টা নেই, যা ক্ষমতাসীন মহল এই সময়ের মধ্যে গ্রহণ করেনি। বিজ্ঞাপন বন্ধ, টেলিভিশনে কালো তালিকা প্রণয়ন, সরকারি দলের চেলা-চামুণ্ডাদের হুমকি—এসব পন্থা মাত্রাভেদে সব সরকারই বিভিন্ন সময়ে স্বাধীন বাংলাদেশে ব্যবহার করেছে। তবে দিনবদলের সরকার যে ভিন্নমত দমনের জন্য অন্য প্রকারের ভয়ঙ্কর চণ্ডনীতি ব্যবহার করবে, সেটা বোঝা গিয়েছিল ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে দৈনিক আমার দেশ পত্রিকায় জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশের প্রতিক্রিয়া থেকে। পেশাদার কিংবা ‘চান্স’ নির্বিশেষে পত্রিকার সম্পাদকদের ধরে ধরে রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতনের বর্বর নজির সৃষ্টিতে বর্তমান ক্ষমতাসীন মহল সভ্যতা-ভব্যতা, রীতি-নীতি, আইন-কানুনের কোনোরকম তোয়াক্কা করেনি।
সত্তরোর্ধ্ব প্রবীণ পেশাদার সম্পাদক এবং নির্ভেজাল ভালোমানুষ দৈনিক সংগ্রামের আবুল আসাদের দুর্বল শরীরের দিকে তাকিয়েও পুলিশের অন্যায় ও আইন বহির্ভূত রিমান্ড আবেদন মঞ্জুর করতে ‘স্বাধীন’ আদালতের মধ্যে বিন্দুমাত্র দ্বিধা লক্ষ্য করা যায়নি! প্রথম আলোর প্রভাবশালী সম্পাদক মতিউর রহমানকে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারেক সিদ্দিকী রীতিমত সংবাদ সম্মেলন ডেকে যখন ইচ্ছা গ্রেফতারের হুমকি দিয়েছেন। মার্কিন দূতাবাসের সরাসরি হস্তক্ষেপে সেই বিশিষ্ট সুশীল(?) সম্পাদক আমার ও আসাদ ভাই-এর ভাগ্য বরণ করা থেকে সে যাত্রা বেঁচে গিয়েছিলেন। শীর্ষ কাগজের সম্পাদক একরামুল হককে রিমান্ডে নিয়ে তার পত্রিকা বন্ধ করতে বাধ্য করা হয়েছে। আমার বিষয় নিয়ে দেশে-বিদেশে এত বেশি আলোচনা হয়েছে যে, সেগুলোর পুনরুল্লেখ নিষ্প্রয়োজন। মোট কথা, পত্রিকা সম্পাদক নামক ইনস্টিটিউশনটিকে অমর্যাদা করা বর্তমান সরকারের আমলে ডাল-ভাতে পরিণত হয়েছে। অথচ ইন্টারন্যাশনাল প্রেস ইনস্টিউটের (আইপিআই) নির্বাহী পরিচালক আলিসন বেথেল ম্যাকেঞ্জি তার বাংলাদেশ সফরকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করতে গেলে আমাদের প্রধানমন্ত্রী কী অম্লান বদনেই না দাবি করলেন যে, তার আমলে নাকি সরকার কোনো সম্পাদকের বিরুদ্ধে কোনো মামলা দায়ের করেনি! সেদিন তিনি বলেছেন, যে মামলাগুলো হয়েছে বা হচ্ছে তার সবই সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিদের দায়েরকৃত মানহানি মামলা। প্রধানমন্ত্রীর আসনে থেকে অসত্য ভাষণ সেই আসনের জন্য যে বিশ্রী রকমের অমর্যাদাকর একথার সঙ্গে আশা করি, সব পাঠক একমত হবেন।
আমার বিরুদ্ধে দায়ের করা রেকর্ড সংখ্যক ৫৩টি মামলার মধ্যে অন্তত পাঁচটির বাদী সরকার নিজে এবং বাকি মামলাগুলোও সরকারের মন্ত্রী, এমপি ও সরকারি দলের নেতারা করেছেন। সরকারি অভিযোগের মধ্যে রয়েছে পুলিশের কর্তব্যকাজে বাধা, রাষ্ট্রদ্রোহ, ইসলামী জঙ্গিবাদে মদত দান, জালিয়াতি এবং বেশুমার ব্যক্তির মানহানি। আমাকে হয়তো ‘চান্স সম্পাদক’ বিবেচনা করেই আইপিআই’র নির্বাহী পরিচালকের সঙ্গে আলোচনাকালে প্রধানমন্ত্রী এসব মামলাকে ধর্তব্যের মধ্যেই আনেননি। কিন্তু প্রবীণ সম্পাদক আবুল আসাদকে গাড়ি পোড়ানোর অবিশ্বাস্য অভিযোগে মধ্যরাতে বাসা থেকে এলিট বাহিনী র্যাব কর্তৃক গ্রেফতার এবং পরে রিমান্ডে পাঠানোর বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর বেমালুম ভুলে যাওয়া বিস্ময়কর। অন্তত আবুল আসাদকে পেশাদার সম্পাদক মেনে না নেয়ার কোনো সুযোগ সম্ভবত মহাজোট নেত্রী শেখ হাসিনার নেই। বয়সে আবুল আসাদের চেয়েও প্রবীণ, মনের দিক দিয়ে অবশ্য চিরসবুজ সাংবাদিক, সম্পাদক শফিক রেহমানের বিরুদ্ধে দায়ের করা মানহানি মামলার বাদীর নাম আলহাজ্ব লায়ন মাওলানা মুহাম্মদ আবু বকর সিদ্দিক। ভদ্রলোক আওয়ামী লীগেরই অঙ্গসংগঠন আওয়ামী ওলামা লীগের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি।
শীর্ষ নিউজ ডট কমের সম্পাদক একরামুল হকের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা দায়ের করা হয়েছে তার পত্রিকায় একজন মন্ত্রীর দুর্নীতির খবর প্রকাশের পর। মামলা দায়েরের আগে শীর্ষ কাগজের সাংবাদিকদের অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড বাতিল করা হয়েছিল। চাঁদাবাজি মামলার ছুতো ধরেই তাকে রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতনের মুখে সাপ্তাহিক পত্রিকা এবং অনলাইন সংবাদমাধ্যম বন্ধ করতে বাধ্য করা হয়েছে। সুতরাং, সম্পাদকদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত প্রতিটি মানহানি কিংবা চাঁদাবাজি মামলার পেছনের কলকাঠি যে সরকারই নেড়েছে, এ নিয়ে জনমনে অন্তত কোনো সন্দেহ নেই। প্রধানমন্ত্রী অব্যাহতভাবে অসত্য দাবি করে যেতে পারেন, তবে দেশে-বিদেশে তার এসব কথা কেবল কৌতুকেরই সৃষ্টি করবে। তবে, এটা মানতে হবে যে রিমান্ডে নিয়ে পিটুনি দিলেও সরকার এখনো পর্যন্ত রাজধানীর কোনো পত্রিকা সম্পাদককে হত্যার মতো চরম পন্থা গ্রহণ করেনি। আমার ক্ষেত্রে ক্যান্টনমেন্ট থানায় একদল আততায়ী পাঠিয়েও অজানা কারণে নীতিনির্ধারকরা শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে গিয়েছিলেন। সেদিন আমার ভাগ্য সহায় হলেও সাগর এবং রুনি খুনিদের হাত থেকে রক্ষা পায়নি। এই তরুণ প্রতিশ্রুতিশীল সাংবাদিক দম্পতি তাদেরই শয়নকক্ষে ছুরিকাঘাতে নৃশংসভাবে নিহত হয়েছে। বাংলাদেশ একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হলে এবং শাসকশ্রেণীর মধ্যে সভ্যতার লেশমাত্র থাকলে এই কলঙ্কজনক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে গোটা সরকার না হলেও অন্তত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এতদিনে পদত্যাগ করতেন। পাঠক বলতে পারেন বাংলাদেশের মন্ত্রীদের কাছ থেকে এতটা বিবেকবোধ আশা করা একপ্রকার ইউটোপিয়া। উল্টো এ দেশে হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ ও বিচার দাবি করার অপরাধে প্রধানমন্ত্রী এবং আদালতের কাছ থেকে গণমাধ্যমের কর্মীদের তিরস্কার শুনতে হচ্ছে। সাগর-রুনি হত্যার রহস্য উন্মোচন প্রক্রিয়ায় প্রশাসনের প্রতিটি মহল প্রথমাবধি রহস্যময় আচরণ করে চলেছে। এই বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের রথী-মহারথীরা গত প্রায় চার সপ্তাহে কে কী বলেছেন, তার একটা তালিকা জনস্বার্থেই প্রস্তুত করেছি, যাতে ভবিষ্যতে বিপদ বুঝে এরা আগের দেয়া বক্তব্য বেমালুম অস্বীকার করতে না পারেন।
* প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
সরকারের পক্ষে কারও বেডরুমে গিয়ে পাহারা দেয়া সম্ভব নয়। সাগর-রুনি তাদের বেডরুমে মারা গেছে। আমরা কি মানুষের বেডরুমে বেডরুমে পুলিশ বসাতে পারব?
* স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন
১. ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সাগর ও রুনির হত্যাকারীদের খুঁজে বের করা হবে।
২. মিডিয়ার চাপেই ৪৮ ঘণ্টার কথা বলেছি, এটি কৌশলও ছিল।
৩. আপনারা অপেক্ষা করুন, যে কোনো মুহূর্তে সুখবর শুনতে পারবেন।
৪. সাংবাদিক দম্পতি হত্যা-মামলা প্রধানমন্ত্রী নিজেই মনিটর করছেন।
৫. তদন্ত এগিয়ে গেছে, তদন্ত কর্মকর্তারা অতি দ্রুত একটি ভালো ফল দেবেন।
৬. সাংবাদিক দম্পতি হত্যাকাণ্ডের সুরাহা হবেই।
* সংসদ উপনেতা সাজেদা চৌধুরী
সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যাকারীদের গ্রেফতারের জন্য প্রশাসনকে চাপ দিলে তারা ঘাবড়ে যেতে পারে।
* স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু
আইন-শৃঙ্খলা অবনতিসহ ঢাকায় সাংবাদিক সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জামায়াত-শিবির জড়িত রয়েছে।
* আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার
তদন্ত শেষ করতে না পারলেও প্রণিধানযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। খুব শিগগির আপনাদের এ ব্যাপারে ইতিবাচক অগ্রগতির কথা জানাতে পারব।
* ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার বেনজীর আহমেদ
তদন্তের কাজ ডেডলাইন দিয়ে হয় না।
* মানবাধিকার কমিশন চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান
সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনির হত্যার ব্যাপারে চাপ সৃষ্টি করলে তদন্ত ‘বিপথে’ যেতে পারে, তাড়াহুড়া করলে প্রকৃত অপরাধী ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সেক্ষেত্রে জজ মিয়া নাটকের পুনরাবৃত্তি হতে পারে।
* ডিসি ডিবি মনিরুল ইসলাম
হত্যাকাণ্ডের মোটিভ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
* প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ
সমাজে যারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চায়, বিঘ্ন করতে চায় সামাজিক জীবন তাদের দ্বারাই এমন ঘটনা ঘটানো সম্ভব।
* প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী (মিডিয়া) মাহবুবুল আলম শাকিল
আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকাকালে মেহেরুন রুনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে বিরোধী দলের সংবাদ কাভার করতেন। এজন্য প্রধানমন্ত্রী তাকে খুব স্নেহ করতেন।

