বুধবার, ৫ জুলাই, ২০২৩
বাংলা সাহিত্যের সংগ্রামী ও শক্তিমান কথাসাহিত্যিক পল্লী কবি জসিমউদদীন,,,,
মোঃ নজরুল ইসলাম
একবার এক সাহিত্য সভা থেকে ফিরছিলেন কবি নির্মলেন্দু গুণ।পদ্মার উপর নৌকায় বসে, হঠাৎ নৌকা একটু বেসামাল হয়ে উঠল। নির্মলেন্দু গুণের সঙ্গী গোলাম সাবদার সিদ্দিকি মাঝিকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বললেন 'মিয়া একটু সাবধানে নৌকা চালাও এখানে বাংলা সাহিত্যের বড় বড় সব কবিরা আছেন'। বৃদ্ধ মাঝি সেকথা শুনে কার্যত হতবাক হয়ে পড়লেন। তাঁর ধারণা জসীমউদ্দীনের পরে কেউ কবি হতে পারেন না। এমনকি স্বয়ং নির্মলেন্দু গুণের পিতাও পদ্মানদীর মাঝির মত মনে করতেন বাংলা সাহিত্যে কবি বলতে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ও জসীমউদ্দীন।তাঁর ছেলে যে কবি পিতা সেকথা বিশ্বাসই করতে চাননি। পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের অসম্ভব জনপ্রিয়তার অনেকটা হদিশ মেলে প্রবীন মাঝি কিংবা নির্মলেন্দু গুণের পিতার বিশ্বাসে।
কাজী নজরুল ইসলামের যদি হয 'বিদ্রোহী', জীবনানন্দ দাশের 'বনলতা সেন ', জসীমউদ্দীনের তেমন 'কবর'। খুব ছোট বয়সে প্রেম, বিদ্রোহের কবিতা না লিখে জসীমউদ্দীন লিখেছেন স্বজনহারা বৃদ্ধের করুণগাথা। কবিতা পড়ে পাঠকরা বুঝতে পারেন না এই কবিতা এক তরুণের সৃষ্টি। কুষ্ঠিয়া থেকে ডাক পেলেন এক সাহিত্য সভায়। সেটা তাঁর জীবনের প্রথম কোনও অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পাওয়া। সংগঠকরা কবিকে চেনেন না, কবি রেলস্টেশনে নেমে দেখলেন কেউ তাঁকে অভ্যর্থনা করতে আসেন নি। তবে বিশ, পঁচিশের মত লোক ছিলেন,তারা কারও জন্য অপেক্ষা করছেন। জসিমউদ্দীন তাদের বলতে উত্তর পেলেন কবি জসীমউদ্দীনের এই গাড়িতে আসার কথা,তারা তাঁর জন্য অপেক্ষা করছেন। তরুণ কবি নিজের পরিচয় দিলেও তাদের বিশ্বাস হল না। পরে অবশ্য ভুল ভাঙলে বিস্ময়ের পালা।
জসীমউদ্দীনের 'কবর' যখন ম্যাট্রিক ক্লাসের পাঠ্য হয় কবি তখনও বি এ পাশ করেন নি। দীনেশচন্দ্র সেন জসীমউদ্দীন কে বলেছিলেন 'তোমার কবিতাটি ম্যাট্রিক ক্লাসের পাঠ্য হয়েছে আমার যতদূর জানা আছে পৃথিবীর কোনও দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনও ছাত্রের লেখা এ পর্যন্ত পাঠ্য হয় নাই '। সবসময় স্বপ্ন দেখতেন কলকাতায় সাহিত্য মহলের স্বীকৃতি। মনে মনে বিশ্বাস করতেন কলকাতায় আসলেই তিনি কবি হিসেবে পরিচিতি পেয়ে যাবেন। তবে জসীমউদ্দীনের পিতৃদেবের এই বিষয়ে একদমই সায় ছিল না, বরং তিনি মনে করতেন পুত্রের এই কবিতা লেখার নেশায় পড়াশোনা ক্ষতি হচ্ছে।দেশে তখন ইংরেজ বিরোধীতা বাড়ছে,পল্লীকবিও পড়াশোনা ছেড়ে কলকাতায় চলে এলেন। উঠলেন বোনের বাড়িতে। তাদের আর্থিক অবস্থা ভাল না হওয়ায় নিজেই অর্থের খোঁজে বেরিয়ে পড়লেন। শুরু করলেন রাস্তায় নেমে খবরের কাগজ বিক্রি। গরম -গরম খবর হেঁকে বিক্রি করতেন। মানুষ আকৃষ্ট হতেন তাঁর বলার ভঙ্গিমায়।বহু সময় খরচ আর পরিশ্রমের পর সব কপি কাগজ বিক্রি হলে লাভ হত চোদ্দ পয়সা।এর সঙ্গে কবিতা লেখা চলছিল।
সত্যি সত্যি জসীমউদ্দীনের কাব্যপ্রেম, সাহিত্য চর্চা,গ্ৰাম্য গান সংগ্ৰহে ব্যস্ত থাকায় পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটছে।বি এ পাস করতে অনেক বছর লেগে যায়।যে বছর নক্সী-কাঁথার মাঠ প্রকাশ হল সেই বছর তিনি স্নাতক হলেন। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে অবনীন্দ্রনাথের কাছে অনেকদিন ধরে যাওয়ার সুযোগ হলেও কবিগুরুর মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ হয়নি। তবে একদিন জসীমউদ্দীন গেলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে দেখা করতে। নিজের দুটো বই কবিগুরুর হাতে তুলে দিলে তিনি বলেছিলেন তোমার বই আমি পড়ব। পরে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে, রবীন্দ্রনাথ, জসীমউদ্দীন কে শান্তিনিকেতনে থেকে সেখান থেকে এম এ পরীক্ষা দিতে বললেন। অবশ্য সেই অনুরোধ তিনি রক্ষা করতে না পারলেও পেলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দরাজ প্রশংশা। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন জসীমউদ্দীনের কবিতার ভাব, ভাষা,রস সম্পূর্ণ নতুন ধরনের। প্রকৃত কবির হৃদয় এই লেখকের আছে।অতি সহজে যাদের লেখবার শক্তি নেই,এমনতর খাঁটি জিনিস তারা লিখতে পারে না।
পরিশেষে হয়ত মনে প্রশ্ন জাগে জসীমউদ্দীন কাদের কবি! সমালোচক, পাঠকরা একটি বিষয়ে হয়ত একমত হবেন অনেকেই গ্ৰাম নিয়ে লিখেছেন কিন্তু জসীমউদ্দীন যে গ্ৰাম নিয়ে লিখেছেন তার স্বাদ অন্যরকম।তার কবিতায় প্রকৃতির থেকে মানুষ বড়। তিনি গ্ৰাম দেখেছেন গ্ৰামের মানুষের চোখ দিয়ে। সেখানেই তাঁর কবিতা ভিন্ন,স্বকীয়, আলাদা রূপ,রসে পরিপূর্ন। তবে নিন্দুক বলতেন কবি নাকি বেশ কৃপণ ছিলেন, তাঁর নিজের বিয়ের দিনে শ্যালিকারা অনেকক্ষণ দরজা আটকে রেখে কিছুতেই একটি পয়সা আদায় করতে পারেন নি। খেতে ভালবাসতেন মুড়ি ভাজা।মুটের মাথায় বই চাপিয়ে একদিন অন্তর বাংলা বাজারে যেতেন
তাঁর সৃষ্টি ও কর্মের প্রতি কৃতজ্ঞতা অশেষ,,
সরকারি প্রকল্পে অধিগ্রহণের আগেই জমি কিনে নেন মন্ত্রী ও তাঁর ছেলেমেয়ে
আহমদুল হাসান
মানিকগঞ্জে সরকারি ওষুধ কারখানার জন্য যে সাড়ে ৩১ একর জমি প্রস্তাব করা হয়েছে, সেখানকার ১১ একর ১৪ শতক জমি কেনেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের মেয়ে সিনথিয়া মালেক। তিনি এ জমি ভরাট করে ভিটি শ্রেণিতে পরিবর্তন করেন। মাস সাতেক পর ওষুধ কারখানা স্থাপনের প্রকল্প পাস হয়। তার ২০ দিন আগে কেনা মূল্যের প্রায় দ্বিগুণ দেখিয়ে এসব জমি স্বামী আলতাফ আকমলকে দান করেন সিনথিয়া। এখন সরকার এ জমি অধিগ্রহণ করতে গেলে সর্বশেষ মূল্যের তিন গুণ বেশি টাকা দিতে হবে। অর্থাৎ স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মেয়ে সাড়ে ৭ কোটি টাকায় যে জমি কিনেছেন, সেটা সরকার অধিগ্রহণ করলে ৪০ কোটি টাকা পাবেন তিনি বা তাঁর স্বামী।
প্রস্তাবিত ওই স্থানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান বিডি সান লিমিটেডের নামে কেনা হয় ৬ একর ৩৯ শতক জমি। মন্ত্রীর ছেলে রাহাত মালেকের মালিকানাধীন রাহাত রিয়েল এস্টেটের নামে কেনা হয় ৩ একর ১২ শতক জমি। অর্থাৎ সাড়ে ৩১ একর জমির মধ্যে ২০ একর ৬৫ শতাংশ জমি মন্ত্রী, তাঁর ছেলে ও মেয়ে কিনেছেন।
এরপর শ্রেণি পরিবর্তন করে এক লাফে জমির মূল্য (মৌজা দর) পাঁচ গুণ বৃদ্ধি করা হয়। তারপর তিনজনই এসব জমি বর্ধিত দরে (মৌজা রেটে) ঘনিষ্ঠজনদের নামে দান বা বিক্রি করেছেন। এর বাইরে মন্ত্রীর ফুফাতো ভাই শামীম মিয়া কিনেছেন আরও ৫ একর ৫৪ শতক জমি।
প্রকল্পের ধারণার শুরু থেকেই এটাকে সম্পদ বিকাশের উপায় হিসেবে দেখেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা।
ইফতেখারুজ্জামান, নির্বাহী পরিচালক, টিআইবি
প্রকল্প পাসের পর ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া শুরুর পর্যায়ে জেলা ভূমি ব্যবস্থাপনা কমিটির পর্যালোচনায় প্রস্তাবিত জমি নিয়ে এমন কারসাজির বিষয়টি উঠে আসে। এমন পরিস্থিতিতে এই জমিতে প্রকল্প করতে গেলে ভূমি অধিগ্রহণে সরকারের প্রায় ১০০ কোটি টাকা বেশি ব্যয় হবে। এর পরিবর্তে পাশের কোনো মৌজায় প্রকল্প করলে সরকারের এই টাকা সাশ্রয় হবে। বিষয়টি জানিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেন মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসক।
এই চিঠি দেওয়ার পরপর বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তুলে জেলা প্রশাসকের অপসারণ দাবিতে আন্দোলনে নামেন ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতা-কর্মীরা। এই আন্দোলনের নেতৃত্বে দেন মন্ত্রীর ফুফাতো ভাই মো. ইসরাফিল হোসেন, যিনি মানিকগঞ্জ সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। তিনি শামীম মিয়ার বড় ভাই।
প্রকল্পটি হচ্ছে সরকারি ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেডের (ইডিসিএল) মানিকগঞ্জে কারখানা স্থাপন। ২০২২ সালের ৫ এপ্রিল জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) প্রকল্পটি পাস হয়। এতে মোট ব্যয় ধরা হয় ১ হাজার ৯০৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে জমি অধিগ্রহণের জন্য ব্যয় ধরা হয় ১১৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। সরকারি অর্থায়নে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে ২০২২ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৭ সালের মার্চ পর্যন্ত। প্রকল্পের জন্য মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার জাগীর ইউনিয়নের মেঘশিমুল এলাকায় সাড়ে ৩১ একর জমি প্রস্তাব করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, প্রকল্প কোথায় হবে, সেটা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় প্রকল্প পাসের সময় প্রস্তাব করে থাকে। তাই প্রকল্প পাসের আগেই ওই এলাকার জমি কিনে নিয়ে শ্রেণি পরিবর্তন এবং তারপর সে জমি অন্যের নামে হস্তান্তর ও মূল্যবৃদ্ধির এই কার্যক্রমকে ক্ষমতার অপব্যবহার হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
নিয়ম অনুযায়ী, সরকারি কোনো প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ করা হলে জমির মালিক ক্ষতিপূরণ হিসেবে মৌজা দরের তিন গুণ দাম পান। অভিযোগ উঠেছে, অধিগ্রহণ বাবদ সরকারি কোষাগার থেকে ১০০ কোটি টাকা বের করে নিতে কারসাজির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি তুলে ধরে গত ফেব্রুয়ারিতে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেন মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ আবদুল লতিফ।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসক প্রথম আলোকে বলেন, প্রস্তাবিত স্থানে জমি অধিগ্রহণ করলে সরকারের ১০০ কোটি টাকা ক্ষতি হবে। ভূমি ব্যবস্থাপনা কমিটি মেঘশিমুল মৌজায় প্রস্তাবিত জমির সম্ভাব্যতা যাচাই করার পরই বিষয়টি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং সরকারকে অবহিত করে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমি যা বলার চিঠিতে উল্লেখ করেছি। এর বাইরে আমার কোনো বক্তব্য নেই।’
যেভাবে জানাজানি হলো
মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসন থেকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, সরকারি ওষুধ কারখানা স্থাপনের জন্য মানিকগঞ্জের মেঘশিমুল মৌজায় সাড়ে ৩১ একর জমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব পাওয়া গেছে। গত ডিসেম্বরে জমি অধিগ্রহণের জন্য সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়।
প্রস্তাবিত জমির শ্রেণি নাল (কৃষি) হলেও সম্প্রতি বালু ভরাট করে ভিটি (বাড়ি) শ্রেণি করা হয়েছে। একই সঙ্গে পরিকল্পিতভাবে মহাপরিদর্শক নিবন্ধনের একটি স্মারকে এবং মানিকগঞ্জ জেলা নিবন্ধকের একটি স্মারকে ভিটি (বাড়ি) শ্রেণির প্রতি শতাংশ জমির মূল্য ২৫ হাজার থেকে এক লাফে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা করা হয়। অর্থাৎ ভিটি (বাড়ি) শ্রেণির জমির মূল্য বাড়ানো হয় প্রায় পাঁচ গুণ। তবে আশপাশের কোনো মৌজায় জমির মূল্য বাড়ানো হয়নি।
মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, মেঘশিমুল মৌজায় ভিটি শ্রেণির জমির সরকারি মূল্য বাড়ানোর জন্য স্বাস্থ্যমন্ত্রী আইন মন্ত্রণালয়ে ডিও লেটার (আধা সরকারি সুপারিশপত্র) দেন। এরপর ২০২১ সালের ডিসেম্বরে হঠাৎ করেই ওই মৌজার ভিটি শ্রেণির দাম পাঁচ গুণ বেড়ে যায়; যা অস্বাভাবিক।
প্রথম আলোর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ভিটি শ্রেণির মূল্য পাঁচ গুণ বাড়ানোর দুই মাস পর মন্ত্রী ও তাঁর ছেলে যখন সাড়ে ৯ একর জমি উচ্চ মূল্য দেখিয়ে বিক্রি দেখিয়েছেন, ঠিক সেই সময়েই সেখানে নাল শ্রেণির জমি কেনা শুরু করেন মন্ত্রীর মেয়ে সিনথিয়া মালেক।
এটা ‘সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে করা হয়েছে মর্মে প্রতীয়মান হয়’ বলে মন্ত্রণালয়ে লেখা মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসকের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। চিঠিতে বলা হয়, যেখানে মেঘশিমুল মৌজায় ভিটি (বাড়ি) শ্রেণির জমির মূল্য প্রতি শতাংশ ১ লাখ ২০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, সেখানে পাশাপাশি আরও চারটি মৌজায় একই শ্রেণির জমির দাম ১৬ হাজার থেকে ৩৫ হাজার টাকা। অর্থাৎ আশপাশের মৌজা থেকে মেঘশিমুল মৌজায় ভিটি (বাড়ি) শ্রেণির জমির দাম ৪ থেকে ৮ গুণ বেশি।
সরকারের আর্থিক ক্ষতি এড়াতে পার্শ্ববর্তী কোনো মৌজায় এই প্রকল্প বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছে জেলা প্রশাসন। মেঘশিমুল মৌজার উত্তরে ঢাকুলিতে অকৃষি (ভিটি/বাড়ি) শ্রেণির জমির মৌজামূল্য ১৮ হাজার টাকা। অর্থাৎ এই মৌজার ভিটি শ্রেণির জমিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করলে জমি অধিগ্রহণে সরকারের খরচ হবে সাড়ে ১৬ কোটি টাকা। এতে সরকারের প্রায় ১০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। একইভাবে মেঘশিমুল মৌজার দক্ষিণে কুকুরিয়া, পশ্চিমে ধারিচোরা ও পূর্বে জাগীর মৌজায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হলে সরকারের ৬১ কোটি থেকে ১০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে।
মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ আবদুল লতিফ প্রথম আলোকে বলেন, বিপুল পরিমাণ টাকা সরকারি কোষাগার থেকে অপচয় হবে। চিঠিতে সেটিই জানানো হয়েছে।
অবশ্য স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, মেঘশিমুল মৌজা এবং আশপাশের এলাকার জমির সরকারি মূল্য কম হলেও বাস্তবে দাম অনেক বেশি। প্রকল্পটি মেঘশিমুল মৌজায় না করে আশপাশের কোনো মৌজায় করলে সরকারকে আরও বেশি অর্থ খরচ করতে হবে।
বিষয়টি নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর ঢাকার বারিধারার বাসায় এই প্রতিবেদকের কথা হয় গত ৫ জুন। এ সময় মন্ত্রী বলেন, মানিকগঞ্জের বর্তমান জেলা প্রশাসকের সঙ্গে তাঁর একটা দূরত্ব আছে। জেলা প্রশাসক ইচ্ছে করে ইডিসিএলের প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সহযোগিতা করছেন না। ইচ্ছাকৃতভাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে বিলম্ব করছেন। জমি অধিগ্রহণের কার্যক্রম শুরু না করে হঠাৎ করে চিঠি দিয়ে প্রকল্পটি বন্ধ করার চেষ্টা করছেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, মূল্যস্ফীতির কারণে এরই মধ্যে ২০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়ে গেছে। অর্থাৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে এখন ২০০ কোটি টাকা বেশি লাগবে।
মন্ত্রী-পরিবারের জমি ক্রয় ও হস্তান্তর
প্রস্তাবিত স্থানের জমি কেনাবেচার সর্বশেষ নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, ২০১৭ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক তাঁর মালিকানাধীন বিডি সান পাওয়ার লিমিটেডের নামে ৬ একর ৩৯ শতক জমি কেনেন। দলিল অনুযায়ী, প্রতি শতক ৫৫ হাজার থেকে ৬৭ হাজার ৬১৯ টাকা দরে কিনেছেন। সেই জমি তিনি প্রতি শতক ১ লাখ ২০ হাজার টাকা দরে ২০২১ সালের মার্চে বিক্রি করেন।
জমি বিক্রির আগে ২০২১ সালের জানুয়ারিতে মেঘশিমুল মৌজার ভিটি শ্রেণির জমির মূল্য পাঁচ গুণ বাড়ানো হয়। এর দুই মাস পর ৪ একর ৭৮ শতক জমি এনডিই স্টিল স্ট্রাকচার্স লিমিটেডের নামে হস্তান্তর করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
মন্ত্রীর কেনা বাকি ১ একর ৬১ শতক জমি আফছার উদ্দিন সরকারের নামে এক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করা হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আফছার উদ্দিনের বাড়ি মন্ত্রীর গ্রামে। এলাকায় মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। তিনি গড়পাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং মানিকগঞ্জ সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক।