সাগর-রুনির ভয়ঙ্কর হত্যার ঘটনাটিকে প্রশাসন প্রথমেই পরকীয়ার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত করার কৌশল গ্রহণ করে। জনমনে রুনি সম্পর্কে বিরূপ ধারণা দেয়ার লক্ষ্যে বিভিন্ন সরকারপন্থী পত্রিকায় সোত্সাহে তার চরিত্র হনন শুরু হয়। নিহত হওয়ার পূর্ব সপ্তাহে সে তার কোন ছেলেবন্ধুকে কতগুলো এসএমএস পাঠিয়েছে, মোবাইলে কতক্ষণ কথা বলেছে এসব কেচ্ছা-কাহিনী প্রকাশ পেতে থাকে সেইসব পত্র-পত্রিকায়। শুনেছি কাকের মাংস নাকি কাক খায় না। সাগর-রুনির ক্ষেত্রে দেখলাম একশ্রেণীর সাংবাদিক তাদের সহকর্মীদের মাংসভক্ষণ করতে যথেষ্ট আনন্দই পায়! রুচি বহির্ভূত এসব আদি রসাত্মক কাহিনী বিশেষ মহল থেকে আমাদের সাংবাদিককে গেলানোর চেষ্টা করা হলেও স্বাধীনতার কথা বলতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ আমার দেশ-কে বিভ্রান্ত করা সম্ভব হয়নি। আমরা মহান সাংবাদিকতা পেশার সত্যনিষ্ঠতার প্রতি অবিচল থেকে প্রশাসনের দলবাজ কর্মকর্তাদের তদন্ত ভিন্নপথে ঘোরানোর অপচেষ্টা সম্পর্কে পাঠককে আগাম সতর্ক করেছি। রুনি ও সাগরের ব্যক্তিগত জীবনে উঁকি দেয়ার পরিবর্তে হত্যার রহস্য উদঘাটনকেই আমার দেশ গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করেছে। হত্যা রহস্য উদঘাটনের দাবিতে সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে সর্বতোভাবে সমর্থন ও সহায়তা প্রদান করে গেছি। বিভিন্ন ব্লগে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করে অপ্রমাণিত বিভিন্ন ষড়যন্ত্র তত্ত্ব প্রকাশিত হলেও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার নীতিতে অবিচল থেকে আমরা সেগুলোকেও সযতনে পরিহার করেছি। ব্লগে প্রচারিত ষড়যন্ত্রের গল্পগুলোর সঙ্গে বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণ দেয়া থাকলে নির্দ্বিধায় আমার দেশ সেগুলো প্রকাশ করত। ভবিষ্যতে কোনো অনুসন্ধানী সাংবাদিক তথ্য-প্রমাণসহ সরকারের ওপর মহলের সেইসব ব্যক্তিদের এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার প্রমাণ দিতে পারলে অবশ্যই সেই কাহিনী প্রকাশ করা হবে।
এর মধ্যে সংবাদপত্র মালিকদের মধ্যকার এক ক্ষুদ্র সুশীল(?) গোষ্ঠীর এলিট সংগঠন নোয়াব এক বিবৃতি দিয়ে আমাদের হতবাক করেছে। সেই বিবৃতিতে তারা সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড নিয়ে কোনো অনুমাননির্ভর খবর না ছাপতে এবং দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে গণমাধ্যমের কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। আজব কাণ্ড! পত্রিকার মালিকগোষ্ঠী কাদের উদ্দেশ করে বিবৃতি দিচ্ছেন? তারা স্ব স্ব পত্রিকায় এ বিষয়ে বস্তুনিষ্ঠ সম্পাদকীয় নীতি গ্রহণ করলেই এই সমস্যার উদ্ভব হতো না। তাছাড়া এই বিবৃতির মাধ্যমে মালিকরা স্বীকার করে নিলেন যে, তাদের পত্রিকায় দায়িত্বহীন আচরণ করা হয় এবং সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড ব্যতীত অন্যান্য সংবাদ পরিবেশনের বেলায় দায়িত্বশীলতার কোনো প্রয়োজন নেই। আরও বিস্ময়ের ব্যাপার হলো অনুমাননির্ভর সংবাদ ছাপা থেকে বিরত থাকার আহ্বান সংবলিত বিবৃতি দেয়া সত্ত্বেও গোয়েন্দা সংস্থা দ্বারা সরবরাহকৃত উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, অপ্রমাণিত সংবাদ নোয়াব-এর অন্তর্ভুক্ত পত্রিকাতেই নিয়মিত ছাপা হয়েছে এবং হচ্ছে। কথায় ও কাজে বিপরীতধর্মী আচরণ কেবল রাজনীতিকদের মধ্যে নয়, দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের জাতীয় চরিত্রে পরিণত হয়েছে।
সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডে সর্বশেষ নাটকীয়তা আনয়নে মহামহিম আদালত বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। আদালতপাড়ায় সবিশেষ পরিচিত আওয়ামীপন্থী আইনজীবী অ্যাডভোকেট মঞ্জিল মোরশেদ বিরোধীদলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার এক জনসভায় প্রদত্ত একটি বক্তব্য নিয়ে ভর্ত্সনার (Censure) উদ্দেশ্যে হাজির হয়েছিলেন বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের দ্বৈত বেঞ্চে। তার লক্ষ্য শতভাগ অর্জিত হয়েছে। হাইকোর্টের এই মাননীয় বিচারপতি বেগম খালেদা জিয়ার মন্তব্যকে এতই গর্হিত বিবেচনা করেছেন যে, তার সমালোচনা জানানোর উপযুক্ত ভাষা পর্যন্ত খুঁজে পাননি। হত্যারহস্য উন্মোচনে সরকারের যাবতীয় পদক্ষেপেও একই আদালত সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। শুধু তা-ই নয়, নাগরিকের বেডরুম পাহারা দেয়া বিষয়ক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চরম বিতর্কিত বক্তব্যকেও সঠিক বিবেচনা করেছেন বহুল আলোচিত বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী। বেগম খালেদা জিয়ার অপরাধ হলো, তিনি লালমনিরহাটের জনসভায় বলেছেন যে সাগর-রুনির কাছে সরকারের দুর্নীতির তথ্য থাকার কারণেই তাদের হত্যা করা হয়েছে। একজন রাজনীতিবিদ তার বক্তব্যে জনমতের প্রতিফলন ঘটাবেন, এটাই প্রত্যাশিত। বিএনপি চেয়ারপার্সনও তার বক্তৃতায় দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে যা বিশ্বাস করে, সেটাই নিজস্ব ভাষায় বিবৃত করেছেন। বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরীর দ্বৈত বেঞ্চের দৃষ্টিতে অবশ্য সেই বক্তব্য অতীব গর্হিত বিবেচিত হয়েছে।
আদালত থেকে আরও নির্দেশ দেয়া হয়েছে গণমাধ্যমে জজ মিয়া নাটক জাতীয় বাক্যাবলী আর লেখা যাবে না এবং তথ্যসচিব গণমাধ্যমের ওপর বিশেষ বেঞ্চ কর্তৃক আরোপিত এই সেন্সরশিপ দেখভাল করবেন। সাগর-রুনির হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবিতে দীর্ঘদিন পর ঐক্যবদ্ধ সাংবাদিক নেতারা স্বাভাবিকভাবেই আদালতের নির্দেশে অতিশয় ক্ষুব্ধ হয়েছেন। বিষয়টিকে তারা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং স্বাধীন গণমাধ্যমের ওপর আঘাতরূপেই বিবেচনা করছেন। সাংবাদিক মহলে কট্টর আওয়ামীপন্থী নেতারূপে পরিচিত ইকবাল সোবহান চৌধুরী এবং মঞ্জুরুল আহসান বুলবুলের বক্তব্য এখানে বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল বলেছেন, ‘পৃথিবীর কোথাও গণমাধ্যমের কাজে আদালতের এরকম হস্তক্ষেপের নজির নেই। আদালত কেন, কারও নির্দেশনা মেনে গণমাধ্যম দায়িত্ব পালন করবে না। হাইকোর্টের আদেশ অগ্রহণযোগ্য।’ আওয়ামীপন্থী বিএফইউজের সভাপতি ইকবাল সোবহান চৌধুরী মার্চের ১ তারিখে সাংবাদিকদের দিনব্যাপী গণঅনশনে সভাপতির বক্তব্যে বলেছেন, ‘আদালতের নির্দেশনা অনভিপ্রেত ও অনাকাঙ্ক্ষিত। গণমাধ্যমের ওপর বিচার বিভাগের হস্তক্ষেপ সাংবাদিক সমাজ সহ্য করবে না। দু’একজন অবিবেচক বিচারপতির কারণে আদালত ও গণমাধ্যম যেন মুখোমুখি চলে না আসে, সেজন্য পদক্ষেপ নিতে প্রধান বিচারপতির কাছে আহ্বান জানাই।’ মনে হচ্ছে আসলেই বাংলাদেশে অনভিপ্রেতভাবে আদালত এবং গণমাধ্যম ক্রমেই মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। সাগর-রুনির হত্যার তদন্তের সংবাদ পরিবেশনা নিয়ে হাইকোর্টের রুল প্রসঙ্গে আরও একটি প্রশ্ন জনমনে উত্থাপিত হয়েছে। আমরা এতদিন জানতাম বিচারাধীন কোনো বিষয়ে লেখালেখি করা বাঞ্ছনীয় নয়। এখন থেকে কি তদন্তাধীন বিষয় নিয়েও সংবাদপত্রে লেখা বা গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হলো? আইনের দৃষ্টিতে আদালতে বিচারাধীন এবং পুলিশের তদন্তাধীন বিষয় কি এক? তাছাড়া যে দেশের তথ্য আইনে জনগণের তথ্য জানার অধিকারকে স্বীকার করে নেয়া হয়েছে, সে দেশেই অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষ সেন্সরশিপ আরোপের যে কোনো অপচেষ্টাই নিন্দনীয়। অতি উত্সাহী বাদী অ্যাডভোকেট মঞ্জিল মোরশেদ একটি স্পর্শকাতর বিষয়কে আদালতে টেনে নিয়ে অযথাই আদালতকে বিতর্কিত করলেন। এই আইনজীবীর মতো ব্যক্তিরা যে কখনোই আদালতের বন্ধু নন, সে বিষয়টি মাননীয় বিচারপতিরা যত দ্রুত বুঝবেন, ততই বিচার ব্যবস্থার জন্য মঙ্গল হবে।
দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, এতসব ডামাডোলে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে নৃশংস ও আলোচিত হত্যাকাণ্ডটি ধামাচাপা পড়ার আশঙ্কাই জনমনে দৃঢ়তর হচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের গ্রেফতার করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। আজ ২৬ দিন পার হয়ে গেলেও পুলিশ হত্যাকাণ্ডের কোনো কূল-কিনারা করতে সক্ষম হয়নি। আদালত প্রশাসনের কর্মকাণ্ডে সন্তুষ্ট হতে পারেন, কিন্তু জনগণ যে একেবারেই সন্তুষ্ট হতে পারছে না এটাই বাস্তবতা। মানুষের মন আদালতের নির্দেশ দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা যে যায় না এ বিষয়টি সংশ্লিষ্টরা স্মরণে রাখলে ভালো করবেন। তরুণ সাংবাদিক দম্পতি সাগর ও রুনিকে তাদেরই শয়ন কক্ষে ঢুকে হত্যাকারীরা অত্যন্ত নির্মমভাবে যখন হত্যা করছিল, তখন পাশের ঘরে নিহতদের একমাত্র শিশুপুত্র মেঘ ঘুমিয়ে ছিল। সেই অবোধ, ঘুমন্ত শিশু জানতেও পারেনি গভীর নিশীথে তার কত বড় সর্বনাশ ঘটে গেছে। এই মানসিক আঘাত থেকে মেঘ কোনোদিন মুক্তি পাবে কিনা জানি না। ফ্যাসিবাদী মহাজোট সরকারের অধীনস্থ রাষ্ট্রযন্ত্রের সকল অংশ সম্মিলিতভাবে মেঘের নিহত পিতা-মাতাকে চরিত্রহননসহ অন্যান্য পন্থায় বড় নির্মমভাবে বার বার খুন করছে। মহান আল্লাহ্র কাছে প্রার্থনা করি যেন এই দুর্বিনীত শাসকশ্রেণীর ওপর তাঁর অভিসম্পাত বর্ষিত হয়।
ইমেইল : admahmudrahman@gmail.com

শুক্রবার, ২ মার্চ, ২০১২

বদলে যাচ্ছে জামায়াতে ইসলামী!

ঢাকা, ১০ ফেব্রুয়ারি: জামায়াতে ইসলামী বদলে যাচ্ছে। এই নিয়ে দলের মধ্যে ব্যাপক তৎপরতা চলছে। সংগঠনের মধ্যে এই আলোচনা জেলা-উপজেলা পর্যায়েও ছড়িয়ে পড়েছে। বিষয়টি দলের একাধিক নেতা স্বীকার করেছেন। জানা যায়, জামায়াতে ইসলামীর ওপর সরকারের ‘ক্র্যাকডাউন’ শুরুর পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে দলের মধ্যে কমবেশি আলোচনা চলছে। নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন পেতে জামায়াতকে নামের মধ্যে সংশোধনী আনতে হয়। দলটির আগের নাম ছিল ‘জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ’। সংশোধন করে রাখা হয় ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।’
বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতার বিষয়টি জামায়াতকে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্কিত করে রেখেছিল। এখন মানবতা বিরোধী বিচার শুরু হওয়ায় একটি দলের জন্য আরো জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে।
দলের একটি সূত্র জানায়, এই জটিলতা শুরু নাকি আরো আগে। দলের মধ্যে যারা একাত্তরের পরে এসেছেন তারা চাইছেন ‘চিহ্নিত’ লোকদের বাদ দিয়ে নতুনদের নিয়ে দল গঠন করতে। দলের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টানোর প্রস্তাবও অনেকে করেন। তখন ওইসব নেতাদের ‘সংস্কারপন্থী’ হিসেবে চিহ্নিত করে দলের মধ্যে কোণঠাসা করা হয়। জানা যায়, এদের মধ্যে অন্তত পাঁচজন প্রভাবশালী নেতা ছিলেন। যাদের মধ্যে দু’জন এখন কারাগারে আছেন। জানা যায়, দলের আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ও সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ ‘সংস্কারপন্থী’দের কোণঠাসা করতে নিজেদের মধ্যে গ্রুপ গড়ে তোলেন। আর দলটির বৈশিষ্ট্য হলো আমীর যা চাইবেন তার বাইরে কারো কিছু করার থাকে না। ফলে কথিত সংস্কারপন্থীরা দলে কোণঠাসা হয়ে যান। এ ব্যাপারে নিজামী-মুজাহিদকে বিশেষভাবে সহযোগিতা করে দলের ঢাকা মহানগর কমিটি। এরও আগে ছাত্রশিবিরের একটি গ্রুপ দল ছেড়ে চলে যায়। এদের বেশিরভাগই ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। এই বিষয়ে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মুজাহিদদের ‘নেতিবাচক’ ভূমিকাকে দায়ী করা হয়। এই নিয়েও জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতারা দু’ভাগে ভাগ হয়ে যান। কথিত সংস্কারপন্থী জামায়াত নেতারা বেরিয়ে যাওয়া শিবির নেতাদের সমর্থন করতেন বলে কথা ওঠে। এরপর একের পর এক নেতাদের গ্রেফতারের পর বিষয়টি নিয়ে দলের মধ্যে নানা আলোচনা চলতে থাকে। এখন জামায়াতের কেন্দ্রীয় ও মহানগর অফিস বন্ধ। শিবিরের অফিসও তালাবদ্ধ। নেতারা বলতে গেলে আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে গেছেন। এই পরিস্থিতিতে পত্রিকায় প্রকাশিত দলের সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল ও বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের একটি লেখা নিয়ে সর্বত্র আলোচনার ঝড় বইছে। বিষয়টি নিয়ে দলের তৃণমূল পর্যায়ে কথা চলছে বলে জামায়াতের একটি ‍সূত্র বার্তা২৪ ডটনেটকে নিশ্চিত করেছেন। ব্যারিস্টার রাজ্জাকের লেখাটির দৈনিক নয়া দিগন্তে গত ৭ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত হয়। ‘আরব বসন্ত এবং দেশে দেশে ইসলামী আন্দোলন’ নামে প্রকাশিত লেখাটিতে ব্যারিস্টার রাজ্জাক বোঝাতে চেয়েছেন, এখন বাস্তবতার নিরিখে সব কিছু করতে হবে। চিন্তাকে সুদূরপ্রসারী করতে হবে। তা না হলে টিকে থাকা যাবে না। ব্যারিস্টার রাজ্জাক তার লেখায়, বিভিন্ন দেশে ইসলামী দলগুলো চরম বৈরিতার মধ্যে নিজেদেরকে টিকিয়ে রেখে ক্ষমতায় আসছে তার বর্ননা দেন। তিনি লিখেছেন, “অক্টোবরে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তিউনিসিয়ায়। ২১৭ আসনের গণপরিষদে রশিদ ঘানুশির ইসলামপন্থী দল আন্‌নাহদা ৮৯ আসন পেয়ে সর্ববৃহৎ দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ২৯ আসন পেয়ে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে সিপিআর (কংগ্রেস ফর দ্য রিপাবলিক), আর ২৬ আসন পেয়ে তৃতীয় স্থান অধিকার করে আরিধা। শেষোক্ত দু’টি দলই সেকুলার আদর্শে বিশ্বাসী। এরপর নভেম্বর মাসে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় মরক্কোতে। ৩৯৫ আসনের পার্লামেন্টে ১০৭ আসন পেয়ে সর্ববৃহৎ দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে মধ্যমপন্থী ইসলামি দল জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি।”মিসর সম্পর্কে তিনি লিখেছেন,“অতি সম্প্রতি অনুষ্ঠিত মিসরের নির্বাচনে ইখওয়ানের রাজনৈতিক শাখা ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টি (এফজেপি) ৫০৮ আসনের পার্লামেন্টে সর্বমোট ২৩৫ আসন পেয়ে সর্ববৃহৎ দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। ১২৩টি আসন পেয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে সালাফিপন্থী নূর পার্টি। ৩৮টি আসন পেয়ে তৃতীয় স্থানে রয়েছে উদারপন্থী ওয়াফদ্ পার্টি। নিয়মের ব্যত্যয় না ঘটলে ইখওয়ানই আগামীতে কোয়ালিশন সরকার গঠন করবে। মোবারকের আমলে ইখওয়ান নিষিদ্ধ দল হলেও পার্লামেন্টে বিভিন্ন নামে এবং নির্দলীয়ভাবে ইখওয়ানের আসনসংখ্যা ছিল ৮০। ডাক্তার, প্রকৌশলী ও আইনজীবীদের সংগঠনের বেশির ভাগই ছিল ইখওয়ানের দখলে। সমাজসেবার কারণে তারা ছিলেন জনগণের খুব কাছাকাছি। জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণের মতো তাদের কোনো রাজনৈতিক দুর্নামও ছিল না। তারপরও তারা ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টির নামে আলাদা একটি প্লাটফর্ম সৃষ্টি করেছেন। ঘোষণা করেছেন একজন ক্যাথলিক খ্রিষ্টানকেও মিসরের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে মেনে নিতে তাদের কোনো আপত্তি থাকবে না।”তুরস্ক প্রসঙ্গে তিনি লেখেন, “আমার তিনবার তুরস্ক সফরের সুযোগ হয়েছে। ১৯৯৬ সালে প্রথম সফরের সময় নাজমুদ্দিন আরবাকান ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। ওই সফরে রেফাহ পার্টির এক যুবক সংসদ সদস্য আমাকে বলেছিলেন, ‘ইসলামের জন্য তুরস্কে কাজ করা ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের চেয়ে হাজার গুণ কঠিন।’ স্মরণ করা যেতে পারে, একটি কবিতা লেখার কারণে রজব তৈয়ব এরদোগানকে জেলে যেতে হয়েছিল এবং তিনি নির্বাচন করার জন্য অযোগ্য ঘোষিত হয়েছিলেন। সেই তুরস্ক আজ মুসলিম বিশ্বের অলিখিত নেতৃত্বের আসনে সমাসীন হওয়ার সম্মান অর্জন করেছে।”এ প্রসঙ্গে ব্যারিস্টার রাজ্জাক আরো বলেন, “আতাতুর্কের ‘আধুনিক তুরস্কে’ সেকুলারিজমের শিকড়, সমাজ ও রাষ্ট্রের অনেক গভীরে প্রবেশ করেছে। এমনকি, সেকুলার ফ্রান্সের চেয়ে সেকুলার তুরস্ক অনেক বেশি সেকুলার। তুরস্কের সেনাবাহিনী নিজেদের সেকুলারিজমের রক্ষাকারী বলে মনে করে। তারা ১৯৬০, ১৯৮০ এবং সর্বশেষ ১৯৯৮ সালে ক্ষমতা দখল করেছিল। ১৯৯৮ সালে নাজমুদ্দিন আরবাকানকে যখন ক্ষমতাচ্যুত করা হয় তখন রজব তৈয়ব এরদোগান ছিলেন তুরস্কের বৃহত্তম শহর ইস্তাম্বুলের মেয়র। ক্ষমতাচ্যুতির পর নীতিগত প্রশ্নে এরদোগানের নেতৃত্বে অপেক্ষাকৃত কম বয়স্কদের সাথে বর্ষীয়ান নেতা আরবাকানের মতবিরোধ হয়। আরবাকান সরাসরি ইসলামের কথা বলতেন এবং পাশ্চাত্যের সমালোচনা করতেন। তার এসব বক্তব্যকে সেনাবাহিনী চিত্রিত করে সেকুলারিজমের বিরোধিতা রূপে। এরদোগান ও আবদুল্লাহ গুল ‘জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি’ নামে নতুন দল গঠন করে অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে সেকুলারিজমকে এ বলে সংজ্ঞায়িত করেন যে, সেকুলারিজমের অধীনে ইসলামসহ সব ধর্ম পালনের স্বাধীনতা রয়েছে। তারা গুলেন মুভমেন্ট ও অন্যান্য উদারপন্থীদের সমর্থন লাভ করেন। তা ছাড়া তারা অর্থনৈতিক উন্নতির ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেন। ফলে ২০০২ সালের নির্বাচনে নবগঠিত একে পার্টি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেন। পরপর দু’টি নির্বাচনে তারা বিজয়ী হন। একে পার্টির নেতৃত্বে তুরস্ক অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। দীর্ঘ দিন ধরে তুরস্ককে একটি ছোট্ট গ্রুপ শাসন করে আসছিল। এ কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠীতে ছিল সেনাবাহিনীর একটা অংশ, উচ্চতর আদালতের বিচারপতিদের একটি অংশ, সুশীলসমাজ ও সংবাদমাধ্যমের একটি অংশ। তারাই সিদ্ধান্ত নিত কারা ক্ষমতায় থাকবে বা থাকবে না। এরদোগানের আগে কোনো প্রধানমন্ত্রী এদের চ্যালেঞ্জ করে ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারেননি। অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে এরদোগান সংবিধান সংশোধন করেছেন এবং সত্যিকার অর্থে তুরস্কে গণতন্ত্র কায়েম করেছেন। তুরস্কই প্রমাণ করল নেতৃত্বের কাজ হচ্ছে, একটি পথ বন্ধ হলে আরো তিনটি পথ খোলা। দ্বীনের পথে কোনো কাজে সঙ্কীর্ণতা নেই (সূরা হজ-২২:৭৮), যারা আল্লাহর পথে সংগ্রাম করে, আল্লাহ তাদের পথ দেখিয়ে দেন (সূরা আনকাবুত ৬৯:২৯)।”
রাজ্জাক লিখেছেন, “তুরস্কের একে পার্টি এবং মিসরের ইখওয়ানুল মুসলিমিনের পথ ধরে ৬০ বছরেরও অধিক সময় ধরে কার্যরত ভারতের জামায়াতে ইসলামী গত বছরের এপ্রিল মাসে ‘ওয়েলফেয়ার পার্টি অব ইন্ডিয়া’ নামে একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেছে। তাদের স্লোগান হচ্ছে- ন্যায়বিচার, স্বাধীনতা ও সমতা। পাশাপাশি জামায়াত তার আদর্শিক কার্যক্রম চালিয়ে যাবে। ১৬ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটিতে প্রেসিডেন্ট ও সেক্রেটারি জামায়াতের দায়িত্বশীল হলেও তাতে পাঁচজন অমুসলমান রয়েছেন, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন কেরালা রাজ্যের ক্যাথলিক খ্রিষ্টান ফাদার আব্রাহাম জোসেফ এবং কর্নাটকের সাবেক মন্ত্রী (অমুসলিম) ললিতা নায়ার। এরা দু’জনই সহসভাপতি। অনুরূপভাবে মালয়েশিয়ার ইসলামি আন্দোলন পিএএস (এক সময় যারা দু’টি রাজ্যে ক্ষমতায় ছিলেন; এখন শুধু একটিতে, কিন্তু ফেডারেল পার্লামেন্টেও তাদের সদস্য রয়েছে) ইসলামি রাষ্ট্রের কথা বাদ দিয়ে শুধু ন্যায়বিচারের কথাই বলছে। তুরস্ক, তিউনিসিয়া, মালয়েশিয়া, মিসর ও ভারতে ইসলামি আন্দোলনের এই কৌশলগত অবস্থান পরিবর্তনের আসল লক্ষ্য হচ্ছে দ্বীনের বাস্তবায়ন (সূরা সফ ৬১:৯)। কৌশলগত সঠিক সিদ্ধান্ত ছাড়া দ্বীনের বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।”জামায়াতের এই কেন্দ্রীয় নেতা লিখেছেন, “নেতৃত্বদানের জন্য (সূরা আল ফুরকান ২৫:৭৪) দেশে দেশে ইসলামি আন্দোলনের নেতৃবৃন্দকে বাস্তবধর্মী ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এ লক্ষ্য অর্জনে তুরস্কের একে পার্টি, মিসরের ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টি, তিউনিসিয়ার আন্‌নাহাদা পার্টি এবং ওয়েলফেয়ার পার্টি অব ইন্ডিয়া থেকে অনেক অনেক কিছু শিক্ষণীয় আছে। ছোট-বড় ইসলামি দলগুলোকে সব সঙ্কীর্ণতা ও আত্মম্ভরিতার ঊর্ধ্বে উঠতে হবে। অতীতের ভুলের জন্য ক্ষমা চাওয়ার মধ্যে কোনো দোষ নেই। মানুষের দুঃখ-কষ্ট ও বিপদ-মুসিবত বাড়ানোর জন্য আল্লাহ পবিত্র কুরআন নাজিল করেননি (সূরা তাহা ২০:১)।
সবশেষে ব্যারিস্টার রাজ্জাক বলেন, “আরব বসন্ত গোটা বিশ্বকে দারুণভাবে নাড়া দিয়েছে এবং পশ্চিমা পর্যবেক্ষকদের অনেকটা অবাক করে দিয়ে ইসলামপন্থীরাই এর ফসল ঘরে তুলেছেন। সামপ্রতিক কালে আরব বিশ্বের নির্বাচনী ফলাফল এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ বহন করছে। প্রশ্ন হচ্ছে, দক্ষিণ এশিয়ার ১৬ কোটি মানুষের বাংলাদেশের গায়ে এই আরব বসন্তের বাতাস কখন লাগবে?”
ব্যারিস্টার রাজ্জাক মূলত বলতে চেয়েছেন, জামায়াতকে পরিবর্তনে আসতে হবে। এই পরিবর্তন নামে এবং কর্মকৌশলে। অতীতের ভুলের জন্য ক্ষমা চাওয়া উচিত।
ব্যারিস্টার রাজ্জাকের এই লেখাটি প্রকাশের পর তৃণমূল পর্যায়ে আলোচনা চলছে বলে জানা যায়। কিভাবে জামায়াত তার ‘বিতর্কিত’ ইমেজ থেকে বেরিয়ে আসবে সেই আলোচনা জোরদার হয়েছে বলে দলের একটি সূত্র জানায়। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জামায়াত মহানগরী এক নেতা বার্তা২৪ ডটনেটকে বলেন, বিষয়টি ততো সহজ নয়। কারাগারে আটক নেতাদের বিষয়টি চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত দলের সংস্কার কঠিন। তিনি স্বীকার করেন, দলের তরুণদের মধ্যে সংস্কারের বিষয়ে আগ্রহ রয়েছে। জামায়াতের আরেকটি সূত্র জানায়, দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের থেকে যারা সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন তারা কোনদিকে যাবেন সেটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আর এরা খুব হিসাব-নিকাশ করে পা ফেলছেন। কারণ এখানে দুনিয়াবি লাভ-লোকসানের প্রশ্ন জড়িত।

প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব ইতিবাচকভাবে ফিরিয়ে দিলেন ড. ইউনূস