মন্ত্রীর ছেলের মালিকানাধীন রাহাত রিয়েল এস্টেটের নামে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কেনা হয় ৩ একর ১২ শতক জমি। শতক ৬৭ থেকে ৬৮ হাজার টাকায় কেনা সেসব জমি ২০২১ সালের মার্চে এনডিই স্টিল স্ট্রাকচার্স লিমিটেডের কাছে বিক্রি করা হয়। বিক্রয় মূল্য দেখানো হয় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা।
২০১৭ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক তাঁর মালিকানাধীন বিডি সান পাওয়ার লিমিটেডের নামে ৬ একর ৩৯ শতক জমি কেনেন। দলিল অনুযায়ী, প্রতি শতক ৫৫ হাজার থেকে ৬৭ হাজার ৬১৯ টাকা দরে কিনেছেন। সেই জমি তিনি প্রতি শতক ১ লাখ ২০ হাজার টাকা দরে ২০২১ সালের মার্চে বিক্রি করেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক প্রথম আলোকে বলেন, তিনি ও তাঁর ছেলের প্রতিষ্ঠান জমি কিনেছে অনেক আগে। তখন সেখানে সরকারি প্রকল্প করার কোনো বিষয় ছিল না। এসব জমি তাঁরা বিক্রি করে দিয়েছেন। এই মৌজায় (মেঘশিমুল) নিচু জমি ও ভরাট জমির মূল্যের মধ্যে অসামঞ্জস্য ছিল। সে জন্য আইন মন্ত্রণালয়কে তিনি সেটি সমন্বয় করতে চিঠি দেন। তারা সেটি সমন্বয় করে দাম বাড়ায়। প্রস্তাবিত স্থানে তাঁর মেয়ের নামে কোনো জমি নেই। তবে মেয়ের স্বামীর নামে জমি আছে।
প্রথম আলোর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ভিটি শ্রেণির মূল্য পাঁচ গুণ বাড়ানোর দুই মাস পর মন্ত্রী ও তাঁর ছেলে যখন সাড়ে ৯ একর জমি উচ্চ মূল্য দেখিয়ে বিক্রি দেখিয়েছেন, ঠিক সেই সময়েই সেখানে নাল শ্রেণির জমি কেনা শুরু করেন মন্ত্রীর মেয়ে সিনথিয়া মালেক। জমি কেনাবেচার নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সিনথিয়া মালেক ১১ একর ১৪ শতক জমি কিনেছিলেন ২০২১ সালের ২৯ মার্চ থেকে ২৫ আগস্টের মধ্যে। এরপর বালু ভরাট করে সেই জমি ভিটি (বাড়ি) শ্রেণিতে রূপান্তর করেন। ইডিসিএলের প্রকল্পটি একনেকে পাস হওয়ার ২০ দিন আগে (১৬ মার্চ ২০২২) ওই জমি স্বামী আজমল আকমলকে হেবা দলিলের মাধ্যমে দান করেন তিনি। দলিলে প্রতি শতাংশ জমির মূল্য দেখানো হয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা।
মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, পরিবারের সদস্যদের জমি ক্রয় এবং সেটি প্রকল্প পাস হওয়ার আগেই অন্যদের কাছে হস্তান্তর কৌশলের অংশ। কারণ, অধিগ্রহণের সময় পুরো জমি স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে থাকলে সেটি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। এ জন্য মৌজা দর বাড়ার পর এসব জমি ঘনিষ্ঠজনদের কাছে হস্তান্তর করে রাখেন।
গ্রহীতা জানেন না, তিনি জমি কিনেছেন
মন্ত্রী ও তাঁর ছেলে থেকে জমি ক্রয়ের দলিলে ক্রেতা বা গ্রহীতার স্থলে এনডিই স্টিল স্ট্রাকচার্স লিমিটেডের ভাইস চেয়ারম্যান রিজওয়ান মুস্তাফিজের সই রয়েছে।
গতকাল ঢাকার গুলশানে রিজওয়ান মুস্তাফিজের কার্যালয়ে গেলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, মানিকগঞ্জে কোনো জমি কেনার বিষয়ে তাঁর কিছু জানা নেই।
তাঁর সইযুক্ত দলিলের অনুলিপি দেখানোর পর রিজওয়ান মুস্তাফিজ বলেন, ‘এটা ইংরেজি ক্যাপিটাল লেটারে (বড় হাতের অক্ষরে) লেখা আমার নাম। আমি কখনো ক্যাপিটাল লেটারে স্বাক্ষর করি না।’ তাহলে দলিলে গ্রহীতা হিসেবে কীভাবে আপনার নাম এল—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এই বিষয়ে আমি কিছুই জানি না, আমার বড় ভাই ইমরান মুস্তাফিজ বলতে পারবেন।’
এরপর বনানীতে এনডিই স্টিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইমরান মুস্তাফিজের কার্যালয়ে গেলে তাঁর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা এসে এই প্রতিবেদকের পরিচয়পত্র দেখেন। তারপর ‘স্যার ব্যস্ত আছেন, একটু বসেন, দেখা করবেন’ বলে এই প্রতিবেদককে অপেক্ষা করতে বলেন। এক ঘণ্টা বসিয়ে রেখে আর দেখা দেননি।
ঘনিষ্ঠজনদের কাছে সাড়ে ৭ একর জমি
প্রকল্পের প্রস্তাবিত স্থানে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ফুফাতো ভাই শামীম মিয়া কিনেছেন ৫ একর ৫৪ শতক জমি। দলিল অনুযায়ী ক্রয়মূল্য ৩ কোটি ৪২ লাখ টাকা। এই জমি অধিগ্রহণ করা হলে তিনি ক্ষতিপূরণ পাবেন ১৯ কোটি ৫৮ লাখ টাকা।
শামীম মিয়া জাগীর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং উপজেলা চেয়ারম্যানের ভাই। শামীম মিয়া প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, জমি অধিগ্রহণ করা হবে, এমনটা ভেবে তিনি জমি কেনেননি। এখানে কোনো কারসাজি হয়নি।
সরকারি প্রকল্পের সম্ভাব্য এলাকায় জমি কিনে, কারসাজি করে দলিলমূল্য বৃদ্ধি করে অধিগ্রহণের সময় বেশি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ এর আগেও উঠেছে। চাঁদপুরে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের জন্য ভূমি অধিগ্রহণের আগেই সেখানকার সাড়ে ৬২ একর জমি মৌজা দরের চেয়ে ২০ গুণ বেশি দাম দেখিয়ে দলিল করে নেয় একটি চক্র।
নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, শামীম মিয়া ছাড়া মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ আরও দুজন আওয়ামী লীগ নেতার দুই একরের বেশি জমি রয়েছে প্রস্তাবিত স্থানে। তাঁদের একজন গড়াপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আফছার উদ্দিন সরকার ১ একর ৬১ শতকের মালিক। আর কৃষ্ণপুর ইউপি চেয়ারম্যান বিপ্লব হোসেন কিনেছেন ৬০ শতক জমি। এ ছাড়া শাহজাদা রহমান নামে মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তি কিনেছেন প্রায় এক একর জমি।
সরকারি প্রকল্পের সম্ভাব্য এলাকায় জমি কিনে, কারসাজি করে দলিলমূল্য বৃদ্ধি করে অধিগ্রহণের সময় বেশি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ এর আগেও উঠেছে। চাঁদপুরে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের জন্য ভূমি অধিগ্রহণের আগেই সেখানকার সাড়ে ৬২ একর জমি মৌজা দরের চেয়ে ২০ গুণ বেশি দাম দেখিয়ে দলিল করে নেয় একটি চক্র। সরকারের ৩৫৯ কোটি টাকা বাড়তি নেওয়ার ওই কারসাজিতে যেসব ব্যক্তির নাম এসেছিল, তাঁরাও একজন মন্ত্রীর নিকটাত্মীয় ও ঘনিষ্ঠজন ছিলেন। এ নিয়ে গত বছরের ২৭ জানুয়ারি প্রথম আলোতে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। প্রায় একই ধরনের কৌশল মানিকগঞ্জে দেখা যাচ্ছে।
মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৫
চ্যানেলগুলোর অনুষ্ঠান মনিটরিং করছে কমিটি
নিজস্ব প্রতিবেদক
নতুন বার্তা ডটকম
ঢাকা: বর্তমানে বেসরকারি স্যাটেলাইট চ্যানেলের প্রচারিত অনুষ্ঠান, টক শো ও সংবাদ নিয়মিত মনিটরিং করার জন্য কমিটি রয়েছে বলে জানিয়েছেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু।
রোববার সংসদে প্রশ্নোত্তর-পর্বে তিনি বলেন, সরকারি ও জাতীয় ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম হিসেবে বাংলাদেশ টেলিভিশন জাতির কাছে পুরোপুরি দায়বদ্ধ। তাই বাংলাদেশ টেলিভিশন হতে বিকৃত ও অসত্য তথ্য প্রদান করে জনগণকে বিভ্রান্ত করার মতো কোনো অনুষ্ঠান বা টক শো প্রচার করার সুযোগ নেই।
তিনি আরও জানান, জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা-২০১৪’-এর তৃতীয় অধ্যায়ে বিভ্রান্তিকর ও অসত্য তথ্য বা উপাত্ত পরিহারের জন্য বলা হয়েছে। উক্ত নীতিমালা কার্যকর করার জন্য ‘সম্প্রচার আইন-২০১৫’ ও ‘সম্প্রচার কমিশন আইন-২০১৫’ প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রস্তাবিত আইন দুইটি প্রণীত হলে ‘সম্প্রচার কমিশন’ প্রতিষ্ঠিত হবে এবং টক শো’র জন্য সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণ করা হবে। ফলে টক শোগুলোতে বিকৃত ও অসত্য তথ্য উপস্থাপনের সুযোগ থাকবে না।
সরকারি দলের সদস্য বেগম পিনু খানের প্রশ্নের উত্তরে তথ্যমন্ত্রী জানান, বেসরকারি মালিকানাধীন টেলিভিশন চ্যানেল বা পত্রিকায় ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধার এবং ব্যক্তিগত শত্রুতার বা বিরোধীকে লক্ষ্য করে বিরোধীপক্ষের বিরুদ্ধে নানা প্রকার কল্পকাহিনী বা মিথ্যা বানোয়াট সংবাদ প্রচার করা হলে সেক্ষেত্রে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি দেশের প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবেন।
সরকারি দলের মাহমুদ-উস সামাদ চৌধুরীর প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলের বিষয়ে ভারতীয় দর্শকদের যথেষ্ট আগ্রহ রয়েছে। বাংলাদেশের চ্যানেল সম্প্রচারের ক্ষেত্রে কোনো আইনগত বাধা নেই। তবে বিদেশী টিভি চ্যানেল প্রদর্শনের ক্ষেত্রে ডাউনলিংক ফি বেশি হওয়ায় ভারতীয় ক্যাবল অপারেটররা এই বিষয়ে আগ্রহী হচ্ছে না। বিষয়টি ভারতীয় সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে উত্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া, সার্কভুক্ত দেশসমূহের টিভি চ্যানেলসমূহ যাতে সহজে ভারতে সম্প্রচার করা যায় সেই লক্ষ্যে বিষয়টি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সার্ক ফোরামে উত্থাপনের উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে।
অপর এক প্রশ্নে মন্ত্রী জানান, দেশের ৫২৮টি দৈনিক পত্রিকার মধ্যে প্রচার সংখ্যায় শীর্ষে আছে বাংলাদেশ প্রতিদিন।
সরকার দলীয় সদস্য আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রীর তালিকা অনুযায়ী, ৫ লাখ ৫৩ হাজার ৩০০ প্রচার সংখ্যা নিয়ে শীর্ষে বাংলাদেশ প্রতিদিন। দ্বিতীয় স্থানে থাকা প্রথম আলোর প্রচার সংখ্যা ৫ লাখ ১ হাজার ৮০০। আর ২ লাখ ৫০ হাজার ৮২০ প্রচার সংখ্যা নিয়ে তৃতীয় স্থানে রয়েছে কালের কণ্ঠ। তিনি আরও জানান, বর্তমানে মিডিয়াভুক্ত পত্রিকার সংখ্যা ৫২৮টি। এরমধ্যে ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয় ২৪৫টি এবং মফস্বল থেকে প্রকাশিত হয় ২৮৩টি। বর্তমানে প্রকাশনা বন্ধ রয়েছে দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার এবং মিডিয়া স্থগিত রয়েছে চারটি পত্রিকার।
নতুন বার্তা/এসএ
মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০১৫
মুক্তমনার ব্লগার খুন, বুধবার সিলেটে আধাবেলা হরতাল
সিলেট অফিস : মুক্তমনার ব্লগার অনন্ত বিজয় দাস হত্যার প্রতিবাদে নগরীতে বুধবার আধাবেলা হরতালের ডাক দিয়েছে সিলেটের গণজাগরণ মঞ্চ।
গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র দেবাশীষ দেবু মঙ্গলবার বেলা আড়াইটায় দ্য রিপোর্টকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার মো. রহমতউল্লাহ দ্য রিপোর্টকে জানান, অফিসে যাবার জন্য মঙ্গলবার সকাল সাড়ে আটটার দিকে সিলেট নগরীর সুবিদবাজার এলাকার ১৩/১২, নুরানী বনকলা পাড়া এলাকার বাসা থেকে বের হলে অনন্ত বিজয়কে চারজন মুখোশধারী ব্যক্তি কোপায়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
মুক্তমনা ব্লগে নিজ নামে লেখালেখি করতেন অনন্ত বিজয়। ব্লগে তার সম্পর্কে দেওয়া তথ্য থেকে জানা যায়, অনন্ত বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানমনস্কতার ছোটকাগজ 'যুক্তি'র সম্পাদক ছিলেন।
মানবতা ও যুক্তিবাদ প্রতিষ্ঠায় অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৬ সালে মুক্তমনা র্যাশনালিস্ট এ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন তিনি। তার প্রকাশিত প্রবন্ধ গ্রন্থ (১) পার্থিব, (সহলেখক সৈকত চৌধুরী), শুদ্ধস্বর, ঢাকা, ২০১১। (২) ডারউইন : একুশ শতকে প্রাসঙ্গিকতা এবং ভাবনা, (সম্পাদিত), অবসর, ঢাকা, ২০১১। (৩) সোভিয়েত ইউনিয়নে বিজ্ঞান ও বিপ্লব : লিসেঙ্কো অধ্যায়, শুদ্ধস্বর, ঢাকা, ২০১২। (৪) জীববিবর্তন সাধারণ পাঠ (মূল : ফ্রান্সিসকো জে. আয়াল, অনুবাদ : অনন্ত বিজয় দাশ ও সিদ্ধার্থ ধর), চৈতন্য প্রকাশন, সিলেট, ২০১৪।
চলতি বছর এ নিয়ে দু’জন ব্লগার ও একজন অনলাইন এক্টিভিস্ট খুন হলেন।
একুশে গ্রন্থমেলা থেকে ফেরার পথে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি খুন হন মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ রায়। এ সময় তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদকেও (৩০) কুপিয়ে জখম করা হয়। এর কয়েক দিন পরই হাতিরঝিলে কুপিয়ে হত্যা করা হয় অনলাইন এক্টিভিস্ট ওয়াশিকুর রহমান বাবুকে।
রাজধানীর শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ থেকে ফেরার পথে ২০১৩ সালে মিরপুরে নিজ বাড়ির সামনে খুন হন ব্লগার রাজিব, যিনি থাবা বাবা নামে লেখালেখি করতেন।
মেঘালয়ের পুলিশ আটক করেছে সালাহ উদ্দিনকে
বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব সালাহ উদ্দিন আহমেদকে সোমবার ভারতের মেঘালয়ের শিলং থেকে সে দেশের পুলিশ আটক করেছে। মঙ্গলবার স্থানীয় দ্য শিলং টাইমস পত্রিকার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে।
‘বাংলাদেশী ম্যান হেল্ড’ শিরোনামে প্রকাশিত খবরে পত্রিকাটি বলছে, সোমবার সকালে একজন বাংলাদেশীকে আটক করেছে পুলিশ। সালাহ উদ্দিন আহমেদ (৫৪) নামে ওই বাংলাদেশীকে শিলংয়ের গল্ফ লিংক নামক এলাকা থেকে আটক করা হয়েছে। পুলিশ তার ব্যাপারে তদন্ত করছে।
এদিকে বাংলদেশে নিযুক্ত ভারতের রাষ্ট্রদূত পঙ্কজ শরণ জানান, সালাহ উদ্দিন আহমেদের সন্ধান পাওয়ার বিষয়টি যাচাই করে দেখা হচ্ছে।
মঙ্গলবার দুপুরে সালাহ উদ্দিনের স্ত্রী হাসিনা আহমেদ জানান, মেঘালয়ের শিলংয়ে একটি হাসপাতালে চিকিৎসারত স্বামীর সঙ্গে তার কথা হয়েছে।
শনিবার, ২১ মার্চ, ২০১৫
‘বিএনপি এলে আ’লীগ নির্বাচন পিছিয়ে দেবে’
দ্য রিপোর্ট প্রতিবেদক : আসন্ন তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিলে আওয়ামী লীগ নির্বাচন করবে না বলে মন্তব্য করেছেন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর আব্দুল কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম।
তিনি বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগতো নির্বাচন করবেই না। নির্বাচন আরও পিছিয়ে দেওয়া হবে।’
মতিঝিলে শনিবার কাদের সিদ্দিকী তার চলমান ৫৩ দিনের নিরবচ্ছিন্ন অবস্থান কর্মসূচিস্থলে এক সংবাদ সম্মেলনে এ মন্তব্য করেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি নেত্রীর সঙ্গে সংলাপের দাবিতে ২৮ জানুয়ারি থেকে মতিঝিলের ফুটপাতে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন কাদের সিদ্দিকী।
সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ঘোষণাকে বাচ্চাদের ললিপপ খাওয়ানোর মতো উল্লেখ করে কাদের সিদ্দিকী বলেন, ‘একদিকে অবরোধ, অন্যদিকে পুলিশের গুলি। দেশের মানুষ যখন মরছে, তখন বাচ্চাদের কান্না থামানোর জন্য ললিপপ দেওয়ার মতো ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচন দেওয়া হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘এই নির্বাচন দেশের জনগণের সঙ্গে তামাশা। এই নতজানু নির্বাচন কমিশনের অধীনে এ দেশে কোনো নির্বাচন হতে পারে না। বিরোধী দল চ্যালেঞ্জ হিসেবে এই নির্বাচন করলে সরকারি দলের পরাজয় অবশ্যম্ভাবী।’
কাদের সিদ্দিকী বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু সারাজীবন চেষ্টা করেছেন সরকারি প্রভাবমুক্ত নির্বাচনের আর প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর কন্যা হয়ে গণভবনে ডেকে নিয়ে সিটি নির্বাচনের প্রার্থী ঘোষণা করেন। গণভবনতো সরকারি ভবন। সেখানে কীভাবে প্রধানমন্ত্রী দলীয় প্রার্থীদের ডেকে নিয়ে সমর্থন দেন। এটা সংবিধানবিরোধী।’
কাদের সিদ্দিকী সরকারের উদ্দেশে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেন, ‘সত্যিকারের নির্বাচন হলে সরকারি দলের প্রার্থী জামানত না হারালে আমি সারাজীবন শেখ হাসিনার সেবক হয়ে থাকব। সরকারি দলের প্রার্থীর জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।’
মুক্তিযুদ্ধের এই কিংবদন্তি বলেন, ‘দেশের মূল সমস্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধী দলের নেতা খালেদা জিয়া। বাংলাদেশ কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার পর দেশের মানুষ যেমন খুশি হয়েছিল, এই দুইনেত্রী আলোচনায় বসলে দেশের মানুষ আরও বেশী খুশি হবে।’
কাদের সিদ্দিকী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্দেশে বলেন, ‘শ্বাস নেওয়ার জন্য সিটি করপোরেশন নির্বাচন দিয়েছেন। এবার আরও শ্বাস নেওয়ার জন্য আলোচনায় বসেন।’
বিএনপি নেত্রীকে উদ্দেশে করে কাদের সিদ্দিকী বলেন, ‘আপনি গো ধরে বসে থাকবেন না। এই ব্যর্থ আন্দোলন প্রত্যাহার করুন। আপনার আন্দোলন আর এখন আপনার হাতে নেই। এই আন্দোলন এখন গোয়েন্দাদের হাতে। আন্দোলনে বিরতি দেন। আন্দোলন শেখেন। তার পর আবার আন্দোলন শুরু করেন।’
ভারত-বাংলাদেশের ম্যাচে বাংলাদেশকে জোর করে হারানো হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন কাদের সিদ্দিকী।
কাদের সিদ্দিকী আগামী ২৮ মার্চ তার অবস্থান কর্মসূচির ৬০তম দিনে যে সব বিশিষ্ট ব্যক্তি তার অবস্থানস্থলে সংহতি জানিয়েছেন কিংবা দূরবর্তী স্থানে থেকে সমর্থন দিয়েছেন সবাইকে নিয়ে সংহতি সমাবেশ করার ঘোষণা দেন।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন- কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ইকবাল সিদ্দিকী, সাংগঠনিক সম্পাদক শফিকুল ইসলাম দেলোয়ার, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ফরিদ আহমেদ, যুব আন্দোলনের আহ্বায়ক হাবিবুন্নবী সোহেল, ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক রিফাতুল ইসলাম দ্বীপ প্রমুখ।
২১/৩/১৫
বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ, ২০১৫
মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ র্যাবের গোয়েন্দা সরঞ্জাম আটকে দিয়েছে সুইজারল্যান্ড
সালাহ উদ্দিনকে আদালতে হাজির করতে হাইকোর্টের রুল
ঢাকা: বিএনপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব সালাহ উদ্দিন আহমদকে খুঁজে বের করতে এবং আদালতে হাজির করতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল দিয়েছেন হাইকোর্ট। বিচারপতি কামরুল ইসলাম সিদ্দিকী ও বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এক আবেদনের শুনানি শেষে বৃহস্পতিবার বিকেলে এ রুল দেন।
আগামী রোববারের মধ্যে স্বরাষ্ট্রসচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক, র্যাবের মহাপরিচালক, এসবির (স্পেশাল ব্রাঞ্চ) প্রধান, সিআইডির প্রধান, ডিএমপির কমিশনার, উত্তরা থানার ওসিকে রুলে জবাব দিতে বলা হয়েছে।
সাবেক প্রতিমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদের স্ত্রী হাসিনা আহমদ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাকে আদালতে হাজির করার নির্দেশনা চেয়ে আজ আবেদন করেন।
ফৌজদারি কার্যবিধিতে করা এ আবেদনের ওপর শুনানি করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সমিতির সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ এবং রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে অংশ নেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। শুনানি শেষে হাইকোর্ট বেঞ্চ ওই রুল দেন।
মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর উত্তরার একটি বাসা থেকে সালাহ উদ্দিন আহমদকে তুলে নেওয়া হয় বলে হাসিনা আহমদ গতকাল বুধবার রাত পৌনে নয়টার দিকে মিডিয়াকে জানান। ওই দিন রাত ১০ টার পর সালাহ উদ্দিন আহমদ মুঠোফোনে স্ত্রী হাসিনা আহমদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন বলে জানা গেছে। কিন্তু কোনো কথা হয়নি।
এদিকে বিএনপিও অভিযোগ করেছে, পুলিশ, ডিবি, র্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সালাহ উদ্দিন আহমদকে উঠিয়ে নিয়ে গেছেন।
তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কেউ সালাহ উদ্দিন আহমদকে গ্রেফতার বা আটকের কথা স্বীকার করেননি। বুধবার রাতে হাসিনা আহমদ স্বামীকে তুলে নিয়ে যাওয়ায় গুলশান থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে গেলে পুলিশ তা নেয়নি বলে অভিযোগ করে বিএনপি। দলীয় সূত্র জানায়, ঘটনা যেহেতু উত্তরায়, তাই উত্তরা থানায় জিডি করার পরামর্শ দেয় গুলশান থানার পুলিশ। পরে উত্তরা থানায় গেলে বলা হয় প্রত্যক্ষদর্শী কাউকে নিয়ে আসার। এই অজুহাতে তারাও জিডি নেয়নি।
বিএনপির দলীয় সূত্র জানায়, সালাহ উদ্দিন আহমদ উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টরের একটি বাড়িতে থাকতেন। বাড়ির মালিক তার দূর সম্পর্কের আত্মীয় বলে জানান হাসিনা আহমদ। মঙ্গলবার রাত ১০টার দিকে বাড়ির সামনে ২০-২৫ জন ব্যক্তি সশস্ত্র অবস্থান নেন। এ খবর তৎক্ষণাৎ বাড়ির কর্মচারীরা মালিককে জানান। কিছু সময় পর অস্ত্রধারীরা বাড়ির ফটক ভাঙার চেষ্টা করলে কর্মচারীরা ফটক খুলে দেন। এরপর তাকে নিয়ে যাওয়া হয়। ভয়ে বাড়ির মালিক রাতে আর বাসায় ফেরেননি। সকালে তিনি বাসায় ফিরে জরুরি কিছু কাগজপত্র নিয়ে বেরিয়ে যান।
খালেদা জিয়াকে ‘ভদ্রভাবে’ আদালতে আত্মসমর্পণ করার পরামর্শ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার।
অবরোধ-হরতালে পেট্রোল বোমায় ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পর বৃহস্পতিবার দুপুরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে বিএনপি নেত্রীকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, “আইন-আদালত মানবেন। আপনার বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট ইস্যু হয়েছে। আশা করি, ভদ্রভাবে কোর্টে গিয়ে স্যারেন্ডার করবেন।”
জিয়া ট্রাস্ট দুর্নীতির দুই মামলায় গত ২৫ ফেব্রুয়ারি বিএনপি চেয়ারপারসনকে গ্রেপ্তারে পরোয়ানা জারি হয়।
ওই দুই মামলার পরের শুনানির দিন ৪ মার্চও খালেদা আদালতে না যাওয়ায় পরোয়ানা বহাল রাখা হয়।
ওই পরোয়ানা গুলশান থানায় পৌঁছালেই খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তারে পুলিশ ব্যবস্থা নেবে বলে আগের দিন সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এদিন অবরোধে পেট্রোল বোমা হামলায় নিহতদের স্বজন এবং আহতদের প্রত্যেককে ১০ লাখ টাকার পরিবার সঞ্চয়পত্র দেন শেখ হাসিনা। ক্ষতিগ্রস্ত ২৭০টি যানবাহনের ১৯৯ জন মালিকের হাতে তুলে দেন অনুদানের চেক।
এদিন মোট পাঁচ কোটি ৪২ লাখ আট হাজার টাকার সহায়তা দেওয়া হয়। ক্ষতিগ্রস্ত যানবাহনের ১৯৯ জন মালিককে দেওয়া হয় এক কোটি ৫৭ লাখ আট হাজার টাকার চেক।
বিএনপি-জামায়াত জোটের দুই মাসের বেশি সময়ের অবরোধে নাশকতায় ১১৯ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, যাদের অধিকাংশই আগুন-পেট্রোল বোমায় দগ্ধ হয়ে মারা গেছেন। পেট্রোল বোমাসহ নানা ধরনের নাশকতায় কয়েকশ মানুষ আহত হয়েছেন।
এই সময়ে ছয়টি লঞ্চে অগ্নিসংযোগ এবং ৩৪ দফা ট্রেনে নাশকতা চালানো হয়েছে।
আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী পেট্রোল বোমায় নিহতদের স্বজন ও আহতদের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে বলেন, “বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের ফলে বহু পরিবার নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে।
“কীভাবে একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে পুড়িয়ে মারে? কোন ধরনের আন্দোলন এটা? মানুষের জীবন অতিষ্ঠ করে দিচ্ছে। সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের ওপর এই জুলুম কেন?”
‘মানুষের অভিশাপেই’ খালেদা জিয়া শেষ হয়ে যাবেন বলে মন্তব্য করে শেখ হাসিনা বলেন, আইনগতভাবে রাষ্ট্র যা করার করবে।
“খালেদা জিয়াকে বলব- ‘এই সব বন্ধ করেন’।এভাবে চললে তো উনি (খালেদা জিয়া) আর মানুষের সামনে যেতে পারবেন না।”
উপস্থিত ক্ষতিগ্রস্তদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আপনাদের ক্ষতিপূরণের সামর্থ্য আমার নেই। তাও যেটুকু করার করছি।”
রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে জ্বালাও-পোড়াওয়ের সমালোচনা করে শেখ হাসিনা বলেন, “বিশ্ব যখন বাংলাদেশের উন্নতিতে স্বীকৃতি দিচ্ছে- ঠিক তখনই জ্বালাও-পোড়াও শুরু করেছে।”
বাসা রেখে গুলশানে নিজের কার্যালয়ে খালেদা জিয়ার দুই মাসের বেশি সময় অবস্থান নিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, “অফিসে কী মধু আছে জানি না। ওখান থেকে উনি আর লন্ডন থেকে তার ছেলে (তারেক রহমান) নির্দেশ পাঠাচ্ছে। আর তাদের ক্যাডার বাহিনী নেমে পড়ছে।”
এসএসসি পরীক্ষার মধ্যে অবরোধের পাশাপাশি বিএনপির হরতাল ডাকার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “যেদিন থেকে পরীক্ষা শুরু সেদিন থেকেই অবরোধের সাথে হরতালেরও ডাক দিল।
“বাচ্চাদের তো ধ্বংসাত্মক অবস্থার মধ্যে ফেলতে পারি না। তাই শুক্রবার আর শনিবার করে পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে। না হলে পরীক্ষা অনেক আগেই শেষ হয়ে যেত।”
জনগণ ধ্বংত্মাক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার হচ্ছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “সুখের বিষয়; জনগণ সচেতন হচ্ছে। এদের ধরিয়ে দিচ্ছে। মানুষকে জেগে উঠতে হবে। প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
“জনগণের শক্তি বড় শক্তি।”
বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫
দুই দলীয় অকার্যকর পদ্ধতির শিকার বাংলাদেশ: দি ইকোনমিস্ট
নতুন বার্তা :
কয়েক মাসে প্রায় ১৬ কোটি মানুষের দেশ, বাংলাদেশ আবারও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া রাজধানী ঢাকায় তার পার্টি অফিসে অবরুদ্ধ। তার দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) দেশব্যাপী সড়ক, রেল আর নৌপথ অবরোধ কর্মসূচি পালন করছে। গত বছরের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের প্রথম বর্ষপূর্তিতে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালনে নিষেধাজ্ঞাই ছিল এ অস্থিরতার সূত্রপাত। সর্বশেষ ওই নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বিরোধী দলের নির্বাচন বর্জনের বদৌলতে সহজেই পুনঃনির্বাচিত হয়। চলমান আন্দোলনে নিহত হয়েছেন প্রায় ৫০ জন। গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১০ হাজারেরও বেশি বিরোধীদলীয় নেতা-কর্মীকে। বেশির ভাগ বিএনপি নেতা জেলে, নির্বাসনে বা আত্মগোপন করে আছেন। তারা বিভিন্ন অপরাধ মামলার মুখোমুখি যা পরবর্তী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা থেকে তাদেরকে নিষিদ্ধ করতে পারে।
লন্ডনের বিখ্যাত দি ইকোনোমিস্ট পত্রিকাটির ২ ফেব্রয়ারি অনলাইন ভার্সনে ‘ডযু ইধহমষধফবংয’ং ঢ়ড়ষরঃরপং ধৎব নৎড়শবহ’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এ সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহ সঙ্কটপূর্ণ এক স্থানে পৌঁছেছে বলে মনে হচ্ছে। সরকার খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগ সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। অবরোধের পাশাপাশি তিনি ১লা ফেব্রুয়ারি থেকে তিন দিনের হরতালের ডাক দেন। কেন বাংলাদেশের রাজনীতি এ বিশৃঙ্খলায় অধঃপতিত হয়েছে?
দুই দলীয় অকার্যকর পদ্ধতির শিকার বাংলাদেশ। যেখানে দুই দলনেতা, ‘দ্য ব্যাটলিং বেগমস’ দেশকে রসাতলে যেতে দিয়ে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা চরিতার্থ করছেন। ১৯৯১ সাল থেকে তারা দু’জন পালাবদল করে ক্ষমতায় এসেছেন। উভয় দলই যেহেতু জানে অপর দল নির্বাচনে জালিয়াতি করবে, তাই নির্বাচন হতো অন্তর্র্বতীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে।
২০০৬ সালে দুর্নীতিগ্রস্ত ও অযোগ্য একটি সময়কাল সমাপ্তি হবার পর খালেদা জিয়ার দলও তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি জালিয়াতি করার চেষ্টা করেছিল। নির্দলীয় একটি ‘টেকনোক্র্যাট’ সরকারকে সমর্থন দিয়ে হস্তক্ষেপ করে সেনাবাহিনী। ওই সরকার দুই বছর পর নির্বাচন আয়োজন করে, যেখানে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ ভূমিধস বিজয় অর্জন করে। দলটি তার সংখ্যাগরিষ্ঠতা ব্যবহার করে ক্ষমতা সুসংহত করার চেষ্টা করেছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করে, বিএনপি নেতাদের ধরপাকড় আর তাদের বড় জোট অংশীদার জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করে ভবিষ্যতে বিএনপির নির্বাচনে জেতা অসম্ভব করে তোলার চেষ্টা করেছে। সরকার এখন দাবি করছে তারা বিএনপির ধ্বংসাত্মক কর্মকা- এবং সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা করছে। এদিকে, সরকার একদলীয় রাষ্ট্র গড়ে তোলার চেষ্টা করছে বলে বিরোধী দল দাবি করছে। উভয়ের কথাতেই যুক্তি আছে।
দুই নেত্রীর ব্যক্তিগত বৈরিতা- বিজয়ীই সব কিছু পাবে রাজনীতিতে এমন নীতি লালনে সহায়তা করেছে। এখানে জালিয়াতির নিষ্ফল নির্বাচন বিরোধী দলকে রাজপথে নামতে বাধ্য করেছে। দেশজুড়েই দু’দলের অবস্থান দৃঢ়। টেকনোক্র্যাট সরকারের সময়ে এই দু’দলকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য তৃতীয় শক্তির উত্থানে উৎসাহিত করার প্রচেষ্টা কোন ফল বয়ে আনেনি। রাজনৈতিক যে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে তাতে হস্তক্ষেপে বাংলাদেশের প্রতিবেশীর সম্ভবত আগ্রহ নেই। এসব কিছুর পরেও বাংলাদেশে উন্নয়ন সফলতার ভালো রেকর্ড রয়েছে।
খালেদা জিয়ার প্রতি আস্থা নেই ভারত ও পশ্চিমাদের। তারা মনে করেন- চীনকে তিনি অধিকতর ভূমিকা পালনে অনুমতি দেবেন এবং কট্টর ইসলামপন্থিদের প্রতি তার রয়েছে নমনীয়তা। শেখ হাসিনা বলতে পছন্দ করেন যে, বাংলাদেশে বড় কোনো সন্ত্রাসী হামলা তার সময়ে হয়নি। অথবা অন্য কোথাও সন্ত্রাসী হামলার যোগসূত্র বাংলাদেশ পর্যন্ত আসেনি।
যাহোক, বিএনপির অবরোধে অস্থিরতা বাড়ছে। অগ্নিদগ্ধ মানুষে ভরে যাচ্ছে হাসপাতাল। দমন-পীড়নে পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতি হচ্ছে। পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়ে হয়তো হস্তক্ষেপ করার কথা ভাবতে পারে সেনাবাহিনী। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনে তারা লোভনীয় দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের রয়েছে সুনাম। তাই সরাসরি অভ্যুত্থানের বিষয়ে তারা সতর্ক হতে পারেন। চলমান অস্থিরতাকে সরকার রাজনৈতিক সঙ্কট হিসেবে স্বীকার করবে না। নতুন নির্বাচনের সম্ভাবনাও ক্ষীণ। এ অবস্থায় জেনারেলরা এটা অনুধাবন করতে পারেন যে, সময় শেষ- একথা বলা ছাড়া তাদের সামনে আর কোন পথ খোলা নেই। যেমনটা তারা আট বছর আগে করেছিলেন। বিদ্বেষপূর্ণ রাজনীতিতে কোনো পক্ষই জয়ী হয় না।
দি ইকোনোমিস্ট’র প্রতিবেদনটি এখানে তুলে ধরা হলো:
Why Bangladesh’s politics are broken
Feb 2nd 2015, 23:50 by T.J. / BANYAN
FOR the past month Bangladesh, a country of nearly 160m people, has (yet again) been paralysed. The opposition leader, Khaleda Zia, has been confined to a party office in the capital, Dhaka. Her Bangladesh Nationalist Party (BNP) has been staging a nationwide blockade of roads, railways and waterways. The trigger for the unrest was a banned protest to mark the anniversary on January 5th of last year’s election, in which the incumbent Awami League, led by the prime minister, Sheikh Hasina, was re-elected easily thanks to an opposition boycott. Nearly 50 people have been killed and more than 10,000 opposition activists arrested. BNP leaders are mostly in jail, in exile or in hiding, and face criminal charges that will probably bar them from running in the next election. This week events appeared to be reaching a head. The government temporarily cut the electricity supply and internet cables to Mrs Zia’s redoubt. In addition to the crippling blockade, she called a three-day national strike from February 1st. Why has politics degenerated into this mess?