ঢাকা, ২ মার্চ: বাংলাদেশের একমাত্র নোবেলজয়ী ব্যক্তিত্ব ও গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রস্তাব নিয়ে দীর্ঘ নয়দিন পর আনুষ্ঠানিকভাবে মুখ খুলেছেন। তিনি তাকে বিশ্ব ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট করার উদ্যোগ নিতে প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবকে ইতিবাচকভাবে ফিরিয়ে দেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবের ভূয়সী প্রশংসা করলেও সামাজিক ব্যবসা নিয়ে এগিয়ে যেতে চান বলে মন্তব্য করেছেন।ডক্টর ইউনূস মনে করেন, যদি কোনোদিন সামাজিক ব্যবসা নিয়ে বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে যত বয়সিই হোক না কেন, তিনি প্রস্তাব পেলে ওই ব্যাংকটি প্রেসিডেন্ট হতে রাজি থাকবেন। উল্লেখ্য, গত ফেব্রুয়ারি ঢাকা সফররত ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন পার্লামেন্টারি ডেলিগেটদের সঙ্গে আলাপকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রস্তাব রাখেন যে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন বিশ্ব ব্যাংকের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট পদে নিয়োগের জন্য যেন ড. ইউনূসের নাম প্রস্তাব করে। সেই থেকে বিষয়টি নানাভাবে আলোচিত হয়ে আসলেও নোবেলজয়ী ড, ইউনূস এই ব্যাপারে মুখ খোলেননি। আজ শুক্রবার মিডিয়ায় পাঠানো এক বিবৃতির মাধ্যমে তিনি তার অবস্থান পরিষ্কার করেন। গ্রামীণ সেন্টার থেকে পাঠানো তার এই বিবৃতি নিচে হুবহু তুলে ধরা হলো:
‘‘গত ফেব্রুয়ারী ২২, ২০১২ তারিখে সফররত ইউরোপীয় ইউনিয়ন পার্লামেন্টারী ডেলিগেটদের সঙ্গে আলাপকালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমার ব্যাপারে তাদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব করেন। তিনি প্রস্তাব রাখেন যে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন বিশ্ব ব্যাংকের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট পদে নিয়োগের জন্য যেন আমার নাম প্রস্তাব করে। তিনি এ পদে আমার যোগ্যতার ব্যাপারেও ডেলিগেটদের কাছে জোরালো বক্তব্য তুলে ধরেন। এরপর থেকে সংবাদ মাধ্যমে প্রস্তাবটি নিয়ে অনেক উৎসাহব্যঞ্জক আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। এই প্রস্তাবটি আমার জন্য ছিল একটি সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত সুসংবাদ। বিশ্বের সুপরিচিত এবং বিপুল প্রভাবশালী একটি প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ পদে আমার নাম প্রস্তাব করার অনুরোধ জানিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যে সহৃদয়তার পরিচয় দিয়েছেন তার জন্য আমি তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। এই সংবাদে আনন্দিত হবার আমার আরেকটি কারণ হলো প্রস্তাবটি ও তার সঙ্গে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমার যোগ্যতার যে উদার তালিকা দিয়েছেন তার মাধ্যমে পরিষ্কার হলো যে আমার সম্বন্ধে এবং গ্রামীণ ব্যাংক সম্বন্ধে তাঁর যে পূর্ববর্তী ধারণাগুলি ছিল সেগুলির অবসান হয়েছে। এতে আশান্বিত হয়েছি যে এখন থেকে আমার প্রতি এবং গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতি সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি ও নীতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সর্বশেষ অবস্থানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হবে। এর ফলে আমার এবং আমার মত অনেক দেশবাসীর মাথার উপর থেকে দুঃখ ও দুঃশ্চিন্তার একটা বিরাট বোঝা নেমে যাবে।মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবটি সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হবার পর থেকে অনেকে এই প্রস্তাবের প্রতি জোরালো সমর্থন জানিয়ে মতামত প্রকাশ করেছেন; যুক্তরাষ্ট্রের মাননীয় রাষ্ট্রদূত আশ্বাস দিয়েছেন যে আমি আগ্রহী হলে তাঁর দেশ এই প্রস্তাবের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দেবে। আমি মাননীয় রাষ্ট্রদূত এবং অন্য সকলের প্রতি আমার উপর তাঁদের আস্থার জন্য বিশেষ ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
আমি নিজে অবশ্য কখনো বিশ্বব্যাংকের প্রধান বা ওই রকমের বড় কোন দায়িত্ব নেবার কথা চিন্তা করিনি। দীর্ঘকাল ব্যাপী বিশ্ব ব্যাংকের একজন নিয়মিত সমালোচক হিসেবে আমি তার নীতি ও কার্যক্রমের কঠোর সমালোচনা করে এসেছি। এই ব্যাংকের সর্বোচ্চ পদটি যুক্তরাষ্টের নাগরিকদের জন্য বরাদ্ধ করে রাখার বিষয়টিও আমার সমালোচনার বিষয়বস্তু ছিল। কিন্তু তাই বলে যেকাজে নিজেকে সঁপে দিয়েছি তার বাইরে গিয়ে বিশ্ব ব্যাংকের সর্বোচ্চ দায়িত্ব গ্রহণ করার ব্যাপারে আমার মনে কোনো আগ্রহ জন্মেনি। এখনও এ রকম কোনো আগ্রহ আমার নাই।
অতীতেও আরেকবার আমি এরকম আলোচনার মধ্যে এসে গিয়েছিলাম। ১৯৯৫ সালে প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন আমাকে ওভাল অফিসে আমন্ত্রণ জানান। নানা বিষয়ের মধ্যে তিনি বিশ্ব ব্যাংকের ভবিষ্যৎ কর্মসূচির ব্যাপারে আলাপ করেন ও আমার পরামর্শ চান। তিনি জানতে চান বিশ্ব ব্যাংকের জন্য নতুন একজন প্রেসিডেন্ট নিয়োগ করতে হবে, এপদে আমার কোনো আগ্রহ হবে কিনা। আমি সবিনয়ে তাকে অনুরোধ করেছি আমার কাজের মধ্যে আমাকে নিবিষ্ট থাকার সুযোগ দেবার জন্য। এরপর পত্রপত্রিকায় বিশ্ব ব্যাংকের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হবার সম্ভাব্য ব্যক্তি হিসেবে আমার নাম প্রকাশিত হবার প্রেক্ষিতে একজন বিরক্ত মার্কিন সাংবাদিক আমার যে সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন তার একটা কৌতুকময় বর্ণনা আমার আত্মজীবনী ‘ব্যাংকার টু দি পুওর’ বইটিতে আমি উল্লেখ করেছি। সাংবাদিক আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন বিশ্ব ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট হবার পর আমি কী কী পদক্ষেপ নেবো। সংবাদটির প্রতি সাংবাদিক মহোদয়ের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গী অনুভব করে আমি বলেছিলাম যে আমার প্রথম পদক্ষেপ হবে বিশ্ব ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়টি ওয়াশিংটন থেকে সরিয়ে বাংলাদেশে স্থানান্তর করা। আমার জবাবে সাংবাদিক খুব ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন।
প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন জিম উলফেনসনকে বিশ্ব ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট পদে নিয়োগ দেন। তিনি জানতেন না আমার সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের সঙ্গে কী কথা হয়েছিল। তিনি প্রেসিডেন্ট পদে আসীন হবার কিছুদিন পরে আমাকে বিশ্ব ব্যাংকের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদ, অন্যতম ম্যানেজিং ডিরেক্টর, হবার জন্য অনুরোধ করেন। একই কারণে আমি তার অনুরোধও রাখতে পারিনি।
২০০৫ সালের শেষের দিকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া আমাকে জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল পদে মনোয়ন দানের প্রস্তুতি নেন এবং আমার সম্মতি চান। জাতিসংঘের নিয়ম অনুসারে সেবার পদটি একজন এশিয়াবাসীর প্রাপ্য ছিল। আগে থেকে কয়েকটি ইউরোপীয় এবং এশিয়ান দেশ আমাকে আগ্রহী হবার জন্য উৎসাহিত করছিলেন। আমি তাদেরকে আমার অপরাগতার কথা জানিয়ে যাচ্ছিলাম। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকেও তার সহৃদয়তার জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে আমি আমার নিজের কাজে নিয়োজিত থাকার ব্যাপারে সুযোগ প্রার্থনা করেছিলাম। তিনি কয়েকবার অনুরোধ করার পরও আমি আমার মন পাল্টাতে পারিনি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বর্তমান প্রস্তাবে যাঁরা উৎসাহিত বোধ করছেন তাঁরা হয়তো আমার উপর নারাজ হবেন এই ভেবে যে দেশের জন্য এত বড় সুযোগের প্রতি আমি গুরুত্ব দিচ্ছি না। আমার দিকটার কথাও তাঁদের বিবেচনার জন্য নিবেদন করছি। সারাজীবন আমি যে কাজ আমার মত করে করতে পারি, এবং আমার কাছে যেটা গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে, সেটাই করে গেছি। সামাজিক ব্যবসাকে সকলের কাছে পরিচিত করা, সেটার সফল বাস্তবায়ন করা, পৃথিবীর তরুণদেরকে মানুষের ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে আশাবাদী করে তোলা এবং নতুন পৃথিবী সৃষ্টিতে তাদের নেতৃত্ব গ্রহণে আগ্রহী করে তোলার কাজেই আমি নিয়োজিত। একাজে আমি পরিপূর্ণভাবে নিয়োজিত থাকতে চাই। আশা করি অদূর ভবিষ্যতে ‘বিশ্ব সামাজিক ব্যবসা ব্যাংক’ প্রতিষ্ঠিত হবে এবং বিশ্বের মৌলিক অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং পরিবেশ সংক্রান্ত সমস্যার দ্রুত সমাধানে এই ব্যাংক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এই ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট হবার জন্য যদি কেউ আমাকে অনুরোধ করে তবে সানন্দে সে দায়িত্ব নিতে আমি এগিয়ে আসবো- ততদিনে আমার বয়স যতই হোক।”

শনিবার, ২২ অক্টোবর, ২০১১

তুমি বেঈমান, মীর জাফর: রনিকে প্রধানমন্ত্রী





সম্প্রতি এক টিভি টকশোতে সরকার দলীয় এমপি গোলাম মাওলা রনি যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনকে নিয়ে যে মন্তব্য করেছেন, তাতে ভীষণ ক্ষেপেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
প্রধানমন্ত্রী তাকে তিরস্কার করে বলেন, ‘তুমি বেঈমান। বিজেপির আন্দালিব রহমানের সাথে তুমি ব্যবসা করো। যে কাজ বিরোধীদল করবে তা তুমি কেন করছো?’
তিনি আরও বলেন, ‘তার শ্বশুর গোষ্ঠী বিএনপি করে। ও নিজও চিন্তা করছে এরপরে তাদের সাথে যোগ দেবে। আর বিএনপি ক্ষমতায় এলে শ্বশুররা তাকে শেল্টার দেবে। এ তো মীরজাফর।’
ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, ‘ওকে রাস্তা থেকে ধরে এনে এমপি বানিয়েছি। ওর মনে রাখা উচিত যে কোনও দলের নমিনেশন পেয়ে সে এমপি হয়নি। অবশ্য কোনও কথা দলের বিরুদ্ধে গেলে ওর কী যায় আসে?বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদ ভবনের সরকারি দলের সভাকক্ষে দলীয় সংসদ সদস্যদের সভায় তিনি রনিকে এসব কথা বলেন।
সভায় অংশগ্রহণ করা একাধিক সংসদ সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ তথ্য সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেছেন।
সভার এক পর্যায়ে দলের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য তোফায়েল আহমেদ তার বক্তব্যে যোগাযোগমন্ত্রীকে নিয়ে দলীয় এমপি গোলাম মাওলা রনির সাম্প্রতিক একটি টিভি টকশোতে রাখা বক্তব্য তুলে ধরেন।তোফায়েল বলেন, রনি টকশোতে যান, ভালো বলেন। কিন্তু রনি বললেন, প্রধানমন্ত্রী চীন সফরে গিয়ে লেকের পাড়ে বসে বাঁশি বাজিয়েছেন। যিনি তাকে বাঁশি নিয়ে দিয়েছিলেন তিনি তাকে মন্ত্রী বানিয়েছেন। কিন্তু একথা যদি সত্যও হয় তিনি তা টকশোতে বলবেন কেন?
এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, রনি কোথায়? এখানে আছে?
রনি এসে সামনে দাঁড়ালে প্রধানমন্ত্রী তাকে বলেন, তুমি কার কাছে একথা শুনেছ? উত্তরে রনি বলেন, আমি এক সাংবাদিকের কাছে শুনেছি।
এরপর শেখ হাসিনা তাকে বলেন, তুমি একজন সাংবাদিকের কাছে শুনেই বলে ফেললা? তুমি তো আমার কাছে জানতে পারতে।এ সময় প্রধানমন্ত্রী তাকে তিরস্কার করে বলেন, ‘তুমি বেঈমান। বিজেপির আন্দালিব রহমানের সাথে তুমি ব্যবসা করো। যে কাজ বিরোধীদল করবে তা তুমি কেন করছো?’
এদিকে, সভায় দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার জন্য দলীয় সাংসদদের তীব্র সমালোচনার শিকার হন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. আ. ফ. ম রুহুল হক এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী আফসারুল আমিন।
সংসদ সদস্যরা বলেন, কোনও ব্যক্তির ওপর নির্ভর করা যাবে না। যারা দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না, সরকার ও দলের স্বার্থে তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।
সভা সূত্র জানায়, কমিউনিটি ক্লিনিক, গ্রামে ডাক্তার না থাকা ইত্যাদি বিভিন্ন কারণে সংসদ সদস্যরা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সমালোচনা করেন।
একই সঙ্গে সভায় অংশগ্রহণকারী সদস্যরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিজেদের পছন্দের প্রার্থী নিয়োগ না পাওয়ায় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর কঠোর সমালোচনা করেন।
সবার বক্তব্য দীর্ঘক্ষণ মনোযোগ দিয়ে শুনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বিরোধী দলের মূল লক্ষ্য যুদ্ধাপরাধী ও দুর্নীতিবাজদের রক্ষা করা। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলাকারী এবং দশ ট্রাক অস্ত্র আমদানিকারকদের রক্ষায় তারা যুদ্ধ শুরু করেছে। রোডমার্চের মাধ্যমেই বিরোধী দল তাদের এই লক্ষ্য স্পষ্ট করেছে। এর মাধ্যমে বিএনপি আবারও প্রমাণ করল যে, তারা রাজাকারের দল।
বিরোধী দলের অপপ্রচার সম্পর্কে এবং সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ণমূলক কর্মকাণ্ড তথ্য-উপাত্ত দিয়ে সারাদেশে জনগণের সামনে উপস্থাপনের জন্য তিনি দলীয় এমপিদের পরামর্শ দেন।এছাড়া দল ও সরকারের বৃহত্তর স্বার্থে ভেদাভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধভাবে সবাইকে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
এদিন সকাল ১১টার কয়েক মিনিট পর শুরু হওয়া এই বৈঠক চলে বেলা ১টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত। শুরুতে প্রধানমন্ত্রী প্রায় পৌণে এক ঘণ্টা বক্তব্য রাখেন।
তিনি বলেন, সরকারের উন্নয়নমূলক কার্যক্রম ও বিভিন্ন প্রকল্প সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য-উপাত্ত দিয়ে জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে। আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারে কী কী অঙ্গীকার ছিল, আমরা কী কী বাস্তবায়ন করেছি, কোন প্রকল্পের কী অগ্রগতি তা জনগণকে জানাতে হবে।
শেখ হাসিনা বলেন, বিরোধী দল গঠনমূলক ভূমিকা রাখছে না। তারা গঠনমূলক ভূমিকা রেখে সরকারকে সহযোগিতা করলে আমরা আরও বেশি কাজ করতে পারতাম। গণতন্ত্র আরও অগ্রসর হতে পারতো। তারপরেও এর মধ্য দিয়েই আমাদের এগুতে হবে। সব কাজ হয়তো আমরা শেষ করতে পারবো না। তারপরও যতটুকু করতে পারবো সেজন্য নিজেদের ঐক্য দরকার।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য শেষে ফ্লোর নেন দলীয় এমপি আতিউর রহমান আতিক। তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে অভিযোগ করেন, কমিউনিটি ক্লিনিকে আমাদের দলীয় লোকজনের চাকরি হচ্ছে না। অন্যান্য প্রকল্পেও দলীয় লোকদের চাকরি দেওয়া হচ্ছে না।
তাকে সমর্থন করে আরও কয়েক এমপি বলেন, কমিউনিটি ক্লিনিকের চাকরিগুলো রাজনৈতিক। এখানে আওয়ামী লীগের লোকজনের চাকরি না হলে বিএনপি-জামায়াতের লোকেরা চাকরি পাবে।
এই অভিযোগের বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. আ. ফ. ম রুহুল হক কথা বলতে চাইলে তাকে প্রধানমন্ত্রীর সামনেই তিরস্কার করেন দলীয় এমপি ইসরাফিল আলম।
বৈঠকে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, রোডমার্চে খালেদা জিয়া যেসব বক্তব্য দিয়েছেন তা টিভি চ্যানেলের মাধ্যমে দেশবাসী শুনেছে। সরকার দেশকে ভারতের কাছে বিক্রি করে দিচ্ছে, পদ্মা সেতু প্রকল্পে লুটপাট হয়েছে ইত্যাদি অভিযোগ করেছেন বিরোধী দলীয় নেতা। তথ্য-উপাত্ত দিয়ে তার এসব বক্তব্যের জবাব এবারের সংসদ অধিবেশনে তুলে ধরতে হবে। সেজন্য সংসদে পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। সরকারি দলের এই বক্তব্য যেন মিডিয়ার মাধ্যমে দেশবাসীকে জানানো যায়, সে ব্যবস্থাও করতে হবে।
দলের উপদেষ্টা পরিষদের আরেক সদস্য তোফায়েল আহমেদ বৈঠকে বলেন, কমিউনিটি ক্লিনিকে চাকরি দেওয়ার জন্য আমাদের কাছে তালিকা চাওয়া হলো। আমরা তালিকা দিলাম। স্বাস্থ্য উপদেষ্টাও বলেছেন যে সাড়ে চার হাজার লোকের চাকরি হবে। কিন্তু স্বাস্থ্যমন্ত্রী চাকরি না দিয়ে প্রমাণ করলেন উপদেষ্টার বক্তব্য অসত্য।
তিনি বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে এরকম বিভিন্ন বক্তব্যের কারণে আমরাও এলাকার লোকজন ও দলীয় নেতা-কর্মীদের কাছে হেয় হচ্ছি।
বৈঠকে কয়েকজন সদস্য অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদককে নেতা-কর্মীরা পাচ্ছেন না। তিনি মন্ত্রণালয়েও যান না।
তারা বলেন, স্থানীয় সরকারের কার্যক্রমের সঙ্গে সংসদ সদস্যরা সবচেয়ে জড়িত। অথচ এ কাজে মন্ত্রীকে পাওয়া যায় না।