Bangladesh suffers a dysfunctional two-party system, in which the two party leaders, the “battling begums”, wage a personal vendetta at the country’s expense. From 1991 they have rotated in office. Because both parties know that the other will rig elections, polls used to be conducted under an interim caretaker administration. In 2006 Mrs Zia’s party, at the end of a particularly corrupt and incompetent stint in office, tried to rig that system too. The army stepped in to back a non-party “technocratic” government, which after two years held an election won in a landslide by Sheikh Hasina’s Awami League. The party has used its majority to entrench its power, and make it impossible for the BNP ever to win an election: by abolishing the caretaker system, hounding its leaders and banning its largest coalition partner, Jamaat-e-Islami, for its avowedly Islamic platform. Now the government claims it is combating acts of vandalism and terrorism by the BNP. The opposition accuses the government of trying to create a one-party state. Both sides have a point.
The personal animus between the begums has helped foster a winner-takes-all approach to politics in which the futility of rigged elections forces the opposition on to the streets. Both parties are entrenched across the country; attempts, during the technocratic interregnum, to encourage “third forces” to emerge to challenge them proved fruitless. Bangladesh’s neighbours are unable and perhaps unwilling to meddle in the political deadlock. Despite everything, the country has a fair record of developmental success. And India and the West distrust Mrs Zia, seeing her as both willing to allow China a greater role in the country, and as being soft on Islamist extremism. Sheikh Hasina likes to point out that on her watch no big terrorist attack has taken place in Bangladesh. Nor has one elsewhere been traced back to the country.
However, with the BNP’s transport blockade prompting growing unrest, and victims of arson attacks filling the burns units of hospitals, the climate of repression worsening, the army may feel compelled to intervene. Mindful of its reputation (and lucrative UN peacekeeping duties), it will be wary of an outright coup. But it seems highly unlikely the government can be persuaded to treat the unrest as a political crisis and call fresh elections. So the generals may feel, as they did eight years ago, that they have no option other than to call “time out” on a political brawl that neither side can win.
গলাকাটা মুরগির অর্থহীন নাচানাচি
সিরাজুর রহমান
আমার আব্বা-আম্মার পাঁচ ছেলে ও এক মেয়ের সবাই তখন জীবিত। একাত্তরের নভেম্বরের শেষে আম্মা মারা যান। সবচেয়ে বড় ভাই পাকিস্তাান বিমানবাহিনীর অন্যতম শীর্ষ কর্মকর্তা হলেও করাচিতে কোর্ট মার্শালের প্রতীায় সামরিক কারাগারে বন্দী ছিলেন। শেখ মুজিবুর রহমানকে হুঁশিয়ার করে দেয়ায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী তাকে গ্রেফতার করে। আমরা পরবর্তী দুই ভাই যুক্তরাজ্যে ছিলাম। সব ছোট দুই ভাই পূর্ব পাকিহস্তানে থাকলেও আম্মা শেষ বিদায়ে তাদেরও হাতের মাটি পাননি। এরা কাছের এক গ্রামে লুকিয়ে ছিল। আব্বা যখন তাদের আম্মার জানাজায় আসতে নিষেধ করে খবর পাঠান মাত্র তখনই তারা মায়ের মৃত্যুর খবর পেয়েছিল। এরা তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তাদের ধরার জন্য পাকিস্তাানি সেনাদের একটা দল আমাদের বাড়িতেই শিবির গেড়ে ছিল।
একাত্তরের এই ছিল দেশের চেহারা। খুব কম পুরুষই নিজের বাড়িতে রাত কাটাতেন। গভীর রাতে পাকিস্তাানি সেনারা বিশ্বাসঘাতক চরদের দেয়া খবর অনুসরণ করে সব সম লোকেদের ধরে ধরে নিয়ে যেত। তারপর তাদের কী হতো প্রায়ই জানা যেত না। পাকিস্তাানি গুপ্তচরদের দেয়া তালিকা অনুযায়ী আমাদের বুদ্ধিজীবী নেতৃত্বকে এরা ধরে ধরে নিয়ে গেছে। পরে দেশের মানুষ দেখেছে এখানে-সেখানে রোদ-বৃষ্টি-ধৌত কঙ্কালের স্তাূপ। দেশে তখন কী ধরনের ত্রাসের রাজত্ব চলেছে পরবর্তী প্রজন্মগুলোকে বোঝানো খুবই কঠিন- প্রায় অসম্ভব।
প্রায় সে ধরনেরই একটা অব¯’া আবার সৃষ্টি হয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশে। বিগত কয়েক বছরে যারা মুখ খুলে গণতন্ত্রের, স্বাধীনতার, মানবাধিকারের কিংবা নির্বাচনের কথা বলেছেন তাদের অনেকে শহীদ রুমি, আমার বন্ধু সিরাজুদ্দিন হোসেন, জহির রায়হান কিংবা বিবিসির সংবাদদাতা নিজামউদ্দিন আহমেদের মতো গুম ও খুন হয়ে গেছেন। একাত্তরের রাজাকার, আর আল বদরেরা আসত মুখোশ পরে। বিগত ছয় বছরের ছিনতাইকারীরা এসেছে পুলিশের কিংবা র্যাবের ইউনিফর্ম পরে। আপাত দৃষ্টিতে পুরুষহীন বাংলাদেশে এখন গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার ধ্বজাধারীদের ধরিয়ে দি”েছ একাত্তরের মতোই ছিঁচকে বিশ্বাসঘাতকেরা সামান্য কিছু টাকার লোভে।
অপর দিকে, এদের মন্ত্রী বলতে ই”ছা করে না, কারণ এরা এমন নোংরা কথা বলেন ও কাজ করেন যে, শুনে গা ঘিন ঘিন করে। তাদের একজন ঘোষণা দিয়েছেন যারা নির্বাচন কিংবা গণতন্ত্রের কথা বলেন কিংবা বলেছেন তাদের খবর দিলে ৫০ হাজার টাকা, আর ধরিয়ে দিলে লাখ টাকা পুরস্কার। ওদিকে রাজধানীতে সরকারের পে সমর্থন দেখানোর জন্য রোজ কয়েক শ’ টাকা করে ভাড়া পা”েছন কর্মহীন আর দিনমজুরেরা। কর্মসং¯’ান আর সম্পদের বণ্টনের অপূর্ব ব্যব¯’া করে ফেলেছে অবৈধ সরকার!
আরো অনেক মিল দেখবেন একাত্তরের সাথে। গোড়ার দিকে হলেও মাঝে মাঝে এখানে- সেখানে অভিযান চালাত পাকিস্তাানি সেনারা। সাধারণত দেশের ভেতরে ঢোকার সাহস তাদের ছিল না। মাঝে মাঝে কয়েক ডজন সামরিক যান ভর্তি সৈন্য আর দুই-চারজন বিশ্বাসঘাতক চরকে নিয়ে এরা গেরিলা আক্রমণের মতো করে হামিলা চালিয়ে অতি দ্র“ত ঘাঁটিতে ফিরে যেত। হুবহু একই দৃশ্য দেখা যা”েছ এখন। রাজধানীর বাইরের বাংলাদেশ সরকারের নিয়ন্ত্রণহীন। প্রশাসন নিজেই এখন বিপন্ন বোধ করছে। জেলা প্রশাসকেরা বিজিবি প্রার্থনা করে চিঠি লিখে মন্ত্রীদের অ¯ি’র করে তুলেছেন। অত বিজিবি সরকার পাবে কোথায়? সুতরাং আরো ৫০ হাজার গোপালী পুলিশ নিয়োগ করো। পুলিশ বাহিনীর গ্রামাঞ্চলে যাওয়ার সাহস অনেক দিন আগেই চলে গেছে। এখন রাজধানীর বাইরে যেতে হলে অত্যাধুনিক অস্ত্র সজ্জিত পুলিশ র্যাব ও বিজিবি ডজন ডজন গাড়ি ও ভ্যানের কনভয়ে চলাচল করে। বিভিন্ন সময়ে হলিউডের দৌলতে ভিয়েতনাম যুদ্ধের অনেক ফিল্ম দেখেছিলাম। বাংলাদেশের তথাকথিত শান্তিরী বাহিনীর রাজধানীর বাইরে যাওয়ার দৃশ্য প্রায়ই আমাকে ভিয়েতনামে মার্কিন বাহিনীর কনভয় অভিযানের কথা মনে পড়িয়ে দেয়।
খাসি করে দেয়া পাঁঠা?
এসব ছবিও হয়তো শিগগির আর দেখতে পাবো না। বর্তমানে তারা যা করছে তার প¯‘ুতিস্বরূপ মিডিয়া নামে পাঁঠাটাকে তারা ২০০৯ সালেই খাসি করে দিয়েছিল। হারানো পৌরুষের স্মৃতি মনে করে খাসির দুঃখ হয়, ম্যা-ম্যা করে সে মনের আকুতি প্রকাশ করতে চায়। সেটাও সরকারের উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। মাঝে মাঝেই তারা দুটো-চারটে মিডিয়া-খাসি হত্যা করেছে এবং করছে। যারা খাসি হতে আপত্তি করেছে তাদের পরিণতি হয়েছে ভয়াবহ। সাহসী মাহমুদুর রহমানকে এত দিন বিনা বিচারে আটক রাখা এবং মাঝে মাঝে লোকচুর অগোচরে রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করার অভিযোগও প্রবল। এখন হুকুমের গোলাম দুদককে দিয়ে মামলা সাজানো হয়েছে তার বিরুদ্ধে। তার পত্রিকা আমার দেশের মুদ্রণ বন্ধ করে দিয়েছে সরকার। দিগন্ত টেলিভিশন ও ইসলামী টেলিভিশনও বন্ধ আছে। এখন কোপ পড়েছে একুশে টেলিভিশনের ওপর। আমার কেন জানি মনে পড়ছে এককালে এ স্টেশনটি শেখ হাসিনার প্রিয়পাত্র ছিল। ও দিকে টেলিভিশনের টকশোতে কাকে আমন্ত্রণ করা যাবে আর কাকে যাবে না তার একটা অলিখিত তালিকা স্টেশনগুলোকে আগেই দেয়া হয়েছিল। তাতেও সরকারের মনঃস্তাুষ্টি হয়নি। টকশোর অতিথিদের বিরুদ্ধে মন্ত্রীদের কুৎসা-নিন্দা বৃষ্টি শুরু হতে দেরি হয়নি।
সরকারের জানাই ছিল তাদের নির্বাচন চুরি, গণতন্ত্র চুরি ও স্বাধীনতা চুরির বিরুদ্ধে গণ-অভ্যুত্থান ঘটবেই। তার আগেই সম্প্রচার বিধির নামে মিডিয়া নামক খাসিটার চার পায়ে দড়ি বেঁধে দেয়া হয়েছে। গত সপ্তাহে আবার টেলিভিশন স্টেশন মালিক ও সাংবাদিকদের সচিবালয়ে ডেকে পাঁচ মন্ত্রী একযোগে দলাইমলাই করেছেন। মনে রাখতে হবে যে মালিকপগুলোর মাথা নানা কারণেই সরকারের কাছে বাঁধা। এরা সাধারণত বিভিন্ন শিল্প-গ্রুপের মালিক। সরকারের অনেক নুন খেয়েছেন এরা, ভবিষ্যতেও খেতে হবে। হয়তো সরকারের চোখের সামনে গুরুতর অন্যায় কেউ কেউ করেছেন অতীতে, সরকার অপত্য স্নেহে মা করে দিয়েছে। এখন মাটিতে টেনে দেয়া লাইনের একচুল এ দিক-ও দিক পা দিলে অনেক দড়িতে এক সাথে টান পড়বে। আবার টেবিলের তলা দিয়ে ডান হাত-বাঁ হাতের কারবার তো হরহামেশাই হ”েছ। দুই-তিন মাস আগে এ রকম একটা গুজব শুনেছিলাম। সত্য-মিথ্যা বলতে পারব না। তবে একজন তথাকথিত বামপš’ী মিডিয়া ব্যক্তিত্বের রাতারাতি ১৮০ ডিগ্রি মোড় ফেরা ল করেছি।
ফলটা যা হওয়ার তাই হয়েছে। স্টেশন মালিক ও তাদের মিডিয়া কর্মীরা পাঁচ মন্ত্রীকে নাকে খৎ দিয়ে এসেছেন। অনির্বাচিত, অবৈধ সরকার যা বলবে সেটাকেই তারা ধ্রুব সত্য বলে প্রচার করবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগে কয়েক বছর পড়াশুনা করে এবং বহু বছর ধরে মিডিয়ায় কাজ করে তারা যা শিখেছেন সেটাকে আর সংবাদ বলা যাবে না। পাঁচ মন্ত্রী দলাইমলাই করে বলে দিয়েছেন আন্দোলন-অবরোধ উসকানি পেতে পারে এমন খবর প্রকাশ করা যাবে না। এবং বেছে বেছে ভালো খবরগুলো ছাপতে হবে। আমার মনে আছে পাকিস্তাানের জেনারেল ইয়াহিয়া খানও একই উপদেশ দিয়েছিলেন সাংবাদিকদের। এরও আগে ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান বলেছিলেন, আপনারা ভারতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রচার করেন কেন, রবীন্দ্রনাথ তো পাকিস্তাানের বিরোধিতা করেছিলেন (সত্য নয়, লাহোরে পাকিস্তাান প্রস্তাাব পাস হওয়ার সময় থেকে গুরুতর অসু¯’ ছিলেন), রবীন্দ্রসঙ্গীত আপনারা লিখতে পারেন না?
বিদেশীদের চোখে ঠুলি বাঁধা?
বাংলাদেশে এখন বলতে গেলে একমাত্র ঘটনা নিরপে নির্বাচন আর গণতন্ত্রের দাবিতে অবরোধ আন্দোলন। সেটা সরকারের জন্য দুঃসংবাদ, কেননা দেশে অবরোধ চলছে শুনে ধীরে ধীরে আরো মানুষ অবরোধে শরিক হ”েছ। সুতরাং এ খবর প্রচার করা যাবে না। সুখবর কোনটাকে বলবেন তাহলে? মন্ত্রীদের কেউ কেউ বলেছেন, অবরোধ সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে। পরি¯ি’তি কয়েক দিনের মধ্যেই নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসবেন বলে আশ্বাস বিভিন্ন মন্ত্রী তিন সপ্তাহ ধরে দিয়ে চলেছেন। এমনকি কেউ এ দেশে আছেন যিনি মন্ত্রীদের আশ্বাসে বিশ্বাস করেন? সে খবর আপনি কী করে প্রচার করতে পারেন, কেননা অন্য কোনো মন্ত্রী বলেছেন, অবরোধ-টবরোধ কি”ছু হ”েছ না, ওসব একদম বাজে কথা!
বিএনপির আন্দোলনের সময়ের ধ্বংসাত্মক ঘটনাগুলো বিদেশে প্রচার জোরদার করতে প্রধানমন্ত্রী কূটনীতিকদের তাগিদ দি”েছন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিদেশী রাষ্ট্রদূতদের রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় নিমন্ত্রণ করে বিএনপিকে সন্ত্রাসী দল বলে বোঝাতে যথেষ্ট চেষ্টা করেছেন। উল্লেখ্য, যে বিদেশীরা কোনো কোনো বাংলাদেশী মন্ত্রীর মতো স্টুপিড লোকেদের মোটা অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে বাংলাদেশে রাষ্ট্রদূত করে পাঠায়নি। রাষ্ট্রদূতেরা পরি¯ি’তি দেখছেন এবং দেখে তার যথার্থ মূল্যায়নের মানসিক মতা তাদের আছে। সেজন্যই তারা এবং স্বদেশে তাদের সরকার হাজারবার করে বলছে দ্র“ত সংলাপের মাধ্যমে সমঝোতায় এসে সবার গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দাও, নইলে বাংলাদেশের সঙ্কটের অবসান হবে না।
শুনেছি এখন আবার অগ্নিকাণ্ড ইত্যাদির ভয়াবহ ছবি ডিভিডি করে বিদেশে পাঠানো হ”েছ সেসব দেশের সরকারকে জ্ঞানদান করার জন্য। প্রশ্ন উঠবে অবরোধ-হরতাল যদি মিথ্যা হয় তাহলে এসব ঘটনা ঘটছে কেন? এবং মনে রাখতে হবে এই সরকারগুলোই দুই বছর ধরে বাংলাদেশের সরকারকে সুপরামর্শ দিয়ে আসছে, আর ঢাকার সরকার তাতে কর্ণপাত করছে না। সুতরাং সরকারি উদ্যোগে পাঠানো ডিভিডিগুলো দেখে বিদেশী সরকারগুলো কুপোকাত হয়ে যাবে ভাবার কোনো কারণ আছে কি? তা ছাড়া বাংলাদেশে এখন ব্যাপক বলা-কওয়া হ”েছ যে বাসে-ট্রাকে আগুন লাগানোর অনেক ঘটনা সরকার পই ঘটা”েছ বিএনপিকে অপবাদ দেয়ার জন্য। এসব ঘটনার জন্য পুলিশ এ যাবৎ যাদের ধরতে পেরেছে তাদের মধ্যেও সরকার পরে লোক অনেক থাকছে। আরো স্মরণীয় যে, বাসে আগুন লাগানোর রাজনীতি বাংলাদেশে ‘প্রবর্তন’ করেছিল আওয়ামী লীগ। ২০০৪ সালের ৪ জুন আওয়ামী লীগের কর্মসূচিতে শেরাটন মোড়ে বাসে আগুন লাগিয়ে ১১ জন যাত্রী হত্যা করার কথা আওয়ামী লীগ নেতারা ভুলে গেছেন? সে ঘটনার জন্য কাউকে হুকুমের আসামি করা যায় না? এসব খবর রাষ্ট্রদূতদেরও কানে যায় এবং তারা সেসব খবর এবং তাৎপর্য অবশ্যই স্বদেশে সরকারকে জানিয়ে দেন। ‘তোমাদের কথা আমি শুনব না, কিš‘ আমার কথা তোমাদের শুনতে হবে’- বাংলাদেশ সরকারের এই গোঁয়ার্তুমির মনোভাব আন্তর্জাতিক রাজনীতির ধোপে টিকবে বলে কেউ মনে করেন?
অনেক ব্যাপারের উল্লেখ করে ফেললাম। এগুলো অবশ্যই খবর। এগুলোর যেকোনোটা প্রকাশ করতে হলে অবশ্যই মেনে নিতে হবে যে বাংলাদেশে এখন গণতন্ত্রের দাবিতে একটা অবরোধ এবং সেই সাথে মাঝে মাঝে হরতাল চলছে। এবং আরো মেনে নিতে হবে যে প্রায় চার সপ্তাহ থেকে গ্রেফতার, গুম, হত্যা, নির্যাতন ইত্যাদি চালিয়েও সরকার পরি¯ি’তি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না। সুতরাং মিডিয়াকর্মী যদি বর্তমান বাংলাদেশ সম্বন্ধে কোনো সংবাদই প্রচার না করেন তাহলেই শুধু মন্ত্রীদের হুকুম মেনে চলা তাদের পে সম্ভব হতে পারে।
লাশের রাজনীতির নতুন মাত্রা
শুধু বিশ্বসমাজই নয়, দেশের ভেতরের যেসব মহলের ওপর সরকারের নির্ভরশীলতা অত্যধিক তারাও এখন সরকারকে সংলাপে বসে সমঝোতায় আসতে এবং সবার গ্রহণযোগ্য নির্বাচন দিতে পরামর্শ দি”েছ। অস্বীকার করার উপায় নেই ব্যবসায়ী সমাজের উদার অর্থ ও অন্যান্য সাহায্য বিগত ছয় বছরে আওয়ামী লীগের রাজনীতির বিরাট একটা খুঁটি ছিল। ২০০৬ সালের অক্টোবরের লগি-লাঠি-বৈঠার আন্দোলনের সময় থেকে বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে জানাজানি হয়ে গেছে যে জনতা ভাড়া করতে, সে জনতাকে যথা¯’ানে নিয়ে যেতে বাস ও ট্রাক ভাড়া বাবদ বহু কোটি টাকা ব্যবসায়ীসমাজ আওয়ামী লীগকে দিয়েছে। সব দেশেই ব্যবসায়ীসমাজ সরকারের সাথে সদ্ভাব বজায় রাখতে চায়। কিš‘ গণবিরোধী সরকারকে সমর্থন দেয়ার বেলায় তারা হুঁশিয়ার থাকে। সারা দেশের মানুষ যখন গণতন্ত্র চেয়েছেন, গণতন্ত্র না দিলে সরকারকে উৎখাত করতে চেয়েছেন, তখন ব্যবসায়ীসমাজ গণবিরোধী অব¯’ান নিয়েছে, কৃত্রিম শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যব¯’া করে গণবিরোধী সরকারকে টিকিয়ে রেখেছে। ব্যবসায়ীসমাজের কান্নাকাটিতে এখন দেশের মানুষের মন গলবে কি?
সেই ব্যবসায়ীসমাজও এখন করজোড়ে সরকারের কাছে কাকুতি-মিনতি করছে, বলছে, ‘দয়া করে এবার সংলাপে বসুন, নইলে আমরা সর্বহারা হয়ে যাব।’ যুক্তরাষ্ট্রের সাথে লাঠালাঠি করতে গিয়ে তৈরি পোশাকের শুল্কমুক্ত রফতানি সুবিধা সরকার আগেই হারিয়েছে। পাঁচ লাখ বিদেশী ম্যানেজার আমদানি করে গার্মেন্ট শিল্পের বারোটা আগেই বাজিয়ে দেয়া হয়েছে। মালিকেরা বলছেন, অবরোধ আর হরতালের কারণে বিদেশী বায়াররা ৪০ শতাংশ অর্ডার ইতোমধ্যেই বাতিল করে দিয়েছেন। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের প্রেসিডেন্ট হোসেন খালেদ গত সপ্তাহের বৃহস্পতিবার বলেছেন, অবরোধের প্রথম ১৬ দিনে তাদের লোকসান হয়েছে ৩৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। ডিসিসিআই এখন বলছে, বিএনপি ও ২০ দলের সাথে সংলাপই সঙ্কট নিরসনের একমাত্র পš’া। মাত্র সেদিন সুজন একই পরামর্শ দিয়েছে, সম্পাদকেরা তথ্যমন্ত্রীকেও বলেছেন একই কথা, দেশী ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সং¯’াগুলো, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ব্রিটিশ পার্লামেন্টসহ সব বিদেশী সাহায্যদাতা এবং ব্যবসায়িক অংশীদার সরকার ও সং¯’া বরাবরই এই একই কথা বলেছে। দেশে একজন ব্যক্তি কারো পরামর্শই শুনতে রাজি নন বলেই বাংলাদেশ অতলে তলিয়ে যেতে বসেছে।
খালেদা জিয়ার স্বামীকে ষড়যন্ত্র করে হত্যা করা হয়েছে। খালেদার অস্তিাত্ব বিলোপেরও কোনো চেষ্টার ত্রুটি রাখা হয়নি। খালেদাকে তার বাড়ি এবং চার দশকের সংসার থেকে উৎখাত করা হয়েছে, রাজনৈতিক মামলা সাজিয়ে তার ছেলেদের নির্বাসনে পাঠানো হয়েছে, ইট আর বালুর ট্রাক দিয়ে তাকে ভাড়া বাড়ি থেকে বের হতে দেয়া হয়নি, চার সপ্তাহ ধরে নিজের কার্যালয়ে প্রায়-শরণার্থী জীবন যাপন করতে তিনি বাধ্য হ”েছন। একের পর এক বেশুমার মিথ্যা মামলা সাজানো হ”েছ তার বিরুদ্ধে। তাকে নির্মূল করে দেয়ার নির্দেশের প্রতীা করছেন নারায়ণগঞ্জের গডফাদার শামীম ওসমান। সরকারের মন্ত্রীরা অনর্গল তাকে গ্রেফতার করার হুমকি দিয়ে যা”েছন। তার মানসিক স্বা¯’্য নষ্ট করাই যে সরকারের উদ্দেশ্য তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
ঠিক এরকম পরি¯ি’তিতে তার ছেলে আরাফাত রহমান কোকো মারা গেছেন মালয়েশিয়ায়। মায়ের সীমাহীন ভোগান্তি যে তার মৃত্যু ত্বরান্বিত করেনি কে বলবে? এই আকস্মিক বজ্রপাতে খালেদা জিয়ার মনের অব¯’া কেমন হতে পারে সরকারের মন্ত্রীরা ছাড়া অন্য সবাই তা বুঝবেন। সঙ্গত কারণেই তার চিকিৎসক সিডেটিভ ইনজেকশন দিয়ে তাকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছিলেন। সে খবর প্রধানমন্ত্রীর অজানা থাকার কথা নয়। খালেদার কার্যালয়ের সব খবর বিদ্যুৎ গতিতে তার কানে পৌঁছে যায়। বেছে বেছে ওই সময়টাতেই তিনি সমবেদনা জানাতে খালেদার কার্যালয়ে গেলেন। খালেদার উপদেষ্টা-সহায়কদের কি উচিত ছিল ওই অব¯’ায় তার ঘুম ভাঙিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সামনে হাজির করা? প্রধানমন্ত্রী ও তার মন্ত্রীরা কোরাস জুড়ে দিলেন ঘুমন্ত খালেদা জিয়া জাগ্রত প্রধানমন্ত্রীকে অপমান করেছেন। হাতে-পায়ে দড়ি বাঁধা, আর আগেই খাসি করা মিডিয়া ‘অপমান, অপমান’ বলে চিৎকার জুড়ে দিলো। হাসিনার রাজনৈতিক জীবনে কি এমন একটিও দিন ছিল যে দিন তিনি খালেদাকে অপমান করার চেষ্টা করেননি?
জাতির জননী, গণতন্ত্রের জননী
পরলোকগত কোকোর দাফন নিয়েও পরস্পর বিরোধী প্রচারণার অবধি ছিল না। কেউ যেন এক মন্ত্রীর মাথায় ঢুকিয়েছিল আওয়ামী লীগ কোকোর দাফনে অংশ নিলে খালেদাকে শাস্তিা দেয়া হবে। পরে সে আইডিয়া পরিত্যক্ত হলো। শহীদ জেনারেল ও রাষ্ট্রপতি জিয়ার ছেলে হিসেবে সামরিক গোর¯’ানে সমাহিত হওয়ার অধিকার কোকোর ছিল। সরকার সেখান থেকেও তাকে ‘নির্বাসিত’ করেছে। লন্ডনে কোকোর গায়েবানা নামাজে জানাজায় তারেক রহমান তার অতি আদরের ভাই সম্বন্ধে কিছু বললে তা প্রকাশ না করার নির্দেশ আগে থেকেই মিডিয়া-খাসিকে দেয়া হলো। এ দিকে দেশের কোথায় গাড়ি পুড়েছে, কোথায় পুড়েছে বাস এবং সেটা যে সরকারের লোকেরাই করেনি তার নিশ্চয়তা কী। এসবের জন্য খালেদাকে ‘হুকুমের আসামি’ করা হ”েছ। এবং মন্ত্রীরা তার গ্রেফতার নিয়ে এমন জল্পনা-কল্পনা শুরু করলেন যে কানে তালা ধরে গেল। পুলিশ, র্যাব আর বিজিবিতে ইউনিফর্ম পরা আওয়ামী লীগ ঠ্যাঙাড়েরাও যোগ দিলেন সে জল্পনায়। খালেদার মাথা খারাপ করার চেষ্টা করতে গিয়ে মন্ত্রীদেরই যেন মাথা খারাপ হয়ে গেছে। তারা গলাকাটা মুরগির মতো অর্থহীন নাচানাচি করছেন।
আসলে এই মন্ত্রী ও ইউনিফর্মধারী আওয়ামী লীগ নেতারা আজো খালেদা জিয়ার আসল পরিচয় জানতে পারেননি। তার স্বামী বাকশালী স্বৈরতন্ত্র থেকে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চেষ্টা করেছিলেন। রাষ্ট্রপতি জিয়া খুন হলেন সেজন্য। স্বামীর অসমাপ্ত কাজ কাঁধে তুলে নিলেন খালেদা। দৃঢ় হাতে বিএনপির হাল চেপে ধরলেন। সামরিক স্বৈরতন্ত্র আমদানি করে বাধা সৃষ্টি করা হলো। আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব স্বৈরতন্ত্রকে জিইয়ে রেখে গণতন্ত্রে উত্তরণ নয় বছর বিলম্বিত করলেন। খালেদা জিয়া হাল ছেড়ে দেননি। শত ভয়-ভীতি ও চোখ-রাঙানোকে উপো করে তিনি স্বৈরতন্ত্রকে টেনে নামালেন, দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনলেন। বিগত ছয় বছরের নির্যাতন-নিপীড়নের কথা তো আগেই বললাম।
এক ছেলে সাত বছর ধরে নির্বাসিত। সাত বছরেরই নির্বাসনের পর অন্য ছেলে এখন মৃত, সদ্য সমাহিত। তার নিজের বিরুদ্ধে অজস্র সাজানো মামলা। অহরহ তাকে গ্রেফতারের, হত্যার ভয় দেখানো হ”েছ। শোকে-দুঃখে খালেদা জিয়া মৃতকল্প। এখন কী করবেন তিনি? গণতন্ত্রের আন্দোলন ছেড়ে দিয়ে তসবিহ হাতে দিন কাটাবেন? েেপছেন? জাতি তাকে নেতৃত্ব দিয়েছে, গণতন্ত্রের জননী আখ্যা দিয়েছে। অর্ধমৃত হলেও মৃত তো তিনি নন। সুতরাং মাঝ নদীতে হাল ছেড়ে দেয়ার প্রশ্নই ওঠে না। খালেদা জিয়া শোক ঝেড়ে ফেলে আবার উঠে দাঁড়াবেন, স্বামীর অসমাপ্ত কাজ নতুন করে সমাপন করবেন। শত হলেও তিনি জাতির ও গণতন্ত্রের জননী।
(লন্ডন, ২৭.০১.১৫)
সিরাজুর রহমান: বিবিসিখ্যাত প্রবীণ সাংবাদিক
মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫
‘জাতীয় ঐকমত্যের সরকার’ বিতর্ক
ফরহাদ মজহার
সম্প্রতি দেশের চলমান রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনে বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. এমাজউদ্দীন আহমদ ‘জাতীয় ঐকমত্যের সরকার’ গঠন এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তাব করে সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন মিলনায়তনে ২৮ জানুয়ারি তারিখে ‘চলমান জাতীয় সঙ্কট: উত্তরণের পথ’ শীর্ষক একটি সভা করেছেন। সেই সভায় বিচারপতি আবদুর রউফ, খোন্দকার মাহবুব হোসেন, লে. ক. (অব:) মোহাম্মদ সেলিম, রুহুল আলম গাজীসহ আরো অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তির সঙ্গে আমাকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তার জন্য তাঁকে ও সভার উদ্যোক্তাদের আমি আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। দৈনিক পত্রিকায় এ বিষয়ে খবর অনেকেই দেখেছেন।
বলাবাহুল্য বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক সঙ্কটের সময় পারস্পরিক আলাপ আলোচনা ও সমাধান অন্বেষণ অবশ্যই ইতিবাচক। সভায় ‘জাতীয় ঐকমত্যের সরকার’ গঠনের প্রস্তাব পেশ করা হবে তা আমি আগে জানতাম না এবং আমার সঙ্গে আগে এ বিষয়ে আলোচনা করা হয় নি। ডক্টর এমাজউদ্দীন আহমদ ছাড়া কারা এই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সেটাও জানি না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা জটিল এবং সমাধানের নীতি ও কৌশল নির্ধারণ আগের যেকোনো পরিস্থিতির তুলনায় কঠিন। এই ধরনের সংবেদনশীল সময়ে কোনো প্রস্তাব পেশ করার আগে তা নিয়ে প্রচুর আলাপ-আলোচনা দরকার এবং বাস্তব ও যুক্তিসঙ্গত হলেও কখন কিভাবে কোন ভাষায় তা হাজির করতে হবে সেই বিষয়েও বিচক্ষণ ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন হওয়া খুবই জরুরি।
এটা ঠিক যে ‘জাতীয় ঐকমত্যের সরকার’ কথাটি নামকরণের দিক থেকে আওয়ামী লীগের পুরানা রাজনীতির অনুরণন, এমনকি ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ মার্কা ‘জাতীয় ঐকমত্য’কে প্রাধান্য দিয়েই নির্বাচন ও সরকার গঠন করেছে। হাসানুল হক ইনু, রাশেদ খান মেননকে নিয়ে বর্তমানে যে সরকার রয়েছে সেটা জাতীয় ঐক্যের আওয়ামী ধারণা অনুযায়ী ‘ঐকমত্য’-এর সরকারই বটে। প্রফেসর এমাজউদ্দীন আগামী দিনের জন্য এই ধরনের একটি সরকারের অধিক কিছু ভাবতে পারছেন কি না সেটা স্পষ্ট নয়। তাঁর লেখালিখির মধ্যে আমি তা খুঁজে পাই নি। সে যা-ই হোক, সম্প্রতি তিনি শ্রীলঙ্কার নির্বাচনী অভিজ্ঞতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বলেছিলেন, ‘শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রী মেনে নিয়ে নির্বাচন হতে তো সমস্যা নেই’।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা ও পরিস্থিতি কোনোভাবেই শ্রীলঙ্কার মতো নয়। শ্রীলঙ্কায় হয়েছে বলে বাংলাদেশেই সেটা সম্ভব এটা ভাবার কোনো কারণ নাই। কিন্তু তারপরও তিনি চাইছেন শেখ হাসিনার অধীনেই একটা নির্বাচন হোক। এ কথা বলার অর্থ শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন না করে বিশ দলীয় জোট ভুল করেছে! এখন তা সংশোধন করতে হবে। তাই কি?