শুক্রবার, ৫ আগস্ট, ২০১১

আল্লাহ, মুহম্মদ সা এবং আল-কোরআন বিষয়ক কিছু আলোচনার জবাবে

আমরা না দেখেই বিশ্বাস করি তিনি আছেন। আমার এই বিশ্বাস আরো দৃঢ় ভিত্তি লাভ করে যখন আমরা সৃষ্টিকর্তার নিদর্শন দেখি। তার নিদর্শনের মাঝে তার বক্তব্যের/ অস্তিত্বের প্রমাণ পাই নানা ভাবে।
এটা মোটামুটি সব বিশ্বাসী/আস্তিকদের ক্ষেত্রেই কমন, আমি নিজে যখন আস্তিক ছিলাম- আমার ক্ষেত্রেও এটা ঘটেছে। মুসলমান বাপ-মা’র কারণে জন্মের পরেই মুসলমান হয়ে তারপরে- এমন যুক্তি- নিদর্শন খুজেছি- খুজে পেয়েছি। ক্লাস থ্রি/ফোরের ক্লাসের ধর্মের বই এ পরিষ্কার যুক্তি ছিল- “আল্লাহ যে আছেন এটার নিদর্শন আমাদের চারপাশে অসংখ্য আছে”। সবকিছু এত নিয়মমাফিক চলে- এ থেকেই প্রমাণ হয় যে, একজন নিশ্চয়ই আছেন যিনি সবকিছু সুচারু ভাবে নিয়ন্ত্রণ করছেন- আল্লাহ বা সৃষ্টিকর্তা যে একজনই কারণ একাধিক হলে তো তাদের মধ্যে মতবিরোধ হতো- বিশ্বজগৎ সুচারুরূপে চলতে পারতো না…… ইত্যাদি। আমি নিশ্চিত- অন্য ধর্মাবলম্বীদের ক্ষেত্রেও এমনটি ঘটে। আগে বিশ্বাস করে নেয়া- তারপরে যুক্তি খোজা- নিদর্শন খুজে পাওয়া…..।
যাহোক- এটা নিয়ে তেমন কিছু বলার নেই, যে বিষয়টি নিয়ে বলতে চাই- আপনি যেসব নিদর্শন বা যুক্তি দেখে আপনার বিশ্বাসকে পাকাপোক্ত করেছেন- সেগুলো নিয়ে আমার যথেষ্ট কথা আছে। সেগুলোকে যদি, আমার কাছে অযৌক্তিক মনে হয়- তবে আমার আগের বিশ্বাসের ভিত্তিটি কি একটু দুর্বল হতে পারে না????
“কখনো দেখি , ১৪০০ বছর আগে আদর্শ, নীতি বা ন্যায় পরায়নতা ভিত্তিক যে সমাজ গঠন করেছিলেন অস্বাভাবিক সামাজিক পংকিলতার মধ্য থেকে যা বিশ্ব ইতিহাসের যে কোন সময়ে যে কোন স্থানে বিরল।
মনে পড়ে ওমর (আঃ) আর তার ভৃত্য একটা উঠে বিশাল মরুভুমির ৫০% -৫০% পথ পাড়ি দিয়েছিলেন। কখন মনে পড়ে হযরত ওমর (আঃ) এর দুর্ভিক্ষ কালিন বক্তব্য “আজ যদি ফোরাতের তীরে একটা কুকুর যদি না খেয়ে মারা যায়, তবে তার জন্য আমি দ্বায়ী।” মানব ইতিহাসে এর তুলনা কোথায়?”
১৪০০ বছর আগে মুহম্মদ সা আরব সমাজে যে অবদান রেখেছেন- তা আমি স্বীকার করি- এবং একজন মানুষ হিসাবে তার প্রতি আমার প্রচণ্ড শ্রদ্ধাও আছে। কিন্তু যুগে যুগে আরো অসংখ্য মানুষকেই তো আমরা পাই। তাদেরো প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধা আছে। কিন্তু যখন বলা হয় ১৪০০ বছর আগে আরবভূমিতে মুহম্মদ সা এর এই ভূমিকা বিশ্ব ইতিহাসে যেকোন স্থানে বিরল- তখন বুঝতে পারি – এমন দাবিদারের বিশ্ব ইতিহাস সম্পর্কে জানা-বুঝা নিতান্তই কম। বুঝতে পারি এ হলো চোখ বন্ধ করে ভক্তিতে গদগদ হওয়া, এ এমনই ভক্তি যে- একজন রক্তমানুষের মানুষকে ঐশ্বরিক পর্যায়ে কল্পনা করে নেয়া, সেই মানুষটি যে একটি নির্দিষ্ট সময়কালে- একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের একটি নির্দিষ্ট সমাজ ব্যবস্থায় এসেছিলেন- তা ভুলে তার সমস্ত ক্রিয়া-কর্মকেই সমস্ত যুগের জন্য সমস্ত অঞ্চলের জন্যই সমস্ত সমাজব্যবস্থার জন্যই চুড়ান্ত বলে ঘোষণা দেয়া। তখন বিনীতভাবে প্রশ্ন না করে পারি না যে, এই মানুষটি বিদায় হজ্জে দাসদের প্রতি সুব্যবহার করার আহবান জানাতে পারলেন কিন্তু কৃতদাস প্রথা উচ্ছেদের ডাক দিলেন না কেন? পুরুষের জন্য চার বিবাহের বিধান কেন রাখলেন? হিল্লা বিয়ে প্রথা কেন রাখলেন? দাসীদের সাথে বিবাহ বহির্ভুত যৌন সম্পর্ক কেন জায়েজ রাখলেন?….. ইত্যাদি।
বিশ্ব ইতিহাসের কথা টেনে যখন এই মানুষটিকে মহামানব হিসাবে দেখানো হয়, সরাসরি আল্লাহর বন্ধু বা রাসুল হিসাবে ঘোষণা দেয়া হয়- তখন বিনীত ভাবে প্রশ্ন করি- ক্ষমতা হাতে পাওয়ার পরে কেন তার একের পর এক নারীর প্রতি ঝুঁকতে হয়? কেন একের পর এক যুদ্ধ/জেহাদে লিপ্ত হতে হয়? কেন বিধর্মীদের প্রতি ঘৃণা ছড়াতে হয়? কেন অন্য ধর্মাবলম্বী প্যাগানদের ধর্মী উপাসকদের মূর্তিগুলো ধ্বংস করে দিতে হয়?…. ইত্যাদি।
এসবের জন্য একজন মানুষ মুহম্মদ সা এর প্রতি কোন অশ্রদ্ধা নেই- কারণ আমি জানি একজন মানুষের যুগগত, সমাজ ব্যবস্থাগত সীমাবদ্ধতা কি হতে পারে। কিন্তু অবশ্যই একজন রাসুলুল্লাহ মুহম্মদ সা এর প্রতি আমার হাজারো প্রশ্ন আছে। তাই কেউ যদি- যুগের কথা বলে নবীজী হিসাবে তার নারী লিপ্সাকে অনুমোদন দিতে চান- সোলায়মান…….. সহ বহুত রাজা বাদশার আরো চরম নারী লিপ্সার সাথে তুলনা দেখিয়ে রাসুল মুহম্মদ সা এর চরিত্রকে অনুকরণীয় দেখাতে চান- তাদের আমি বিনীতভাবে যীশু-গৌতম বুদ্ধ- সক্রেটিস থেকে শুরু করে মুহম্মদ সা এর আরো অনেক আগের অসংখ্য মানুষের তুলনা আনি, এনে জানাই এ ব্যাপারে অনুকরণ- অনুসরণ করতে চাইলে তাদেরই তো করা উচিৎ।
ওমরেরও অনেক কাহিনী, অনেক গল্প আমাদের এখনো উদ্দিপ্ত করে- ইতিহাসে এমন অসংখ্য চরিত্রই আমাদের মাঝে এমন করেই বেচে থাকেন যুগ যুগ ধরে। কিন্তু সেই সব রক্ত মাংসের মানুষের অনবদ্য গল্পগুলোকে কেন্দ্র করে যখন অন্য সব যোগসূত্র বের করে, মানুষের মহিমার চেয়ে কিচ্ছাকাহিনী/গালগল্পের মাহাত্ম্য প্রচারের চেষ্টা হয়- তখন বিনীতভাবে প্রশ্ন করি- ইসলামের চার খলীফার কয় খলীফা খুন হয়েছেন? কাদের হাতে খুন হয়েছেন? কি কারণে খুন হয়েছেন?
মুহম্মদ সা এর শবদেহ দাফনে কেনই বা দেরী হলো? ওনার কাছের মানুষেরা কি নিসন্দেহ ছিলেন না- যে তিনি আল্লাহর রাসুল? নিসন্দেহ কি ছিলেন না যে- আল্লাহর রাসুলের শবদেহ অবহেলায় ফেলে রেখে ক্ষমতা নিয়ে দ্বন্দ্বে লিপ্ত থাকলে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হতে পারেন?
“যখন দেখি, আল-কুরআনের বাণী গুলো এত বেশি অলংকৃত, শব্দের যে অপরুপ বিন্যাস যার তুলনীয় কাব্যগ্রন্থ আজও সম্ভব হয় নি, (অবশ্য এটা আপনাকে ভালভাবে বুঝতে হলে আপনাকে আরবি সাহিত্য বা আরবি ভাষা অনেক ভাল জানতে হবে বা আপ্নকে সাহিত্য বিশারদ হতে হবে; আমরা আপাতত যারা সাহিত্য বিশারদ আছেন তাদের কথায় বিশ্বাস করে নিচ্ছি)।”
আল-কুরআনের বাণীগুলো এত বেশী অলংকৃত, শব্দের যে অপরূপ বিন্যাস- তা একজন বিশ্বাসী মাত্রই আরবী ভাষা না জেনে- না বুঝেই অন্ধভাবে বিশ্বাস করে। আর এমন অন্ধভক্তিজনিত অবস্থান থেকেই এরকম ঘোষণা: “কোরআনের সমতুল্য কাব্যগ্রন্থ আজও সম্ভব হয়নি”!!!!!!!!
সুতরাং- খুব সহজেই এক বাক্যে জবাব দেয়া যায়: এমন ঘোষণাকারীর কাব্য সম্পর্কে কোন ধারণাই নেই।
সেই সাথে এরকম বিশ্বাসীদের অবগতির জন্য জানিয়ে দেই: বিশ্ব সাহিত্যে আল-কোরআনের অবস্থান বলতে গেলে শূণ্যের কোঠায়। ইতিহাস গ্রন্থ- দর্শন গ্রন্থ হিসাবে এই গ্রন্থের যথেষ্ট ভূমিকা অবশ্যই আছে- একটা পুরো যুগকে বুঝতে গেলে- কোরআন-হাদীসের শরণাপন্ন অবশ্যই হতে হবে। কিন্তু বিশ্ব সাহিত্যের দরবারে কোরআন না থাকলেও চলবে। এমনকি আমাদের এই অঞ্চলের মহাভারত-রামায়নকেও মহাকাব্য আখ্যা দেয়া যায়, প্রাচীণ সাহিত্যের কোঠায় আমরা চর্যাচর্যবিনশ্চয় বা চর্যাপদকে বুকে পিঠে ধরে রাখি- বিশ্বসাহিত্যকে হোমারের দুই প্রাচীণ মহাকাব্য অনেক ধনী করে- সেগুলোর তুলনায় আল-কোরআন নিতান্তই শিশু। সাহিত্য বিশারদদের কথা আপনি এনেছেন- কিন্তু দুনিয়ার সাহিত্য বিশারদরাই কিন্তু প্রাচীণ কোন গ্রন্থের মধ্যে কোনটির সাহিত্যমান কেমন- কোনটিকে মহাকাব্য বলা যাবে- কোনটিকে বলা যাবে না- তা নির্ধারণ করেছেন।
এবারে সরাসরি আল-কোরআনের কাব্যগুন কেমন তা একটু বিচার করি। কাব্যের বিভিন্ন অঙ্গগুলো হচ্ছে: রূপক-উপমা- ছন্দ ইত্যাদি। একটা ভাবকে রূপক-উপমা দিয়ে তুলে ধরতে পারাটা কাব্যের বিশেষত্ব- এটা কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে আছে, এটা স্বীকার করছি। কিন্তু এর পরিমাণ খুব কম ও এগুলো আমার মতে ততখানি বুদ্ধিদীপ্ত নয়- মানে অনেকটা ফ্লাট টাইপের। উপরন্তু আমাদের এখানকার প্রাচীণ গাঁথা-কবিতায় সাধারণ মানুষ যেসমস্ত উপমা-রূপক দিয়ে মানুষের মনের ভাবকে প্রকাশ করে গিয়েছে- অনেক আগে থেকেই দেহবাদী গানগুলোতে যে উপমার ছড়াছড়ি- তা থেকেই বুঝা যায়- এগুলো মানুষের দ্বারাই খুব সম্ভব।
আর, ছন্দের কথা বললে- কোরআনকে অনেক পেছনে রাখতে হবে। রামায়ন-মহাভারতের শ্লোক- আমাদের চর্যাপদের পদগুলোর ছন্দ অনেক সুললিত, পরিমিত। কোরআনের বেশীরভাগ কবিতা তথা সুরাই আসলে ছন্দ মেইনটেইন করেনি। তবে কিছু কিছু সুরা- অনেক সুরার মাঝের বিভিন্ন ধারাবাহিক আয়াতে আমরা ছন্দের খেলা দেখতে পাই। কিন্তু সাথে এটাও বলতে হবে যে- যেকোন প্রাচীণ ছন্দের মত এগুলো একঘেয়ে অনুপ্রাসের সমাহার।
যেমন:
আলাম তারা কাইফা ফায়ালা রাব্বুকা বি আসহাবিল ফিল
আলাম ইয়াজয়াল কাইদাহুম ফি তাদলিল
ওয়া আরসালা আলাইহিম তয়রান আবাবিল
তারমিহিম বিহিজারাতিম মিন সিজ্জিল
ফাজায়ালাহু কা’য়াসফিমমাকুল…..
এটা ১০৫ নং সুরা ফিল। সব বাক্যের শেষেই আছে ইল (যদিও পঞ্চম বাক্যে আছে উল)। তেমনি সুরা ফাতেহায় সব বাক্যের শেষে আছে- ইন/ইম। সুরা নাসে সব বাক্যের শেষে পাওয়া যাবে নাস….. ইত্যাদি।
এধরণের ছন্দ প্রাচীণ কবিতাগুলোতে পাওয়া যায়। সে সময়ে আসলে ছন্দগুলো তৈরি হতো মুখে মুখে- প্রচারিত হতো মুখে মুখে, ফলে এরকম অন্তমিল রেখে তৈরি করাটা ছিল সহজ, এরকম অন্তমিল দেয়া ছন্দ মনে রাখাটাও ছিল সহজ। দেখুন চেষ্টা করলে আপনি এরকম ছন্দ তৈরি করতে পারবেন- যেমন:
আলো আমার আলো
আমি আছি ভালো
যতই তুমি কালো
প্রেমের সুধা ঢালো
….. বা
কলকল
ছলছল
ঢলঢল
ঝলমল
হলহল
কোলাহল……. ইত্যাদি।
চেষ্টা করে দেখুন, আমার মত কেউ পারলে আপনিও পারবেন। সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ছড়াগুলো পড়ে দেখতে পারেন- তাহলে বুঝবেন এরকম ছন্দ মানুষ কি দারুন তৈরি করতে পারে।
আর প্রাচীণকালের দোহাই পাড়লে বলবো- চর্যাপদ, রামায়ন-মহাভারত এসবের দিকে চোখ রাখুন। চর্যাপদের ছন্দগুলো- রামায়ন মহাভারতের শ্লোকগুলোও এরকম অন্তমিল ছন্দ দিয়ে তৈরি। এবং পড়লেই বুঝতে পারবেন ওগুলোর চেয়ে কত নিম্নমানের ছন্দ আল-কোরআনে। নিম্নমানের বলছি এই কারণে যে, কোরআনেরটা অনেক বেশী একঘেয়ে, এবং কোরআনে এইরকম মিল দেখাতে গিয়ে একই শব্দ, একই বাক্য বারবার ব্যবহার করা হয়েছে।
আর, আপনার ঐ বাক্যটিতে তো মনে হলো- বর্তমানের কাব্যগুলোকেও চ্যালেঞ্জ জানানো হয়েছে!!!! বর্তমানের কাব্যগুলোর দিকে তাকানো আসলে ঠিক হবে না, তাহলে কোরআনকে আরো ন্যাংটো হতে হবে। আজকে ছন্দের যত বৈচিত্র, যত শক্তি তা ঐ আমলের কোন গ্রন্থের কাছ থেকে আশা করি না- তুলনাটাও ঠিক নয়; তবে আপনারা যদি সেই রকম চ্যালেঞ্জ দিয়ে বসেন তবে বিনীতভাবে জানাতেই হয় যে- বিশ্ব সাহিত্যে আল-কোরআনকে কেউ কোনদিন মহাকাব্য/কাব্য বলেনি বলেই আমি জানি।

কাব্যগুণকে সময় এবং প্রেক্ষিতে আলোচনা করাই ভালো। এবং কাব্যগুণে রবীন্দ্রনাথ আর কোরআনের তুলনা চলে না-এও ঠিক। কিন্তু কাব্যগুণ তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। মুহাম্মদ ভেবেছেন-এও অনেক-তিনি যে দৃশ্যকল্প তৈরি করেছেন-তা কম কিসে-আমার কাছে বেশ রোমাঞ্চকর মনে হয় কিছু কিছু অংশ।

আমিও মনে করি- কাব্যগুণ তথা যেকোন সাহিত্য বিচার সময় ও প্রেক্ষিতেই করা উচিৎ।
আমি চর্যাপদ- রামায়ন-মহাভারত-ওডিসি-ইলিয়ড প্রভৃতিতে অবশ্যই আজকের যুগের ছন্দের বৈচিত্র্য ও শক্তি খুঁজতে যাই না- এটাই স্বাভাবিক যে- ঐ আমলের কাব্যে পয়ার-চতুর্দ্দশপদী বা অমিত্রাক্ষর পাবো না। কিন্তু সমস্যা হয় যে- যখন কেউ কোন এক আমলের এক কাব্যকে সমস্ত যুগের জন্য সেরার রায় দিয়ে দেয় তখন। সে জায়গা থেকেই উপরের আলোচনাটি টানা- রবীন্দ্রনাথ, … প্রমুখের নাম আনা। আরেকটি উদ্দেশ্য আছে- সেটা হলো দেখানো যে- মানুষের পক্ষেই কি অসাধারণ সব সৃষ্টি সম্ভব।
উপরন্তু আমার কাছে কোরআনের কাব্যমান সে আমলের এবং তারও আগের আমলের কাব্যের সাথে তুলনাতেও খুব নিম্নমানের মনে হয়। কেননা- বাস্তবে কোরআন তো কোন কাব্যগ্রন্থ নয়- মুহম্মদ সা এর কোন উদ্দেশ্যও ছিল না- কোরআনের মাধ্যমে কাব্যচর্চা করার। তারপরেও একদল ধর্মান্ধ লোক এর কিছু কবিতার উদাহরণ টেনে একে সমস্ত যুগের সেরা কাব্য বলে দাবি করে- এতে আসলে কোরআনকেই তারা তামাশার বস্তু হিসাবে উপস্থাপন করেন। এবং এটা মনে করি জন্যই আমি- চর্যাপদ-রামায়ন-মহাভারত প্রভৃতি যেগুলো আসলেই কাব্য এবং অসংখ্য কবির কাব্য প্রচেষ্টারই ফল- সেগুলোর সাথে কোরআনের তুলনাটাও আমার কাছে সঠিক মনে হয় না (এ যেন মেঘনাদবধ কাব্যের কাব্যময়তার সাথে বিষাদ সিন্ধুর কাব্যময়তার তুলনামূলক আলোচনা!!)। তারপরেও সেরকম তুলনামূলক আলোচনা টানা- কারণ, বিশেষ সেই দাবি।
আপনি দৃশ্যকল্প সৃষ্টির কথা বলেছেন। হুম, সেটা আমিও স্বীকার করি, এবং কোরআন যতই পড়ি- ততই মুহম্মদ সা এর প্রতিভায় বিস্মিত হয়ে যাই। তার কল্পনাশক্তি খুবই অসাধারণ। মেরাজের কাহিনীটিও ধরুন। বা বেহেশত-দোযখের ডিটেইলিং গুলো দেখুন। সে সময়ের বিধর্মী- স্বধর্মী সকলের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব তিনি যেভাবে দিয়েছেন- খুব উচ্চমাপের কল্পনাশক্তির লোক না হলে তা সম্ভব নয়। একবার সাহাবীরা জিজ্ঞেস করছেন- সন্ধা নামলে সূর্য কোথায় যায়? সাথে সাথে জবাব- সূর্য গিয়ে আল্লাহর আরশের নীচে অবস্থান করে- ঠিক সুবেসাদিকের সময় সূর্য আবার চলে আসে… ইত্যাদি। এই যে- জবাবটি দিলেন, এখানেও কিন্তু দারুন কল্পনাশক্তির মিশেল আছে। এরকম- অসংখ্য বিষয়ে তিনি কথা বলেছেন- কোরআনে ও হাদীসে পাওয়া যায়- এবং এত অসাধারণ ভঙ্গীতে, সবই অনবদ্য। ধরেন, আল্লাহর যে ৯৯ টি নাম, মানুষেরই বিভিন্ন ভালো গুন সব আল্লাহর নাম হিসাবে দিয়েছেন- কিন্তু এমন খুটে খুটে মানুষের ৯৯ টি গুন বের করাও কিন্তু কম না।
এটা ঠিক যে- ইসলাম হিসাবে মুহম্মদ সা যা প্রচার করেছেন তার বড় অংশই তার নিজের আবিষ্কার নয়। সেখানকার বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষেরা অলরেডিই এগুলোর বড় অংশ বিশ্বাস করতো ও মানতো, নানা মিথ আগে থেকেই আরব অঞ্চলে প্রচলিত ছিল- কিন্তু সেগুলোকে নিজের মত রিমেক করা, সংকলন করাও আমার মনে হয় অসাধারণ ধীশক্তি ছাড়া সম্ভব নয়। এবং মাঝে মধ্যেই কোরআনে নানারকম দৃশ্যকল্প তৈরী হয়েছে। কিন্তু এসবকেই কি কাব্য বলা যায়? একটা রূপকথা গল্পে- ঠাকুরমার ঝুলি টাইপের বই এও চমৎকার সব দৃশ্যকল্প পাবেন- সেটাতে কি শুধু এটুকুই বলতে পারি না যে- এসবের রচয়িতার কল্পনাশক্তি খুব প্রখর ছিল (উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী পশুপাখির মুখে ভাষা দিয়ে গল্পগুলো পড়লে তো আমি এখনো মুগ্ধ হই- বা ঈশপের গল্প গুলোও লেখকের কল্নাশক্তির বহিপ্রকাশ ঘটায়)- কিন্তু কাব্য বা কবিতা হতে গেলে তো আরো কিছু লাগে!!
বাকারা- নিসা…… এসব সুরাকে কিকরে আপনি কবিতা বলবেন? কোনদিক থেকে এগুলোর কাব্যগুণ খুঁজে পাবেন?
আবার নাস-ফাতেহা-ফিল এরকম কিছু কবিতার ব্যাপারেও আগেই বলেছি- এগুলোর ছন্দ সেই প্রাচীণ আমলের কবিতাগুলোর সাথে তুলনা করেও নিম্নমানের মনে হয়েছে। কেননা- এগুলো একটু বেশী মাত্রায় একঘেয়ে- যেমন দেখুন:
রহিমের কলম আছে,
জব্বারের মলম আছে,
আবুলের বই আছে,
মিহিরের মই আছে,
কাদিরের কলস আছে,
নাদের খুব অলস আছে…..
সবগুলোর শেষে আছে….. এমনটি চললে- সেটি কি খুব ভালো লাগে? সুরা নাসে সব বাক্যের শেষেই নাস। অধিকাংশ কবিতার বেলাতেই ফর্মটা এই একই রকম। অথচ অন্তমিল রেখেই যদি কবিতার ছন্দ এমন হয়-
রহিমের কলম আছে,
জব্বারের মলম কাছে,
আবুলের আছে বই,
মিহিরের মই,
কাদিরের কলস,
নাদের খুব অলস…..
অন্তমিল থাকলেও কিন্তু ততোটা একঘেয়ে নয়। চর্যাপদ- রামায়ন-মহাভারতের ছন্দগুলো তাই আমার কাছে বেশী ভালো লাগে।
“বা যখন দেখি কুরআন ১৪০০ বছরের মাঝে বিন্দুমাত্র চেঞ্জ হয়নি যেখানে বাইবেল বা অন্যান্য ধর্মগুলি শত শত বার চেঞ্জ হয়েছে*। রাজা বা পাদ্রিরা নিজেদের মনের মত পরিবর্তন করেছেন। এর মধ্যে আমরা আল্লাহর ইচ্ছার প্রতিফলন দেখতে পাই। …..
…… অন্যান্য অনেক ধর্ম প্রকৃতপক্ষে ঈস্বরের কাছ থেকে আসলেও তা সময়ের পরিক্রমায় পরিবর্তন/ বিকৃত হয়ে গেছে এবং সময়ের পরিবর্তনের জন্য ধর্ম গ্রন্থ গুলির লেটেস্ট বা ফাইনাল ভারসন প্রয়োজন। এটাই যে ফাইনাল ভারসন এর প্রমাণ হচ্ছে, দেড় হাজার বছরেও এটার বিন্দুমাত্র অবিকৃতি। (আল্লাহ তায়ালা কুরআনে নিজেই কুরআনের সংরক্ষন করবেন বলেছেন বা অবশ্যই তা অবিকৃত আছে।)”
কোরআন অবিকৃত হয়নি মানে কি বুঝাতে চেয়েছেন? এবং তার দ্বারা কি প্রমাণ হয়?
আজকে মুদ্রণ যন্ত্র আবিষ্কারের পরে- লাখ লাখ কোটি কোটি বই আপনি যুগ যুগ অবিকৃত পাবেন। শেক্সপীয়রের নাটক, সনেটগুলো সব একই ফর্মে আপনি পাবেন- সামান্য দাড়ি-কমারও কমবেশ পাবেন না। চর্যাপদের পদগুলোও তো আপনি ঠিক আগের ফর্মেই পাচ্ছেন। এখনতো আমরা দুই/ আড়াই হাজার বছর আগের শিলালিপিও পাই- সেগুলোও তো অবিকৃত। এতে কি প্রমানিত হয়?
হুম, একটা সময়ে মুখে মুখে যখন জ্ঞান, সাহিত্য… প্রভৃতি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বা যুগ থেকে যুগে বিচরণ করতো – তখন সেগুলোর ক্ষেত্রে বিকৃতির সম্ভাবনা থেকেই যেত। এবং আমরা জানি আল-কোরআন পুরোটা এক সাথে লিপিবদ্ধ অবস্থায় মুহম্মদ সা মানুষের সামনে হাজির করেননি। প্রাথমিক অবস্থায় এটা খণ্ড খণ্ড ভাবে মুখে মুখে প্রচারিত ও বিচ্ছিন্নভাবে লিখিত অবস্থায় ছিল। ফলে- এটার বিশুদ্ধতা নিয়ে স্বভাবতই প্রশ্ন উঠেছিল, এবং সেকারণেই সে ব্যাপারে সকলকে নিশ্চিন্ত করার দায় কোরআনের ছিল। সেকারণেই আমরা কোরআনে আল্লাহকে বলতে দেখি- তিনিই এর সংরক্ষণকারী!!!
নিশ্চিৎভাবেই মেঘনাদবদকাব্য বা কিং লীয়র বা ওয়ার এণ্ড পীস এর ক্ষেত্রে এরকম অবিকৃতির ঘোষণা দেয়ার কোন প্রয়োজনই কেউ বোধ করেননি।
এবারে আসি- অন্যান্য প্রাচীণ গ্রন্থ সমূহের সাথে তুলনার বিষয়টিতে। অন্য ধর্মগ্রন্থসমূহ বিকৃত হয়েছে, কোরআন হয়নি!! এ কথাটির ফাঁক একটু দেখলেই বুঝা যাবে।
যেসমস্ত গ্রন্থ সমূহ লেখকের (আপনাদের ভাষায় যার উপর নাজিল হয়েছে তার) জীবদ্দশাতেই প্রামান্যরুপে উপস্থিত হয়েছে- সেগুলো নিয়ে বিকৃতির অভিযোগ আনাটা কি সম্ভব? এটা আনা হয়, লেখকের বা নাযেল হওয়া ব্যক্তির মৃত্যুর পরে সংকলিত হওয়ার ক্ষেত্রে। যেমন ধরেন- সক্রেটিস কোন কিছু লিখে যাননি। লিখেছেন, তার দুই শিষ্য। এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে- শিষ্য দুজন যা লিখেছেন- তার হুবাহু কি সক্রটিসের চিন্তা-দর্শনকে রিপ্রেজেন্ট করে? কিন্তু এটাও ঠিক যে- প্লেটো যখন প্রামান্যরূপে বা লিখিতরূপে প্লেটোর সংলাপ বা সক্রেটিসের জবানবন্দী লিখলেন- সেটা কিন্তু অবিকৃত হিসাবেই এবং অবশ্যই প্লেটোর লেখা হিসাবেই আমরা পাই।
একইভাবে, যেশাস ও মুহম্মদ সা দুজনের কেউই নিজে বাইবেল-কোরআনের এরকম প্রামান্য রূপে হাজির করতে পারেন নি। পরবর্তীতে তাদের অনুসারীরা এগুলো সংকলিত করেন। এখন প্রশ্ন উঠাটাই স্বাভাবিক যে, এখানে যা আছে তা আসলে ওনাদের প্রচারিত ধর্মমতকে হুবাহু ধারণ করে কি না? যেশাসের মৃত্যুর বেশ পরে যেহেতু এগুলো সংকলনের উদ্যোগ নেয়া হয়- সেহেতু বিচ্যুতির সম্ভাবনা একটু বেশি- সে তুলনায় কোরআনে একটু কম। কিন্তু একবার সংকলিত বা প্রামান্য রূপে পাওয়া গেলে- সেটা ঠিক ঠিক ভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা গেলে অবিকৃতরূপেই রাখা সম্ভব। আমরা তো এই উপমহাদেশেরই খৃস্টপপুর্ব আমলের বেশ কিছু গ্রন্থের সন্ধান পেয়েছি- এবং যেহেতু সেটা ঐ আমলের লিপিবদ্ধ- এবং সহজেই দাবি করা যায়- সেগুলো লেখক যেমন লিখেছেন- তেমনই আছে।
এরপরে আসে, একটি ধর্মগ্রন্থ প্রামান্য অবস্থায় পাবার পরেও সেটার ব্যাখ্যা নিয়ে নানামত। মূলত এটাকে কেন্দ্র করেই বাইবেলের পরবর্তি সংষ্করণ বের হয়েছে। পরবর্তীগুলোকে যেকেউ বিকৃত বলতে পারে- কিন্তু পুরানটাকে তো সেই অর্থে বিকৃত বলা যাবে কি? আর- এমন তো কোরআনের ক্ষেত্রেও পাওয়া যায়। কোরআন সংকলনের সময়ই সাহাবীদের মধ্যে মতভেদের কথা বিভিন্ন হাদীসেই আছে। আলী রা এর আপত্তির কথা আমরা জানি। বিভিন্ন ভাষারীতি নিয়ে ঝামেলার কথাও আমরা জানি। ওসমান কর্তৃক কোরআনের অন্য সব কপি ধ্বংস করার কথা আমরা জানি। হাফস ও ওয়ালস এর কোরআনের ভিন্নতার কথা আমরা জানি। শিয়াদের আলাদা কোরআনের কথা আমরা জানি। সর্বশেষ রাশাদ খলীফার সংশোধিত কোরআনের কথাও আমরা জানি। এসমস্তই নির্দেশ করে যে- কোরআনও বিভিন্ন সময়ে বিকৃত হয়েছে এবং এক গ্রুপের কাছে আরেক গ্রুপের কোরআন অবশ্যই বিকৃত কোরআন।