তাঁর হঠাৎ আন্দোলনের মাঝখানে এ কথা বলার অর্থ কি? আগামী দিনে শেখ হাসিনার সরকারে যেভাবে এরশাদ, হাসানুল হক ইনু ও রাশেদ খান মেনন আছে তেমনি কি তিনি বিএনপির নেতাদেরও যোগদান চান? তাঁর কাছে সম্ভবত রওশন এরশাদের অধিক মর্যাদা বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নাই। তিনি কি চান রওশন এরশাদের মতোই খালেদা জিয়া হাসিনার সরকারে বিরোধীদলীয় নেত্রী হিসাবে যোগদান করুক? বিরোধী দলের আন্দোলনে যারা অত্যাচার নির্যাতন, হত্যা, গুম, খুন ও বুকে গুলি নিয়ে শহীদ কিম্বা পঙ্গু হচ্ছেন, আগুনে পুড়ে মরছেন- সেই সকল নেতাকর্মীর কাছে এই ধরনের প্রস্তাব চরম অবমাননাকর বলে গণ্য হতে পারে। এই দিকগুলো বিবেচনায় না নিয়ে শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন করবার কথা বলা ঠিক হয় নি।
তারপরও বলব ডক্টর এমাজউদ্দীন আহমদ যা সঠিক মনে করেন তা বলার অধিকার তাঁর আছে এবং তাঁর কিম্বা অন্য যে-কারো প্রস্তাব নিয়ে আলোচনাতে আমার কোনোই আপত্তি নাই। তবে ২৮ তারিখে সভায় যখন ঘোষণা করা হলো যে এই প্রস্তাবে আমি স্বাক্ষর করেছি, তখন মঞ্চ থেকেই আমি প্রতিবাদ করতে বাধ্য হয়েছিলাম। জানাতে হয়েছে বিরোধী দলের অবরোধ কর্মসূচির কোনো দৃশ্যমান পরিণতি বিচার না করে এই ধরনের কোন প্রস্তাব আন্দোলন-সংগ্রামের বর্তমান চলমান মুহূর্তে আমি সমর্থন করি না, স্বাক্ষর করার প্রশ্নই আসে না। ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থার কাঠামো যেমন আছে তেমনি অক্ষত রেখে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এক পরে হাত থেকে আরেকটি পরে হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর আমার রাজনীতি না। এই রাজনীতি আমি করি না। সাত দফার সীমাবদ্ধতা এবং ব্যাপক জনগণকে সম্পৃক্ত করবার ক্ষেত্রে বিরোধী জোটের আন্দোলনে ও কৌশলে ব্যর্থতা থাকতে পারে কিন্তু জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন চায়। অতএব আমাদের কাজ হচ্ছে ফ্যাসিবাদ, ফ্যাসিবাদী শক্তি ও ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনগণের গণতান্ত্রিক শক্তি আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে কিভাবে বিকশিত হতে পারে তার প্রতি মনোযোগী হওয়া। নির্বাচন তো হতেই হবে। সেটা কখন কিভাবে কোন পদ্ধতিতে হবে সেটা আন্দোলনের সাফল্য বা পরিণতির ওপর ছেড়ে দেওয়াই সমীচীন।
এরপরও কালের কণ্ঠ পত্রিকায় একটি খবর দেখে আমি অবাক হয়েছি। ‘শত নাগরিক’ নামক সংগঠনটির জাতীয় কমিটির সদস্যসচিব হিসাবে কবি আবদুল হাই শিকদার স্বাক্ষরিত সংবাদের বরাত দিয়ে প্রকাশিত সংবাদে ড. এমাজউদ্দীন আহমদের প্রস্তাবে যারা ‘একমত পোষণ করেছেন’ তাদের নামের তালিকা প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে আমার নাম দেখে চোখ কপালে ওঠার জোগাড়! ফলে আমাকে আবারও প্রতিবাদ করতে হচ্ছে। আমি সুস্পষ্ট ভাবে সকলকে জানিয়ে দিতে চাই এই ধরনের প্রস্তাব বা উদ্যোগের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নাই এবং সকলের প্রতি শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছা থাকা সত্ত্বেও আমি কখনই কোনো কালে ‘শত নাগরিক’-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না বা যুক্ত নই। (দেখুন, ‘এমাজউদ্দীনের প্রস্তাবে শত নাগরিকের সমর্থন’)
যেখানে চলমান সঙ্কট নিরসন দূরে থাকুক, তাকে আরো তিক্ত, কুৎসিত ও হিংস্রপর্যায়ে নিয়ে যাবার জন্য খালেদা জিয়ার বিদ্যুতের লাইন কেটে দেওয়া হচ্ছে, তাকে না খেয়ে মারবার হুমকি দেওয়া হচ্ছে, ডিশ লাইন, ইন্টারনেট সংযোগ ছিন্ন করা হচ্ছে- সেই সময় শত নাগরিকদের উচিত ছিল ঐক্যবদ্ধ ভাবে রাস্তায় নেমে আসা, প্রতিবাদ করা এবং আন্দোলনের বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও নানাবিধ ষড়যন্ত্রের উপযুক্ত জবাব দেওয়া। কিন্তু সেই দিকে মনোযোগ না দিয়ে অনেককেই এখন দেখছি আওয়ামী লীগের অনুকরণ কিম্বা অনুরণনে প্রস্তাবিত ‘জাতীয় ঐকমত্য সরকার’ গঠনের প্রস্তাব সমর্থন করছেন।
বিরোধীদের ওপর সরকারি দলের কথা ও কাজে নিরন্তর নগ্ন ও কুৎসিত আক্রমণের মুখে ন্যূনতম প্রতিবাদে না গিয়ে উলটা সেই সরকারকে সাথে নিয়েই কি তারা ‘জাতীয় ঐকমত্যের সরকারের’ প্রস্তাব করছেন? কেন করছেন আমি জানি না। এই আবেদন নিবেদনের অর্থ কি তা আমি বুঝতে অম। ফলে আমার রাজনীতির সাথে ক্ষক্ষমতাসীনদের কাছে এই অবাস্তব আবেদন নিবেদনের কোন মিল আমি খুঁজে পাই নাই। চলতি রাজনৈতিক ক্রাইসিসে এটা কোন বাস্তবোচিত প্রস্তাব নয়। তাই আমি তাদের পরিষ্কার জানিয়ে দিতে চাই, যদি তা-ই হয়, তাহলে আমি তাদের সাথে একমত নই।
দুই.
‘জাতীয় ঐকমত্যের সরকার’ ধারণা যদি ক্ষক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সমর্থক বুদ্ধিজীবীদের পক্ষ থেকে আসত তাতে হয়তো কিছু আবেদন থাকত। এটা বিএনপি সমর্থক বুদ্ধিজীবীদের কাছ থেকে আসায় আমি মনে করি এই মুহূর্তে ২০ দলীয় জোটের আন্দোলনকে এই দাবি বিভ্রান্ত ও বিভক্ত করতে পারে। দেশকে আরো দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির দিকে নিয়ে যেতে পারে। এই ধরনের প্রস্তাব সাধারণ জনগণ বিশেষত যারা আন্দোলন সংগ্রামে জীবন দিচ্ছেন তাদের কাছে ষড়যন্ত্র গণ্য করবার কারণ হতে পারে। আশা করি, যারা তার প্রস্তাব করছেন তারা এসব বিবেচনায় নেবেন।
শেখ হাসিনা তো নির্বাচনের আগে জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। যদি এটাই এখন চাই তাহলে তখন সেই প্রস্তাব লুফে নেওয়া হলো না কেন? যারা ক্ষমতাসীন রয়েছেন তাদের সমর্থনের বাইরে জাতীয় ঐকমত্যের সরকার ধরনের কোন অন্তর্র্বতী সরকার যদি আদৌ রাজনৈতিক কারণে গঠন জরুরি হয়ে পড়ে তাহলে ক্ষমতাবানরাই সেটা গঠন করে, তাহলে এখন এই ধরনের সরকার গঠনের শক্তির ভিত্তি কি? কারা এই সরকার গঠন করতে চাইছে? এটা কি আন্দোলন-সংগ্রামে বিজয়ী রাজনৈতিক পক্ষে নাকি ক্ষমতাসীন সরকার সদাশয় হয়ে এই ধরনের সরকার কবুল করবেন?
এই ধরনের প্রস্তাবের রাজনীতিকরণ না ঘটিয়ে অর্থাৎ এখনই সমাধানের প্রস্তাব হিসাবে পেশ না করে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে কিভাবে নতুন অন্তর্র্বতী ক্ষমতা তৈরি হয়, কিম্বা বিদ্যমান বাস্তবতা বিচার করে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া কী হতে পারে তা নিয়ে আলোচনা হতেই পারে। সেটা তাত্ত্বিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ রাখাই বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সতর্ক প্রজ্ঞার কাজ। এ ক্ষেত্রে যে প্রশ্নগুলো শুরুতেই উঠে আসে সেটা হোল কারা এই সরকার গঠন করবে? জাতীয় ঐকমত্যের সরকার তো বললেই গঠিত হয়ে যাবে না, বা চাইলেই গঠন করা যায় না; এর সঙ্গে সরাসরি ক্ষমতার প্রশ্ন জড়িত। সেই ক্ষমতা তৈরি হবে কিভাবে? কিম্বা সেই ক্ষমতা হাজির থাকলে সেটা কোথায় কিম্বা কারা? যারা ক্ষমতায় আছেন এবং ক্ষমতাবান তারা এই ধরনের সরকার চাইবেনই বা কেন? কিম্বা এই ধরনের সরকার গঠন করবার ক্ষমতা যাদের আছে তারা আদৌ এই ধরনের সরকার গঠনে শক্তি জোগাবে কি? যদি ক্ষমতাসীনেরা এই ধরনের সরকারে সমর্থন না দেয় অর্থাৎ যদি এই সরকার শেখ হাসিনার অধীন রওশন এরশাদ-ইনু-মেনন জাতীয় না হয় তাহলে এর পেছনের অনুমানটি কী? সেটা কি এই যে এর সমর্থন বাংলাদেশের সেনাবাহিনী, কিম্বা বিদেশী দেশগুলোর কাছ থেকে আসতে হবে। অতীতে আমরা এমন দেখেনি যে তা নয়, কিন্তু তা সবসময়ই জনগণের স্বার্থের বদলে বিদেশী স্বার্থ রার নির্দেশ পালনের বিপদে আমাদের নিক্ষিপ্ত করেছে। জনগণের গণতান্ত্রিক শক্তিকে বিকশিত না করে এবং জনগণের ওপর আস্থা না রেখে রাষ্ট্রের সশস্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা কিম্বা বিদেশী কোনো পরাশক্তির সঙ্গে হাত মেলানো বিচক্ষণ কিম্বা আদর্শ রাজনীতি নয়।
কিন্তু তার পরেও বলা যায় বর্তমান জাতীয় সঙ্কট থেকে বেরোতে হলে একটা অন্তর্র্বতীকালীন সরকার রাজনৈতিক ভাবে প্রয়োজনীয়। কিন্তু রাজনৈতিক মীমাংসার তর্ককে শুধু আইনি ও সাংবিধানিক তর্ক হিসাবে দেখা ও দেখাবার জন্য আইন পেশার অনেককেই অতি উৎসাহিত হয়ে উঠতে দেখা যায়। যেমন এখন অন্তর্র্বতীকালীন সরকারের বৈধতা কী নিয়ে তা নিয়ে তারা বেজায় চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। তারা এখনো বুঝতে পারেন না বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ কোনো কন্সটিউটিউশনাল বৈধতার তোয়াক্কা করেনি। জনগণের ইচ্ছা ও আকাক্সাই সকল ক্ষমতা এবং তার বৈধতার উৎস, উকিলদের ওকালতি নয়, কিম্বা কোনো সংবিধানও নয়। উকিল মোক্তারের প্রাদুর্ভাব আমাদের দেশে প্রায়ই প্রকট রাজনৈতিক বিপর্যয় তৈরি করে।
সংবিধানের বাইরে জনগণের ক্ষমতার ধারণা ও তার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জনগণের নাই তা নয়। একাত্তর তো বটেই। এমনকি সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ক্ষমতা দখল বা ক্ষমতাচ্যুতি কোনোটিই সাংবিধানিক ভাবে হয় নি। ত্রিদলীয় জোটের রূপরেখা অর্থাৎ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতই তাকে তাড়ানো সম্ভব হয়েছিল। সেই সিদ্ধান্তকে পরে সাংবিধানিক বৈধতা দেওয়া হয়েছিল। গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে একটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন ও বাংলাদেশকে নতুন ভাবে গঠন করবার সম্ভাবনা তখন দেখা দিয়েছিল। তাকে নস্যাৎ করে দিয়েই সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রার নামে পুরানা অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রটিকে টিকিয়ে রাখা হয়েছে। যার কুফল আমরা এখন হাড়ে হাড়ে ভোগ করছি।
তাহলে দেখা যাচ্ছে, এই মুহূর্তে অন্তর্র্বতীকালীন সরকার হিসাবে ‘জাতীয় ঐকমত্যের সরকার’-এর প্রস্তাব কোন পরিণত বিবেচনা থেকে পেশ করা হয় নি। রাজনৈতিক প্রশ্নের রাজনৈতিক মীমাংসা কথাটা প্রচলিত হলেও তার মানে আসলে কী সে বিষয়ে যথেষ্ট আলোচনা আমাদের সমাজে হয় নি। গণ-আন্দোলন ও রাজনীতিই একাত্তর কিম্বা সাতই নভেম্বরের মতো নির্ধারণ করে দেবে যে জনগণ কিভাবে রাজনৈতিক প্রশ্নের মীমাংসা করবে। এটা আইনি বা সাংবিধানিক ব্যাপার মাত্র নয়। কোনো প্রস্তাব দিয়ে নয়, বরং সঠিক রাজনৈতিক কর্মসূচির ভিত্তিতে রাজনৈতিক লড়াই-সংগ্রামের মধ্য দিয়েই সেই মুহূর্ত আদায় করে নিতে হয়। ইতিহাস সেই স্যাই বারবার দেয়।
তবে এত কিছুর পরেও অধ্যাপক এমাজউদ্দীনের প্রস্তাবের ইতিবাচক দিক হচ্ছে নির্বাচনকেই সমাধান গণ্য করলেও বর্তমান সঙ্কটের সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার দিকটা তিনি নজরে এনেছেন। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পথ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী বন্ধ করে দিয়েছে। সংশোধনীতে সংসদ বহাল রেখেই নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তিনি এটা বদলাতে চান এবং যেসব প্রতিষ্ঠান নির্বাচনের সঙ্গে সংযুক্ত সেই সব প্রতিষ্ঠানের সংস্কারও করতে চান। কিন্তু বর্তমান সংবিধান মানবিক ও নাগরিক অধিকার ক্ষুন্ন করেছে এবং একটি ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম করেছে সেই বিষয়ে তিনি নীরব। তিনি ততটুকুই সংস্কার চান যতটুকু নির্বাচনের জন্য দরকার। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণের একটি গণতান্ত্রিক সংবিধান জরুরি সেই প্রয়োজনীয়তার কোনো ইঙ্গিতই তিনি দেন নি।
নির্বাচনের জন্য সংবিধানের সংস্কার বর্তমান সংবিধান রুদ্ধ করেছে, এটা তিনি ঠিক বলেছেন। যদি সংবিধান দিয়ে সংবিধান তিনি সংশোধন করতে চান তাহলে সেটা কি তিনি ক্ষমতাসীনদের দিয়ে করাবেন? সেটা হবে তাঁর ভাষায় বিদ্যমান সংবিধান দিয়ে সংবিধান সংশোধন করা। অথচ সেটা সম্ভব নয় সেটাও তিনি জানেন। তাহলে সংবিধানের সংস্কার করতে হবে অসাংবিধানিক ভাবে। তাঁর ভাষায় ‘সংবিধান সংশোধন না করে’ করা। সেটা কেমন? বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে? এই মহৎ কর্ম নাকি করবেন প্রেসিডেন্ট। কিন্তু সংবিধানে প্রেসিডেন্টের তো সেই ক্ষমতা নাই। তবুও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক এমাজউদ্দীন বলছেন, তিনি প্রেসিডেন্টকে দিয়ে একটি অধ্যাদেশ জারি করে জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠন করবেন। পরর্র্বতীকালে যে সংসদ গঠিত হবে ওই সংসদ প্রেসিডেন্টের অধ্যাদেশকে অনুমোদন দেবে। কায়দাটা পুরানা। অসাংবিধানিক ভাবে ক্ষমতা বদলাও, তারপর সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ ব্যবহার করে ‘অবৈধ’ কাজ বৈধ করে নাও। কিন্তু প্রেসিডেন্ট অসাংবিধানিক ভাবে সংবিধান বদলাতে চাইলে তাঁকে তা করতে দেবে কে? তার কোনো উত্তর আমার জানা নাই। শ্রদ্ধাভাজন অধ্যাপক এমাজউদ্দীনের তা জানা থাকলে তিনি আশা করি আমাদের জানাবেন। যদি জনগণের ইচ্ছা ও সঙ্কল্পই ক্ষমতার উৎস ও বৈধতা হয়, তাহলে জাতীয় ঐকমত্যের সরকারে বৈধতা নিতে এত সাংবিধানিক ক্যারিকেচারের কী দরকার? (দেখুন, ‘প্রেসিডেন্ট অধ্যাদেশ জারি করে ঐকমত্যের সরকার গঠন করতে পারেন’, মানবজমিন ২ ফেব্রুয়ারি ২০১৫)
তিন.
আমার বিভিন্ন লেখায় আমি বারবার বলেছি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সঙ্কট নির্বাচনে না, সেটা রাষ্ট্রগঠনের গোড়ায় নিহিত। একাত্তরে আমরা সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারে এই ধরনের একটি রাষ্ট্র গঠনের জন্য যুদ্ধ করেছি ও জীবন দিয়েছি। স্বাধীনতার ঘোষণায় যা সুস্পষ্ট ভাবে ঐতিহাসিক দলিল হয়ে রয়েছে। এই ইতিহাস অস্বীকার করবার কোনো সুযোগ নাই। কিন্তু স্বাধীনতার এই অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে একটি দলের আদর্শ ও কর্মসূচিকে বাংলাদেশের জনগণের সংবিধান হিসাবে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। দেশ বিভক্ত হয়েছে, সমাজ বিভক্ত হয়েছে আজ আমরা পরস্পরকে নির্মূল করতে উদ্যত। এই বিশ্বাসঘাতকতার ধারাবাহিকতায় আজ পঞ্চদশ সংশোধনীর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে একটি ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম হয়েছে। তার সাংবিধানিক, আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি আছে। যে ফ্যাসিবাদ দেশে কায়েম হয়েছে তার সমাধান ফল চলতি কনস্টিটিউশনের মধ্যে নাই। ফলে নতুন ভাবে রাষ্ট্র গঠনের কথা জনগণকে ভাবতেই হবে। মুক্তিযুদ্ধই বাংলাদেশের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করবার ক্ষেত্রে। মুক্তিযুদ্ধের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে যারা বাংলাদেশকে বিভক্ত, রক্তাক্ত, হানাহানি, হত্যা, গুম ও সহিংস দলবাজির ক্ষেত্রে পরিণত করেছে- তাদের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক জনগণের লড়াই ছাড়া কোনো স্থিতিশীল রাষ্ট্র, সরকার ও সমাজ গঠন অসম্ভব বলেই আমি মনে করি। সাধারণ মানুষ বারবার প্রাণ দিতে থাকবে এবং তার ফল নেবে দুই পরে লুটেরা দুর্বৃত্ত ও দুর্নীতিবাজ বিভিন্ন গোষ্ঠি। নিজ কোটারি স্বার্থের জন্য যারা হেন কোনো হীন কাজ নাই যা করে না বা করতে পারে না। এই ভাবে দেশ চলতে পারে না।
যারা আমার লেখালিখির সঙ্গে পরিচিত তারা যেন বিভ্রান্ত না হন তার জন্য আমি আবারও জোর দিয়ে বলছি শ্রদ্ধাভাজন অধ্যাপক এমাজউদ্দীনের জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠনের প্রস্তাব বা উদ্যোগের সঙ্গে একমত হওয়া তো দূরের কথা আমার কোনো দূরবর্তী সংশ্রবও নাই। এ ধরনের প্রস্তাব চলতি সঙ্কট মেটাতে কাজে আসবে না। প্রেসিডেন্টকে দিয়ে অধ্যাদেশ জারির কথা এমনকি নতুন অন্তর্র্বতী ক্ষমতা তৈরি বা সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার মধ্যে ক্ষমতা হস্তান্তরের পক্ষে সংলাপ শুরুর প্রস্তাবও হতে পারে কি না সে ব্যাপারেও আমার ঘোর সন্দেহ রয়েছে। রাজনীতির পক্ষগুলো যদি আদৌ কোনো রাজনৈতিক সমাধান চায় তাহলে প্রস্তাব ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকেই আসতে হবে।
ফরহাদ মজহার: কবি: কলামিস্ট ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক
ই-মেইল : ভধৎযধফসধুযধৎ@যড়ঃসধরষ.পড়স
মঙ্গলবার, ১ এপ্রিল, ২০১৪
সংগীতে বিশ্বরেকর্ড জাতিগঠনে কোনো ভূমিকা রাখবে কি?
মাহফুজ আনাম : আবেগ দিয়ে চিন্তা করলে ‘লাখো কণ্ঠে সোনার বাংলা’ মনের জন্য প্রশান্তিদায়ক একটি কর্মসূচি। কিন্তু জাতিগঠনে কি এটি কোনো ভূমিকা রাখবে?