সুতরাং কোরআন অবিকৃত হলেই যে সেটা আল্লাহর লেখা এমনটা যেমন বলা যাবে না তেমনি- কোরআনও বিভিন্ন সময়ে বিকৃত হয়েছে, কোরআনকে বিকৃত করা হয়েছে এটা যখন পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে- তখন কি আল্লাহর অস্তিত্ব নিয়েই সন্দেহ তৈরী হওয়া উচিৎ নয়?
“বা যখন দেখি কূরআনে এক টা আয়াত নেই যা প্রতিষ্টিত বিজ্ঞান দ্বারা ভুল প্রমাণ করা যায়। তার বিপরিতে অন্যান্য ধর্ম গ্রন্থ গুলিতে অসংখ্য ভুল তথ্য, বা অসামনজন্য তথ্যে ভরপুর।
বা যখন দেখি কুরআনে বিজ্ঞানে অধুনা প্রমানিত অনেক বিষয় নির্ভুল ভাবে বর্নণা দেয়া হয়েছে।”
কোরআনের একটা আয়াত নেই যা প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞান দ্বারা ভুল প্রমান করা যায়- এটা যে বলে তার সম্পর্কে দুটো কথা অনায়াসেই বলা যায়: এক- হয় তিনি কোরআনের সব আয়াত পড়েননি, পড়ে বুঝেননি, নয় দুই- তিনি বিজ্ঞান সম্পর্কে নিতান্তই অজ্ঞ।
প্রাচীণ গ্রন্থসমূহের, তা সে ধর্মগ্রন্থই হোক- আর জ্ঞান-দর্শনের গ্রন্থই হোক, সেগুলোর মধ্যে অসংখ্য অসামঞ্জস্যতা আজকের প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞান যেমন খুজে পায়- একইভাবে কোরআনের আয়াতে আয়াতে বিজ্ঞান বিরোধী অসত্য অসামঞ্জস্য উদ্ভট কথাবার্তা পাওয়া যায়। আবার সেই সমস্ত প্রাচীণ গ্রন্থ সমূহে অনেক কিছুই পাবেন যেগুলো এখনও বিজ্ঞান গ্রহণ করে (এর দ্বারা এতটুকুই প্রমানিত হয় যে- ঐ বিষয়গুলোতে সে সময়েই মানুষ সঠিক জ্ঞানের সন্ধান পেয়েছিল!!)- তেমনি হয়তো কোরআনেরও কিছি কিছু বিষয় আজকের দিনের প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞান দ্বারা সঠিক বলা যাবে। কিন্তু তারমানে এই নয় যে- কোরআনের সমস্ত কিছুই আজকের বিজ্ঞান অনুমোদন করে!!! আদমের গল্প- ফেরেশতা-জ্বিন এর গালগল্প, যাদুবিদ্যা-তুকতাকের গল্প, নবীদের অলৌকিক ক্ষমতার গল্প…. এগুলো সবই আজকের বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে নেহায়েত গালগল্পই। আসমান-যমিন নিয়ে যেসব কথাবার্তা আছে, প্রাণীর-মানুষের সৃষ্টি, মানুষের জন্ম-ভ্রূণের বিকাশ এসব নিয়ে কথাবার্তা আজকের বিজ্ঞানের চোখে ভ্রান্ত। এমন অনেক কিছুই আছে। আপনি নিজে আরেকটু পড়াশুনা করুন, চোখ কান খোলা রাখুন- মনের জানালা খুলে দিন- নিজেও বুঝতে পারবেন।
আর, অধুনা প্রমানিত অনেক বিষয় কোরআনে নির্ভুলভাবে বর্ণনা দেয়া আছে- এমন দাবী আসলে একরকমের মিথ্যাচারের ফসল। বর্তমানের বিজ্ঞানের যুগে – সব ধর্মই নিজেদের একটু জাতে তোলার জন্য এ কাজটি করে যাচ্ছে। এ বিষয়ে আমার একটি পোস্ট ছিল- তাই নতুন করে কিছু বলছি না- সেটিই আবার পড়ার আহবান জানাই।
“যখন মনে হয় যে, মহানবী (সাঃ), যিনি ছিলেন একজন নিরক্ষর ব্যক্তি, তিনি কিভাবে মনগড়া ভাবে ২৩ বছর ধরে অসামঞ্জস্যহীন গ্রন্থ রচনা করলেন যা একইসাথে ১) মানব জাতির জন্য পথ প্রদর্শক, ২) যা তথ্যের অসামঞ্জস্যতা নেই, ৩) যাতে প্রদত্ত কোন তথ্যের বৈজ্ঞানিক ভুল নেই, ৪) অধুনা বিজ্ঞান প্রমান করছে/ খুজে বের করছে এমন তথ্য ও দেয়া আছে, ৬) যা অস্বাধারণ কাব্যে ভরপুর ৫) যা দেড় হাজার বছরেও চেঞ্জ হয়নি। ৬) এটিই একমাত্র গ্রন্থ যা অধিকাংশ মানুষ পুরোপুরি মুখস্ত রাখতে পারে, ৭) এটিই একমাত্র গ্রন্থ যা বিশ্বের হাজার হাজার লোক মুখস্ত রেখেছে। ফলে কুরআনের সমস্ত কপি পুড়িয়ে ফেললেও কুরআনকে ধংশ করা সম্ভব না।”
০) মুহম্মদ সা আদৌ নিরক্ষর ছিলেন কি না- তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে যথেষ্ট মতভেদ আছে। তার প্রতি প্রথম ওহী- পড়ো। প্রাথমিক জীবনে তিনি সফল বনিক ছিলেন- সেগুলোর হিসাবাদি তাঁকেই করতে হতো। তিনি বিভিন্ন শাসকদের উদ্দেশ্যে লিখিত পত্র পড়ে সংশোধন করে দিয়েছেন এরকম হাদীসও মিলে। যাহোক তারপরে ধরে নিচ্ছি যে- তিনি নিরক্ষর ছিলেন। কিন্তু লেখতে – পড়তে না জানা মানেই কি বুদ্ধিহীন? বা মুহম্মদ সা নিরক্ষর মানে কি কেউ বলবেন যে তিনি অসাধারণ ধীশক্তির অধিকারী ছিলেন না?
প্রাচীণ আমলের অসংখ্য গুনী মানুষের কথা আমরা জানি যারা ক-অক্ষর গোমাংস ছিলেন, শুধু মাথার মধ্যেই মুখে মুখেই তারা তাদের অনবদ্য সব সৃষ্টি করে গেছেন। ফলে- মুহম্মদ সা লেখতে পড়তে না জানলেই যে- তার নেতৃত্ব ক্ষমতা, দারুন অনুসন্ধিৎসু মন, গভীরে চিন্তা করার ক্ষমতা, দূর দৃষ্টি থাকবে না- এমনটি কেউ নিশ্চিৎভাবে বলতে পারবে না। আর এসমস্ত গুনের অধিকারী হলে, এবং সাথে আরো কিছু চৌকশ মানুষ থাকলে কোরআনের মত গ্রন্থটি রচনা করা অসম্ভব মনে হয় না।
আরেকটি বিষয় এখানে বলতে হবে- আজকের কোরআনটি আমরা পাই- ওসমানের হাত ধরে- তারও আগে আবু বকরের আমলে কোরআন সংকলন কমিটি প্রথম উদ্যোগটি নেয়। এই কমিটিতে যারা ছিলেন- তাদের মধ্যেও চৌকশ সাহাবী, কবি প্রতিভার সাহাবিরা ছিলেন। ফলে- আজকের কোরআনকে আমরা যে ফর্মে দেখি- সেটি একা মুহম্মদ সা এর অবদান এমনটি না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। যে কারণে আলী রা কে প্রতিবাদ পর্যন্ত করতে দেখা যায়।
১) মানব জাতির পথ প্রদর্শক- একথাটি ভুল। আজকের দুনিয়ার অমুসলিম অংশ কোরআনকে ছাড়াই ভালো চলতে পারছে, ফলে তাদের জন্য এটা কোনমতেই পথ প্রদর্শক নয়; উপরন্তু মুসলিম বিশ্বও আজ যতই তাদের বিশ্বাসে আল্লাহকে রাসুলকে- কোরআনকে উচ্চে স্থান দেক না কেন- কোরআনের সবকিছুই তারা নিজেরাও পালন করে না বা পালন করা সম্ভব না জন্যেই পালন করে না।
নিজে পুরো কোরআন অর্থসহ এবং শানে নুযুল সহ নিজে একটু খুটিয়ে পড়লেই বুঝতে পারবেন কোরআন টা পুরো মানব জাতির পথ প্রদর্শক নয়। দেখতে পারবেন এখানে কিভাবে নবীজীর বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষিতে একেকটা আয়াত/সুরা অবতীর্ণ হয়েছে। এমনকি তাঁর স্ত্রীদের মধ্যে যখন মনোমালিন্য তৈরী হয়েছিল- সেটাকে সামাল দিতে গিয়েও আয়াত নাযেল হয়েছে- বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সাহাবীরা বিভিন্ন সমস্যায় পড়ে নবীজীর কাছে আসলে আয়াত নাযেল হয়েছে, বিধর্মীরা প্রশ্ন করতে আসলে আয়াত নাযেল হয়েছে- সাহাবীদের উদ্দীপ্ত করার জন্য আয়াত নাযেল হয়েছে… এসবের মধ্যে সহজেই বুঝতে পারবেন একটা বড় অংশই একদম স্পেসিফিক কিছু ঘটনা, কিছু মানুষকে নিয়ে সুরা আছে- সেগুলো কোনভাবেই সমগ্র মানুষের জন্য পথ প্রদর্শক বলতে পারবেন না। একজন ব্যক্তির নামে (বিধর্মী) পর্যন্ত একটা সুরা আছে- এবং সেখানে এমন ঘৃণা ছড়ানো হয়েছে- দেখলে বুঝতে পারবেন – এটা মানব জাতির জন্য পথ প্রদর্শক কিনা!!!!!
২) অনেক তথ্যেরই অসামঞ্জস্যতা আছে। আগের কমেন্টে কিছু বলেছি। এছাড়া বিভিন্ন অসামঞ্জস্যের জন্যই মুসলিমদের মধ্যে এত ভাগ- এতগুলো মাযহাবের সৃষ্টি।
৩) বৈজ্ঞানিক তথ্যের হাজারো ভুল আছে- তা আগেই বলেছি, আমার উপরের দেয়া পোস্টের লিংক দ্রষ্টব্য।
৪) অধুনা বিজ্ঞান বের করেছে এমন অসংখ্য কিছু কোরআনে নেই- এবং এমন অসংখ্য কিছু কোরআনের বিভিন্ন আয়াতের সাথে সাংঘর্ষিক। আর, কোরআনেই এমন জিনিস পত্র আছে- এরকম দাবি নির্ভেজাল মিথ্যাচার ও ধাপ্পাবাজি সেটাও আগে বলেছি।
৫) দেড় হাজার বছরে চেঞ্জ হয়েছে- সেটা তো বলেইছি। আর- আরো এমন অনেক গ্রন্থ পাবেন যা আরো অধিক সময় ধরে অবিকৃত অবস্থায় আছে।
৬) এটার কাব্যগুন নিয়েও উপরে বলেছি। যতখানি আছে- সেটার ব্যাপারে মুহম্মদ সা এর কিছু কবি সাহাবীর নাম শোনা যায়। ধরলাম- সেগুলো সাহাবীদের কাজ নয়, তারপরেও এ সিদ্ধান্ত নেয়া যেতে পারে যে- মুহম্মদ সা এর কাব্য প্রতিভাও ছিল। কিন্তু সেটাকে যদি আল্লাহর সৃষ্টি হিসাবে মানতেই হয় তবে আজকের যুগে এসে বলতেই হবে- আল্লাহর কাব্য প্রতিভা ইয়েটস- ইলিয়ট- জীবনানন্দ, রবীন্দ্রনাথ, শেক্সপীয়র, মধুসুদন প্রমুখের তুলনায় অতি নিম্নমানের।
৭) এটা ঠিক যে- কোরআন মুখস্থকারীর সংখ্যা অনেক। এককালে হয়তো অন্য অনেক গ্রন্থই মানুষ মুখস্থ করে রাখতো- কিন্তু বর্তমানে এই অপ্রয়োজনীয় কাজটি কিছু ধর্মান্ধ ব্যক্তিই করে রাখে। ভগবৎগীতা, এমনকি বাইবেল মুখস্থ করা লোকও দুনিয়ায় আছে। সেই গ্রন্থগুলো আরো প্রাচীণ- এতে কিছু প্রমাণ হয় না। আর এটাও ঠিক যে- কোন গ্রন্থের সমস্ত কপি পুড়িয়ে ফেলা হলে- তার মুখস্থকারী একজনও জীবিত থাকলে সে গ্রন্থকে পুনরিজ্জীবিত করা যাবে। সেটা কোরআন কেন- যেকোন গ্রন্থের জন্য সত্য।
তবে- আমাকে যদি বলা হয়- দুনিয়ার সমস্ত কিছু ধ্বংস করা হবে- শুধু একটা বই রক্ষা করা যাবে- এমন শর্তের মুখে আমি কোরআন নয়- একটা সায়েন্স এনস্লাইকোপিডিয়া নিতাম। সেরকম সুযোগ না পাওয়া গেলে- আমি বিজ্ঞানের লেটেস্ট সমস্ত সূত্রগুলো লিপিবদ্ধ করে একটা বই বানিয়ে সেটি রক্ষা করতাম। কেননা একমাত্র সেটা হাতে নিয়েই মানুষ সবচেয়ে অল্প সময়ে সভ্যতাকে আগের অবস্থানে নিয়ে যেতে পারবে। কোরআনকে নিয়ে যেটা কখনো সম্ভব নয়।

বুধবার, ২০ জুলাই, ২০১১

Inqilqb 25th Aniversery

শুক্রবার, ১৭ জুন, ২০১১

এম এল এম ব্যবসার নামে প্রতারণা!

সম্প্রতি মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এম এল এম) বা ডিরেক্ট সেলস ব্যাবসা বেশ জাঁকিয়ে বসেছে আমাদের দেশে। আর এদের প্রতারণার ফাঁদে পা দিয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছে দেশের লক্ষ্ লক্ষ মানুষ। অত্যন্ত লোভনীয়, অকল্পনীয়, অফার আর অল্পদিনে কোটি পতি হবার স্বপ্ন নিয়ে ঝুঁকছে দেশের হাজার হাজার বেকার যুবক। শুধু বেকার যুবকই নয়, অনেক শিক্ষিত কর্ম জীবী লোকজন ও ছুটছে এই ব্যবসার দিকে। আলাদীন এর যাদুর প্রদীপ এর মত রাতা রাতি কোটিপতি হতে কে না চায়! কিন্তু আমাদের দেশের এম এল এম ব্যাবসা যেই ভাবে এগুচ্ছে তাতে করে এর ভয়াবহতা আমরা ইতি মধ্যেই টের পেয়েছি। সামনে ও পাবো হয়তোবা । আমেরিকার কনসেপ্ট মাথায় নিয়ে শ্রীলঙ্কার এক ভদ্র লোক আই লিঙ্ক নামের একটি প্রতিষ্ঠান এর মধ্যে দিয়ে এই দেশে এম এল এম ব্যবসার সাথে যুক্ত হন। সেই প্রতিষ্ঠানে রফিকুল নামে আর একজন কাজ করতেন। বর্তমানে তিনি ডেস্টিনি ২০০০ লিঃ এর কর্ণধার। ডেস্টিনি কারো সাথে প্রতারণা করেছে কিনা আমার জানা নেই। তবে সম্প্রতি ব্যাঙের ছাতার মত আগানে-বাগানে অযাচিত ভাবে যেই সব এম এল এম কোম্পানি গড়ে উঠেছে, তাদের নিয়ে অভিযোগের কোন শেষ নেই। এম এল এম কনসেপ্ট সম্পর্কে আমাদের ধারনা খুব ই কম। তাই প্রতারণার স্বীকার হচ্ছি আমরা ইতি মধ্যেই সর্ব শান্ত হয়ে গেছে কয়েক লাখ মানুষ। uni pay 2 you bd এর খপ্পরে পড়ে লক্ষ লক্ষ টাকা খুইয়েছেন অনেক সদস্য ও এজেন্ট। আইন এর মারপ্যাঁচে পড়ে অনেকে তাদের টাকা রিফান্ড পাননি। সম্প্রতি এর ভয়াবহতা এত প্রকট হয়ে গেছে যে ঢাকার শহরের হাতির পুল ও মোতালেব প্লাযায় প্রায় ৩০ টির মত ভুয়া এম এল এম কোম্পানি ব্যাবসা করছে।প্রতিটা জেলা শহরে এখন ৫ থেকে ১০ টির মত সাব অফিস! প্রসাশন একেবারে নির্বিকার! অর্থ মন্ত্রনালয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক কেমন যেন নিস্ক্রিয়! এইসব হায় হায় কোম্পানির মধ্যে একটি কোম্পানির কথা আমি জানি। এটির নাম “ আর্থ ডিস্টিবিউশন” এই কোম্পানির মালিক একুশে টিভির এক সাক্ষাত্কারে বলেছেন সমাজের অনেক বড় ও প্রতিষ্ঠিত ব্যাক্তি তার সাথে পার্টনার হিসাবে আছেন। উচ্চ পদস্থ সামরিক কর্মকর্তা , এমন কি বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের অনেক নেতা ও নাকি জড়িত এই ব্যবসার সাথে। তাহলে বিষয়টি তো মারাত্মক! এম এল ব্যাবসা পৃথিবীর বহু দেশে আছে। এটি বৈধ। তবে বাংলাদেশে এ কি ভয়ঙ্কর অবস্থা! একটু আলোচনা করি।
আর্থ ডিস্টিবিউশন এর এজেন্ট শিপ নিতে হলে প্রথম ২৫০০০০ টাকা সদস্য হিসাবে, এবং ৭৫০০০০ টাকা দিতে হবে ডিলার শিপ বাবদ। ঠিক আছে দিলাম। তার পর। এক ভয়া বহ সিস্টেম! মাত্র ৬ মাসেই কোটি পতি। কিন্তু কিভাবে? আমরা জানি এম এল এম এর একটি দুষ্ট চক্র আছে। প্রথমে এক হাত। তার পর ২। ২ থেকে ৪। ৪ থেকে ৮। এইভাবে যত হাত বাড়বে তত বিল গেটস হবার হাতছানি! এই প্রতিষ্ঠান যে কোন অঙ্কের অর্থ মাত্র ৬ থেকে ১০ মাসে দিগুণ বানিয়ে দেবে! এম এল এম কোম্পানি যদি ১০ মাসে ২ গুন মুনাফা দেয়, তবে আমাদের দেশের ব্যাংক কি আঙ্গুল চুষবে? তারা কেন পারেনা ১০ মাসে ২ গুন দিতে? কেন তারা ডাবল বেনিফিট ৭ বছর পরে দেয়? কারন ১০ মাসে পৃথিবীর কোন ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান ২ গুন লাভ দিতে পারেনা। এক মাত্র হায় হায় কোম্পানি ছাড়া! এই প্রতিষ্ঠান অয়াল মেট, আর সাপের বিষ এর ব্যাবসা করবে বলে সদস্যদের কাছ থেকে জামানত সংগ্রহ করে। অত্যন্ত সহজ, সরল, গ্রামের পুরুষ, মহিলারা আগ্রহী হয়ে ওঠে। ইস যদি ১০ মাসে ২ গুন পাওয়া যায়। শুধু ২ গুন নয়, এর পরে ও আছে কমিশন। যত সদস্য বাগিয়ে আনতে পারবে, ততো কমিশন!
শুধু গ্রামের সহজ, সরল প্রান মানুষ গুলী কি প্রতারিত হচ্ছে? শহরের অনেক চতুর লোক ও ধরা খাচ্ছে। আমারই এক বন্ধু মান্না একটি মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানির পদস্থ কর্মকর্তা, সেও ধরা খেয়েছে! ব্যাচারা হিসাব বিজ্ঞানে মাস্টার্স, তারপরে এম বি এ। হিসাব বিজ্ঞানে পড়েও হিসাব মেলাতে পারেনি কেমন করে ১০ মাসে ২৮০০০০ টাকা ২ গুন হয়ে ২৮০০০০*২= ৫৬০০০০ টাকা হয়। এই হচ্ছে অবস্থা। কিছুদিন পূর্বে অর্থ মন্ত্রী বলেছিলেন,
এই সব হায় হায় কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যাবস্থা নেওয়া হবে। এবং এম এল এম ব্যবসার একটি সঠিক নীতিমালা প্রনয়ন করা হবে।
এমএলএম নীতিমালা প্রণয়নের জন্য অতিরিক্ত বাণিজ্যসচিব এম মর্তুজা রেজা চৌধুরীকে প্রধান করে একটি কমিটি করা হয়। সেই কমিটি অর্থ মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ), আরজেএসসি, ঢাকা সিটি করপোরেশন এবং এমএলএম কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করেছে।
এমএলএম কোম্পানির প্রতিনিধিরা এসব বৈঠকে বলেছেন, যেসব পণ্যের বাস্তব অবস্থান নেই, সেগুলোও এমএলএম পদ্ধতিতে পরিচালিত হচ্ছে। এগুলো বন্ধ করতে হবে। অনেকে দেশে বসে বিদেশে বাড়ির ব্যবসা করছেন বা কাল্পনিক সেবায় অর্থ বিনিয়োগ করছেন। এমনকি বাংলাদেশে কোনো কার্যালয়ও নেই তাঁদের। অথচ কোটি কোটি টাকা নিয়ে যাচ্ছেন বিদেশে।বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহ উদ্দিন সাহেব সকলকে সতর্ক করে বলেছেন এই সব চক্রে যেন কেউ পা না দেয়।
সবার উদ্দেশ্যে একটি কথা বলতে চাই। হায় হায় এইসব কোম্পানি থেকে সাবধান! কোন বিনিয়োগ করার পূর্বে অবশ্যই আগে দেখে নিন, তাতে বাংলাদেশ ব্যাংক এর অনুমতি আছে কিনা? ফাইনান্স মন্ত্রনালয় এর কি স্মারক রয়েছে?আর আবার ও বলি কোন অর্থ ১০ মাসে ২ গুন সম্ভব নয়। কাজেই সাবধান!