আমরা সাংবাদিকেরা একটু রূঢ় প্রকৃতির হয়ে থাকি। আমাদের সঙ্গে তর্ক করা কিংবা আমাদের কোনো কিছু বোঝানো যেমন একটু কঠিন, তেমনি যেকোনো কিছু বুঝিয়ে আমাদের সন্তুষ্ট করা আরো বেশি কঠিন। বিশেষ করে যখন কোনো বিষয়ে বিন্দুমাত্র প্রচারণার আভাস থাকে, তখন আমাদের চরিত্রের ‘অনুসন্ধিৎসু’ দিকটি আরো খানিকটা প্রখর হয়ে ওঠে।
আর যদি এই প্রচারণা রাষ্ট্র তথা সরকার চালায় তাহলে তো আর কথাই নেই। এক একটি বিষয়কে একাধিক দৃষ্টিকোণ ব্যবহার করে বিভিন্ন দিক থেকে বিশ্লেষণ করি আমরা। তারপরে বিষয়টি যতই ভালো কিংবা উদ্দীপ্ত হোক না কেন, তার সবচেয়ে খারাপ দিকটা বের করে আনি আমরা। এটাই আমাদের কাজ। কিন্তু এর ফলে অনেক সময়ে অনেকের কাছেই আমাদের কাজ বেশ বিস্বাদ হয়ে ওঠে। ‘নির্ভেজাল’ আশীর্বাদ হিসেবে কোনো কিছুকে যাচাই করতে আমরা ব্যর্থ বলে প্রায়ই অনেকেই সমালোচনা করেন। ঠিক যেমনটা হলো ‘লাখো কণ্ঠে সোনার বাংলা কর্মসূচি’কে ঘিরে।
তবে ‘লাখো কণ্ঠে সোনার বাংলা কর্মসূচি’ নিয়ে কথা বলার আগে আমি চলমান টি-২০ বিশ্বকাপ সিরিজকে কেন্দ্র করে যে বিলবোর্ডগুলো লাগানো হয়েছে, সেগুলোর ব্যাপারে কিছু বলতে চাই। আমাদের প্রতিবেশী অঞ্চল কলকাতার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি তার পুরো শহরকে নিজ প্রচারণা সম্বলিত বিশাল আকারের বিজ্ঞাপনী চিত্র দিয়ে ঢেকে দিয়েছেন। সেই তুলনায় আমাদের প্রধানমন্ত্রী অনেক বেশিই সংযত আচরণ করেছেন বলে তিনি তার প্রাপ্য প্রশংসাও পেয়ে গেছেন। কিন্তু আর নয়। টি-২০ বিশ্বকাপ উপলক্ষে শহর ছেয়ে গেছে শতাধিক বিলবোর্ডে। প্রতিটি বিলবোর্ডেই দেখানো হয়েছে যে তিনি (প্রধানমন্ত্রী) আমাদের খেলোয়াড়দের কত উৎসাহ দিচ্ছেন। (খেলায় আমাদের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স, বিশেষ করে হংকংয়ের বিপরীতে আমাদের ক্রিকেটারদের পরাজয়ের পরে এসব বিলবোর্ডের বিষয়ে তার আফসোস করা উচিত ছিল।)
এই ধরনের আত্ম-প্রচারণার উদ্দেশ্য কী, তা কখনো যাচাই করা হয়নি। এগুলো হলো সর্বগ্রাসী মানসিকতারই একটি অংশ ও উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সাম্যবাদী একনায়কতন্ত্র, যার সর্বশেষ নজির হলো উত্তর কোরিয়া। (গতকাল প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়ার সরকারপ্রধান তার দেশের সব পুরুষকে তার হেয়ার স্টাইল অনুসরণ করে ঠিক একইরকম করে চুল কাটার আদেশ দিয়েছেন।)
প্রধানমন্ত্রী যে কারণই দেখান না কেন, সবগুলো বিলবোর্ডে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সঙ্গে বিসিবি প্রধানও নিজের যে ছবিটি লাগিয়ে দিয়েছেন তার আসলেই কোনো অর্থ আমরা পাই না। ঠিক কোন ধরনের সম্ভাব্য উৎসাহ তার কাছ থেকে আমরা পেতে পারি? একইভাবে একই উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিও, যা আমাদের মতে, তার স্মৃতি-গৌরব-মর্যাদার প্রতি অপমান বৈ আর কিছুই নয়। এই কাজটি যে বা যারাই করে থাকুক না কেন, প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ ও অনুগ্রহভাজন হওয়ার উদ্দেশ্যে কাজটি করেছে। কিন্তু এর ফলে মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর পিতা আমাদের জাতির পিতার।
‘লাখো কণ্ঠে সোনার বাংলা’র প্রসঙ্গে আসছি। বাংলাদেশী হিসেবে আমরা বরাবরই বিশাল জনসমাবেশ করতে যে বেশ পছন্দ করি তা গোপন কিছু নয়। আমার বয়সী লোকেরা বেশ মনে করতে পারবেন, ষাটের দশকের শেষ দিকে বাংলাদেশের উত্থানকালে বেশ কয়েকটি ঐতিহাসিক বৈঠকের কথা যার ফলে জন্ম নিয়েছিল ছয় দফা ও ১১ দফা আন্দোলন কর্মসূচিগুলো। এছাড়াও আছে ১৯৭০ সালের জানুয়ারিতে নির্বাচন পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের বিজয় মিছিল, ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর বিখ্যাত সেই ভাষণ, দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে তার স্বদেশে প্রত্যাবর্তন ইত্যাদি ঐতিহাসিক ঘটনা যখন সারা দেশের মানুষের ঢল নেমেছিল একটি নির্দিষ্ট জায়গায়।
জিয়াউর রহমানের জানাজা কিংবা এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সাক্ষী আমি ছিলাম না, তাই বঙ্গবন্ধুর সময়ের তুলনায় এসব সময়ে জনতার ঢল কীরকম ছিল তা বলতেও পারছি না। তবে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন পড়ে জেনেছি যে, এসব সময়েও বিশাল জনসমাবেশ ঘটেছিল।
তারপর থেকে সময়ের সঙ্গে আমাদের রাজনীতি ক্রমাগত ভঙ্গুর হতে শুরু করায় জাতীয় প্রয়োজনেও আমাদের জাতিকে ঐক্যবদ্ধ ও একত্রিত করার ক্ষমতা হারিয়েছি আমরা।
এই বিষয়টি মাথায় রেখে গত বুধবার স্বাধীনতা দিবস উদযাপন ও আমাদের জাতীয় সঙ্গীত গেয়ে বিশ্ব রেকর্ড গড়ার জন্য যে প্রায় আড়াই লাখ মানুষের জনসমাবেশের বিষয়টি অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। এর অনুপ্রেরণার দিকটি ভেবে দেখলে এই ঘটনাটি অবশ্যই অনন্য সাধারণ একটি ঘটনা। এটা কল্পনা করা বেশ কঠিন যে, বিশ্বের যেকোনো দেশের নাগরিকদের একটি অংশ সম্মিলিতভাবে তাদের সবচেয়ে প্রিয় গান, তাদের জাতীয় সঙ্গীত গাইবেন আর তখন তাদের সমর্থন দিতে সে সময় আরো লাখো মানুষ ছুটে যাবেন না। একই ঘটনা ঘটেছে আমাদের ক্ষেত্রেও। আর আবেগপ্রবণ জাতি হিসেবে আরো অনেক জাতির তুলনায় সম্ভবত এক্ষেত্রে আমাদের প্রতিক্রিয়া কিছু বেশিই ছিল।
মুক্তিযুদ্ধের সময় যে লক্ষাধিক ব্যক্তিরা দেশকে স্বাধীন করার জন্য যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন তাদেরই মধ্য থেকে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এই ঘটনাটি আমার কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। মুক্তিযুদ্ধের কারণেই আজ বিশ্বের সামনে আমাদের একটি স্বতন্ত্র পরিচয় আছে। আমাদের জীবনের সেই যৌবনোদ্দীপ্ত সময়ে যখন আমাদের তারুণ্য প্রাণশক্তিতে ভরপুর ছিল, তখন লক্ষ্য নির্ধারণ করে এবং সে লক্ষ্যে কিভাবে পৌঁছাতে হবে কিংবা আমাদের ভবিষ্যৎ কী তা না জেনেই আমরা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। বুধবারের স্বাধীনতা দিবসে জনতার ঢল সেই সময়ের স্মৃতিতেই আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে গেছে। সে সময়ে গান ও কবিতা আমাদের জীবনে খুব গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিল, বিশেষ করে ‘সোনার বাংলা’ গানটি।
আমার মনে আছে, যুদ্ধের সময় ক্যাম্পে থাকাকালীন যখন আমরা আমাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় বা গৃহস্থালি কাজগুলো করতাম তখন এই গানটি গুনগুন করে গাইতাম। আর গানটি গাওয়ার সময় ‘আমি তোমায় ভালোবাসি’ যখন গাইতাম, তখন আমাদের মধ্যে ঠিক সেই অনুভূতিই কাজ করতো যে অনুভূতিটি কাজ করতো যখন আমরা আমাদের ‘প্রিয় মানুষটিকে’ কথাটি বলতাম।
নিজেদের মুক্ত করার জন্য, স্বাধীনতা অর্জনের জন্য বিশ্বের যেকোনো অঞ্চলে যাদেরকেই যুদ্ধ করতে হয়েছিল, তাদেরই মতো আমাদেরও ছিল নিজস্ব জাতীয়তাবাদ ও সশস্ত্র সংগ্রাম। চিন্তা করতে গেলেই চিন্তার মুহূর্তটিতে এই জাতীয়তাবাদ ও সশস্ত্র সংগ্রাম আমাদের সবচেয়ে ভালোবাসার সম্পর্কে পরিণত হয়- দেশের জন্য ভালোবাসা, জনমানুষের জন্য ভালোবাসা, সংস্কৃতির জন্য ভালোবাসা, আমাদের ঋতু-নদীর জন্য ভালোবাসা, বৃষ্টির জন্য ভালোবাসা (উফ্, সে সময়ে বৃষ্টিতে ভেজার জন্য কী আকুল আকাঙ্ক্ষা ছিল আমাদের!), এবং অবশ্যই আমাদের শিল্পকলা-বিশেষ করে গানের জন্য ভালোবাসা। সেই দিনগুলোতে আনন্দ-উল্লাসের সময় ‘আমরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি’ গানটি সত্যিই আমাদের অনুভূতিকেই প্রকাশ করতো।
স্বাভাবিকভাবেই সে সময় সবগুলো গানের মধ্যে ‘সোনার বাংলা’ গানটিকেই আমরা সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি, সে সময় এই গানটিই আমাদের সবচেয়ে বেশি উৎসাহিত করেছিল। আর সে সময় যেকোনো একজন গানটি গাইতে শুরু করলেই তার আশপাশে আমরা সবাই একত্রিত হয়ে গানটি গাইতাম এবং যেকোনো বিষয়েই যেকোনো দিক থেকে আমরা এভাবেই ঐক্যবদ্ধ থেকে যা ভাবার ভাবতাম।
তাই গত বুধবার যখন একসঙ্গে আড়াই লাখ মানুষ ‘সোনার বাংলা’ গাইলো, তখন স্বাভাবিকভাবেই আমার হৃদয় ভরে উঠেছিল, আর আমার সঙ্গে সঙ্গে আরো লাখো-কোটি মানুষের হৃদয় ভরে উঠেছিল আনন্দোচ্ছ্বাস আর গৌরবে।
অবশ্য, (এখান থেকেই একজন মুক্তিযোদ্ধার পরিবর্তে একজন সাংবাদিক হিসেবে কথা বলতে শুরু করছি আমি, এবং আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে কথা বলছি), এই পুরো ঘটনাটির সবচেয়ে দুঃখজনক অংশ হলো- এই ঘটনাটি ঘটানো হয়েছে শুধুই বিশ্ব রেকর্ড হিসেবে গিনেস বুকে বাংলাদেশের নাম ওঠানোর জন্য, আর তা জনসম্মুখে অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে ঘোষণাও করা হয়েছে।
একটু ভাবুন তো, আক্ষরিক অর্থেই একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের সরকারসহ পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র তো বটেই, এমনকি সামরিক বাহিনীও পুরোপুরি থেমে গিয়েছিল শুধু ক্ষণিকের একটি রেকর্ডের জন্য। একটি বইতে যেন আমরা কয়েকটি লাইন ওঠাতে পারি সেজন্য। অথচ বিশ্বের যেকোনো দেশ একই উদ্দেশ্যে তার নিজস্ব জনবল ব্যবহার করে পরমুহূর্তেই আমাদের রেকর্ড ভেঙে দিয়ে সেই বইটি থেকে আমাদের নাম মুছে ফেলতে পারে, ঠিক যেমনটা হয়েছিল যখন আমরা সবচেয়ে বড় মানবপতাকা তৈরির রেকর্ড করেছিলাম। ভারতের বেসরকারি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান সাহারা গ্রুপের আয়োজনে ভারতীয় জাতীয় সঙ্গীতের এমনই একটি অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে গত বছরের মে মাসে লখনৌ-তে একত্রিত হয়েছিলেন এক লাখ ২১ হাজার ৬৩৫ জন ব্যক্তি।
এই ক্ষুদ্র বিষয়টিকে পেছনে ফেলে কী আরো বড় কোনো জাতীয় উদ্দেশ্যে থাকতে পারে না, যেখানে সরকার-বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীসহ আমাদের পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করবে? যেমন- বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সড়ক দুর্ঘটনা আমাদের দেশে ঘটে বলে যে কুখ্যাতি আছে তা মুছে ফেলার সম্মান অর্জন করতে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ; আমাদের নদী ও বন বাঁচানো; দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই-এসব কারণে কি হঠাৎ করে সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে যেতে পারেন না?
সরকারসংশ্লিষ্ট লক্ষাধিক ব্যক্তি, যাদের বেতন বাবদ সরকারের নিয়মিত খরচ আছে কয়েক কোটি টাকা, তারা এই বিশ্বরেকর্ডের পেছনে সময় ও শ্রম দিয়েছেন যার আর্থিক মূল্য দাঁড়াবে আরো কয়েক কোটি টাকা। এছাড়াও এই রেকর্ডসংশ্লিষ্ট আরো বিভিন্ন খাতে খরচ হয়েছে আরো অনেক কোটি টাকা। সব মিলিয়ে এই রেকর্ড গড়ার পেছনে খরচ হয়েছে একশ’ কোটি টাকারও বেশি।
এই খরচের যোগান পেতে যেভাবে যে প্রক্রিয়ায় বেসরকারি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে চাঁদা তোলা হয়েছে, তাতে এই সরকারকে সর্বগ্রাসী মানসিকতার সরকারেরই একটি ছোট্ট রূপ বলা যেতে পারে। গত ৯ মার্চ অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন যে সরকার একশ’ কোটি টাকা সংগ্রহ করবে- ৫০ কোটি টাকা টি-২০ বিশ্বকাপের জন্য এবং বাকিটা ‘লাখো কণ্ঠে সোনার বাংলা’র জন্য। এই ‘চাঁদা’ তোলাকে খুবই সাধারণ বিষয় হিসেবে আখ্যায়িত করে মন্ত্রী বলেছিলেন, “সরকারের জন্য আমি অনেক চাঁদা তুলি।”
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পৃথক পৃথকভাবে কত টাকা করে দেবে তার একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছিল। তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঘোষণা করে একটি বার্তা দেয়া হয়েছিল যে প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং এই কাজের সঙ্গে জড়িত আছেন এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে ন্যূনতম এক কোটি টাকা চাঁদা দিতে হবে। সরকারের এই কাজে সহযোগিতা না করলে এর ফলাফল হিসেবে আশাতীত পরিণতির একটি ‘অঘোষিত’ বার্তাও মূল বার্তার সঙ্গে দেয়া হয়েছিল।
ন্যূনতম আর্থিক পরিকল্পনা ও নীতি অনুসরণ করে এমন কোনো প্রতিষ্ঠানেরই কোটি টাকার কোনো প্রকাশ্য তহবিল থাকে না। কাজেই একথা বলাই বাহুল্য যে অর্থমন্ত্রী যে ‘চাঁদা’ তুলেছেন, তার টাকা এসেছে সিএসআর তহবিল থেকে। এর ফলে এই ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো সামাজিক দায়িত্ব পালনের জন্য যে কাজগুলো করতো তা থেকে বঞ্চিত হবেন এদেশের হতদরিদ্র মানুষগুলো।
‘লাখো কণ্ঠে সোনার বাংলা’র জন্য বিভিন্ন বিদ্যালয়ে কঠোর নির্দেশনা পাঠানো হয়েছিল এই বলে যে- বিদ্যালয়গুলো যেন নিজ নিজ শিক্ষার্থীদের সকাল সাড়ে ৬টার দিকে বাসে তুলে নিয়ে ৭টার মধ্যে অনুষ্ঠানকেন্দ্রে পৌঁছে দেয়। অনুষ্ঠানটি শুরু হওয়ার কথা ছিল বেলা ১১টা ২০ মিনিটে।
ছুটির দিনেও সাতসকালে সন্তানদের ঘুম থেকে ওঠানো, ঘণ্টা পেরিয়ে বাসের জন্য তাদের ধৈর্য ধরিয়ে অপেক্ষা করানো, কোথা থেকে শিশুগুলো বাসে উঠবে তা নিয়ে দ্বিধা-সব মিলিয়ে বাবা-মায়েরা পার করেছেন একটি ভয়াবহ সময়। এমনকি অনুষ্ঠান কখন শেষ হবে তা না জানা থাকায় কতক্ষণ সন্তানদের সঙ্গে যোগাযোগ হবে না তাও জানতেন না বাবা-মায়েরা। ফলে স্বাভাবিকভাবেই সন্তানরা কখন ফিরবে তা নিয়েও ছিল না কোনো নিশ্চয়তা এবং সময়সূচি না জেনেই সন্তানদের জন্য অভিভাবকদের অপেক্ষা করতে হয়েছে দীর্ঘক্ষণ। তার ওপর ছিল অপর্যাপ্ত পানি ও খাবার এবং অসুস্থ শিক্ষার্থীদের জন্য ছিল না কোনো পৃথক ব্যবস্থা। সব মিলিয়ে দিনটিকে নিয়ে ভয়াবহ সব অভিজ্ঞতা তাই অনায়াসেই জানা যাবে অভিভাবকদের কাছ থেকে।
আমাদের সমাজব্যবস্থায় এই চিত্র অবশ্য খুব একটা আলাদা কিছু নয়। এখানকার বিদ্যালয়গুলো এবং তাদের শিক্ষার্থীরা যত বেশি দরিদ্র হয়, ততই তাদের উপর বেশি বেশি দুঃসাধ্য কাজগুলো চাপিয়ে দেয়া হয়। কাজগুলো করিয়ে নেয়ার বিষয়ে ততটাই কঠোরপন্থা অবলম্বন করা হয়। আর বেশ কিছু ক্ষেত্রে যখন দেখা যায় যে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক-অধ্যক্ষরা উচ্চ পর্যায়ের অনুগ্রহভাজন হতে কিংবা ঘনিষ্ঠ হতে চান, তখন এই শিক্ষার্থীদের ওপর দিয়ে যে কী বয়ে যায় তা বলাই বাহুল্য।
অত্যন্ত সাদামাটাভাবে আমরা যদি বলি, পুরো আয়োজনটি সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় অংশগ্রহণকারী মানুষের ওপর ছেড়ে দেয়া যেতে পারতো তাহলে কী খুব ভুল বলা হবে? আমরা মনে করতে পারি, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গণজাগরণ মঞ্চের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে কোনো দৌড়-ঝাঁপ ও ন্যূনতম খরচ ছাড়াই এবং জনগণের স্বেচ্ছায় তাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে কিছুদিন আগেই সারা দেশে একসঙ্গে কত সুন্দরভাবে ‘মোমবাতি প্রজ্জ্বলন’ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছিল!
যত লাখ মানুষই জাতীয় সঙ্গীতটি গেয়ে থাকুন না কেন, এর মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ একটি জাতি গঠনের জন্য এই কর্মসূচিটি কতটা কাজে দিয়েছে সেটাই প্রশ্ন। নিজেদের আত্ম-প্রশংসার জন্য বরাবরই আমরা অনেক আড়ম্বরপূর্ণ ও জাঁকজমক ঘটনাই ঘটাই এবং এসব কাজের পেছনে আসলে মূল উদ্দেশ্য কী হওয়া উচিত সেটা নিয়েই দ্বিধায় থাকি।
ন্যূনতম আত্ম-সমালোচনা তো আমরা করিই না, বরং এত বেশি আত্ম-প্রশংসা করাতে ব্যস্ত থাকি যে নিজেদের নিয়ে ভাবার জন্য ন্যূনতম সময়টুকুও আমরা পাই না। এই সবকিছুই যতটা জাতিগঠনের পরিপন্থী, তার থেকেও এই বিষয়গুলো বেশি ক্ষতি করে গণতন্ত্রের।
ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার থেকে লেখাটি অনুবাদ করেছেন: নুজহাত কামাল।
মাহফুজ আনাম: সম্পাদক, দ্য ডেইলি স্টার।
মঙ্গলবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৩
কাদের মোল্লার মামলা : সাক্ষী নিয়ে রাষ্ট্রপক্ষের ভয়াবহ জালিয়াতির অভিযোগ
অন্য এক মহিলাকে মোমেনা বেগম সাজিয়ে রাষ্ট্রপক্ষ হাজির করে ট্রাইব্যুনালে
* আসল মোমেনার ছবি পাওয়া গেছে মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরে
আব্দুল কাদের মোল্লার মামলায় সাক্ষী নিয়ে চরম জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ। হযরত আলী পরিবার হত্যাকাণ্ডে আব্দুল কাদের মোল্লাকে আপিল বিভাগ সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দেয়। এ ঘটনায় রাষ্ট্রপক্ষ একমাত্র সাক্ষী হিসেবে ট্রাইব্যুনালে হাজির করে হযরত আলী লস্করের একমাত্র বেঁচে যাওয়া মেয়ে মোমেনা বেগমকে। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাষ্ট্রপক্ষ ট্রাইব্যুনালে মোমেনা বেগম নামে যাকে হাজির করেছে এবং সাক্ষ্য গ্রহণ করিয়েছে সে হযরত আলী লস্করের মেয়ে আসল মোমেনা বেগম নয়। অপর এক মহিলাকে হযরত আলী লস্করের মেয়ে মোমেনা বেগম সাজিয়ে ট্রাইব্যুনালে সাক্ষী বানিয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ চাঞ্চল্যকর এ জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে।
হযরত আলী লস্করের মেয়ে আসল মোমেনা বেগমের ছবি সংরিক্ষত রয়েছে মিরপুর জল্লাদখানা যাদুঘরে। এ ছবির সন্ধান পাওয়ার পরই জালিয়াতির এ ঘটনা উঘাটিত হয়েছে। ট্রাইব্যুনালে মোমেনা বেগম নামে যাকে হাজির করা হয়েছিল তার সাথে কোনই মিল নেই মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরে রক্ষিত হযরত আলী লস্করের মেয়ে আসল মোমেনা বেগমের। আসামী পক্ষের আইনজীবীদেরকে মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরে রক্ষিত মোমেনা বেগমের ছবি দেখানো হলে তারা বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, তারা কোর্টে সাক্ষী হিসেবে যে মোমেনা বেগমকে দেখেছেন তার সাথে কোনো মিল নেই মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরে রক্ষিত মোমেনা বেগমের ছবির। ট্রাইব্যুনালে সাক্ষী হিসেবে হাজিরকৃত মোমেনা বেগম এবং মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরে রক্ষিত ছবির মোমেনা বেগম সম্পূর্ণ আলাদা দুজন মহিলা।
গত ৫ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লাকে দুটি অভিযোগে যাবজ্জীবন কারাদ- প্রদান করা হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ যাবজ্জীবন সাজা প্রদান করা দুটি অভিযোগের মধ্যে একটি অভিযোগ হলো মিরপুরে কালাপানি লেনে হযরত আলী, তার ছেলে, মেয়ে, স্ত্রীকে হত্যা ও মেয়েদের ধর্ষণের ঘটনা। দেশের সর্বোচ্চ আদালত বা বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের আপিল বিভাগ হযরত আলী পরিবারের হত্যা ঘটনায় আব্দুল কাদের মোল্লার যাবজ্জীবন সাজা বাড়িয়ে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে গত ১৭ সেপ্টেম্বর।
হযরত আলী পরিবার হত্যা ঘটনায় বেঁচে যায় হযরতী আলী লস্করের বড় মেয়ে মোমেনা বেগম। রাষ্ট্রপক্ষ এ ঘটনায় একমাত্র সাক্ষী হিসেবে মোমেনা বেগমকে হাজির করে ১৭ জুলাই ২০১২। ওইদিনই তার জবানবন্দী এবং জেরা সম্পন্ন হয়।
ক্যামেরা ট্রায়ালের মাধ্যমে অর্থাৎ রুদ্ধদ্বার বিচার কক্ষে মোমেনা বেগমের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। মোমেনা বেগমকে লম্বা নেকাবসহ কালো বোরখা পড়িয়ে ট্রাইব্যুনালে হাজির করে রাষ্ট্রপক্ষ। আসামী পক্ষের আইনজীবী জেরার সময় চ্যালেঞ্জ করেছিলেন এই মোমেনা আসল মোমেনা বেগম নয়। কিন্তু তখন তারা এর পক্ষে কোন ডকুমেন্ট হাজির করতে পারেনি।
রুদ্ধদ্বার বিচার কক্ষে মোমেনা বেগমের সাক্ষ্য গ্রহণের সময় ট্রাইব্যুনালে শুধুমাত্র রাষ্ট্রপক্ষের এবং আসামী পক্ষের আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন। বিচারক, কোর্ট রুমে উপস্থিত অন্যান্য স্টাফ এবং আইনজীবীরা সাক্ষী মোমেনা বেগমের চেহারা দেখেছেন। অন্য কারোর সামনে রাষ্ট্রপক্ষ তার চেহারা উন্মুক্ত করেনি তখন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরে রক্ষিত মোমেনা বেগমের ছবি সংগ্রহ করে কয়েকদিন আগে আসামী পক্ষের যেসব আইনজীবী ট্রাইব্যুনালে ওই সময় উপস্থিত ছিলেন তাদের দেখানো হলে তারা নিশ্চিত করেছেন ট্রাইব্যুনালে মোমেনা বেগম সাজিয়ে যাকে হাজির করা হয়েছে সে প্রকৃতপক্ষে আসল মোমেনা বেগম নয়। রুদ্ধদ্বার বিচার কক্ষে মোমেনা বেগমের সাক্ষ্য গ্রহণের সময় আসামী পক্ষের তিনজন আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন। এরা হলেন, কফিলউদ্দিন চৌধুরী, একরামুল হক এবং সাজ্জাদ আলী চৌধুরী। তারা সবাই বলেছেন ট্রাইব্যুনালে তারা যে মোমেনা বেগমকে দেখেছেন সে মোমেনা বেগমের সাথে মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরে রক্ষিত মোমেনা বেগমের কোন মিল নেই।
সাক্ষী মোমেনা বেগমের জবানবন্দী এবং মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরে রক্ষিত ডকুমেন্টে সম্পূর্ণ বিপরীত তথ্য :
ট্রাইব্যুনালে সাক্ষী হিসেবে হাজির করা মোমেনা বেগমের জবানবন্দী এবং মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরে রক্ষিত মোমেনা বেগমের জবানবন্দীর মধ্যে সম্পূর্ণ বিপরীত ধর্মী তথ্য রয়েছে।
যেমন ট্রাইব্যুনালে সাক্ষী মোমেনা বেগম তার জবানবন্দীতে বলেছেন, তাদের পরিবারের সদস্যদের হত্যার সময় তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। খাটের নিচে লুকিয়ে থেকে পরিবারের সদস্যদের হত্যা এবং তার বোনকে ধর্ষণের ঘটনা দেখেছেন। এক পর্যায়ে তিনি নিজেও ধর্ষণের শিকার হন এবং পরে অচেতন হয়ে পড়েন। অপরদিকে মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরে মোমেনা বেগম নামে যার জবানবন্দী রক্ষিত রয়েছে তাতে দেখা যায় মোমেনা বেগম ঘটনার দুই দিন আগে তার শশুর বাড়িতে চলে যান। ফলে তিনি প্রাণে বেঁচে যান এ ঘটনা থেকে। মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরের প্রতিবেদনে দেখা যায়, মোমেনা বেগম তাদের পরিবারের হত্যার জন্য বিহারীদের দায়ী করেছেন। সেখানে কাদের মোল্লার কোন নাম গন্ধই নেই। কিন্তু ট্রাইব্যুনালে মোমেনা বেগম নামে যাকে হাজির করা হয়েছে সে তার জবানবন্দীতে বলছে কাদের মোল্লার উপস্থিতিতে এবং নেতৃত্বে এ হত্যাকান্ড হয়েছে। সম্পূর্ণ উল্টো এ তথ্য থেকেও এটি প্রমাণিত যে, ট্রাইব্যুনালে হাজির করা মোমেনা বেগম এবং মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরে যে মোমেনা বেগমের ছবি রয়েছে তারা দুজন আলাদা মহিলা। রাষ্ট্রপক্ষ অপর এক মহিলাকে মোমেনা বেগম সাজিয়ে ট্রাইব্যুনালে হাজির করিয়েছে এবং তাকে দিয়ে সম্পূর্ণ সাজানো মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়ে আসামীকে ফাঁসানো হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরে রক্ষিত মোমেনা বেগমের কথা : মিরপুর ১০ নম্বরে অবস্থিত পাম্প হাউজে এনে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বিহারীরা বাঙ্গালীদের হত্যা করত। হত্যার পর তাদের লাশ ফেলে দিত পানির ট্যাংকি এবং পার্শবর্তী ডোবায়। ১৯৯০ দশকে এখানকার বধ্যভূমিটি আবিষ্কার হয় এবং অসংখ্য শহীদদের কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়। এরপর পাম্প হাউজটিকে জল্লাদখানা যাদুঘর করা হয় এবং এটি বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরের অংশ। জল্লাদখানায় ১৯৭১ সালে যাদের হত্যা করা হয়েছে যাদুঘর কর্তৃপক্ষ তাদের পরিবারের অনেক আত্মীয় স্বজনকে খুঁজে বের করে বিভিন্ন সময়ে তাদের সাক্ষাতকার, বক্তব্য রেকর্ড করে তা যাদুঘরে সংরক্ষণ করে মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর কর্তৃপক্ষ। শহীদ পরিবারের আত্মীয় স্বজনদের সাক্ষাতকার, লিখিত বক্তব্যের মূল কপি, অডিও ভিডিও বক্তব্য সংরক্ষিত আছে মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর কর্তৃপক্ষের কাছে। এছাড়া লিখিত বক্তব্যের ডুপ্লিকেট কপি সংরক্ষিত আছে মিরপুর জল্লাদখানা যাদুঘরে।
যে হযরত আলী লস্করের পরিবার হত্যা ঘটনায় আব্দুল কাদের মোল্লাকে ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক যাবজ্জীবন কারাদ- এবং আপিল বিভাগে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়েছে সেই ঘটনার একটি বিবরণ রক্ষিত আছে মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরের কাছে। হযরত আলীর বেঁচে যাওয়া একমাত্র মেয়ে মোমেনা বেগমের বরাত দিয়েই সে ঘটনার বর্ননা লিপিবদ্ধ করে প্রতিবেদন আকারে সংরক্ষণ করা হয়েছে। এখানে হযরত আলী পরিবার হত্যার ঘটনার বিবরণ রয়েছে। মোমেনা বেগমের সাক্ষাতকার গ্রহণের মাধ্যমে এ ঘটনার বিবরণ তারা সংগ্রহ করে। মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরের কাছে রক্ষিত সে ডকুমেন্টে বা প্রতিবেদনে লেখা আছে ঘটনার দুই দিন আগে মোমেনা বেগম তার শশুর বাড়ি চলে যান। ঘটনার সময় তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন না। ফলে একমাত্র তিনিই বেঁচে যান গোটা পরিবারের এ হত্যাকান্ড থেকে। মোমেনা বেগমের জবানবন্দীর সাথে তার একটি ছবিও সেখানে সংযুক্ত রয়েছে।
হযরত আলী হত্যাকাণ্ড বিষয়ে তার মেয়ে মোমেনা বেগমের সাক্ষাতকার যাদুঘর কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করে ২৮/৯/২০০৭ তারিখ। তিনি তখন তাদের কাছে ঘটনার যে বিবরণ দেন তার ভিত্তিতে মুক্তিযুদ্ধ যাদঘুর কর্তৃপক্ষ যে প্রতিবেদন তৈরি করে এবং এখনো ডকুমেন্ট আকারে সংরক্ষিত রয়েছে তা নিম্নরূপ :
“ঘটনার বিবরণ : ১৯৭১ সালে মিরপুরের কালাপানি এলাকায় বিহারিদের সঙ্গে কিছু বাঙালি পরিবারও বাস করতো। ৭ মার্চ এর পর থেকে দেশের অবস্থা আশঙ্কাজনক দেখে কিছু কিছু বাঙালি পরিবার এলাকা ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যায়। অনেকের অন্যত্র যাওয়ার অবস্থা ছিল না ফলে এলাকায় রয়ে গেলেন। যে কয়েকটি পরিবার অন্যত্র যেতে পারলেন না তাদের মধ্যে একটি হযরত আলী লস্কর-এর পরিবার।
হযরত আলী লস্কর ছিলেন একজন দর্জি/খলিফা। মিরপুরেই তার দোকান ছিল। সকালে যখন এলাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছিলেন তখন হযরত আলী লস্করকেও তারা চলে যেতে বলেছিলেন। কিন্তু তাঁর যাওয়ার জায়গা ছিল না। ২৫ মার্চ রাতে গণহত্যা শুরু হয়ে গেলে ২৬ মার্চ সকাল সাতটার দিকে বিহারিরা হযরত আলী লস্কর-এর বাড়ি ঘিরে ফেলে এবং তাকে ধরে নিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পরই তারা তাঁর স্ত্রী, দুই কন্যা ও শিশু পুত্রকে ধরে নিয়ে যায় এবং সকলকে এক সঙ্গে নির্মমভাবে হত্যা করে পাশের বাড়ির কুয়োতে সব লাশ ফেলে যায়। বিহারিরা তার দ্বিতীয় কন্যা আমেনা বেগমকে ঘরের ভেতর সারাদিন আটকে রেখে ধর্ষণ করে। পরে তাকেও হত্যা করে সেই কুয়োতে ফেলে। হযরত আলীর বড় মেয়ে মোমেনা বেগম মাত্র দুইদিন আগে শ্বশুরবাড়িতে চলে যাওয়ায় একমাত্র সেই প্রাণে বেঁচে যায়। এখানে উল্লেখ্য যে, হযরত আলীর স্ত্রী সে সময় অন্তঃসত্ত্বা ছিল।
কয়েকদিন পরই এ খবর হযরত আলীর বড় মেয়ে মোমেনা বেগম জানতে পারেন। কিন্তু মিরপুরের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে তিনি বাড়ি আসতে পারলেন না। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর নিজ বাড়িতে এসে তিনি আর কিছুই অবশিষ্ট পেলেন না। ভগ্নহৃদয়ে তিনি ফিরে গেলেন শ্বশুরবাড়িতে।”
ট্রাইব্যুনালে সাক্ষী হিসেবে হাজির করা মোমেনা বেগম যা বলেছেন : ক্যামেরা ট্রায়ালের মাধ্যমে (রুদ্ধদ্বার কক্ষে বিচার পরিচালনা) মোমেন বেগমের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয় ট্রাইব্যুনালে। ফলে সে সময় মোমেনা বেগমের সাক্ষ্য সংবাদ মাধ্যমে প্রচার বা প্রকাশিত হয়নি। তবে মোমেনা বেগম কোর্টে যে জবানবন্দী দিয়েছেন তা আব্দুল কাদের মোল্লার রায়ে বর্ননা করা হয়েছে বিস্তারিতভাবে।
ট্রাইব্যুনালে মোমেনা বেগমের জবানবন্দীর উদ্ধৃতি দিয়ে রায়ে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ ঘটনা ঘটে। মোমেনা বেগমরা তখন মিরপুর ১২ নম্বর সেকশনের ৫ নং কালাপানি লেনে ২১ নম্বর বাসায় থাকতেন। মোমেনা বেগম কোর্টে সাক্ষ্য দিয়ে ঘটনার বিষয়ে বলেন, সন্ধ্যার সময় তার পিতা হযরত আলী হন্তদন্ত হয়ে ঘরে আসলেন এবং বললেন, কাদের মোল্লা তাকে মেরে ফেলবে। কাদের মোল্লা এবং তার বিহারী সাগরেদ আক্তার গুণ্ডা তার পিতাকে হত্যার জন্য ধাওয়া করছে। তার পিতা ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। এরপর তারা বাইরে বোমা ফাটাল। দরজা খোলার জন্য গালিগালাজ করল। তার মা দাও হাতে নিয়ে দরজা খুলল। তারা ঘরে ঢুকে গুলী করে হত্যা করল তার মাকে। কাদের মোল্লা তার পিতাকে কলার ধরে টেনে বাইরে নিয়ে গেল। তার সঙ্গীরা তার বোন খাদিজা এবং তাসলিমাকে জবাই করল। দুই বছরের ভাইকে আছড়িয়ে হত্যা করে।
মোমেনা জানায়, সে এবং তার ১১ বছর বয়স্ক অপর বোন আমেনা খাটের নিচে আশ্রয় নেয় ঘটনার সময়। আমেনা ভয়ে চিৎকার দেয়ায় তাকে খাটের নিচ থেকে টেনে বের করে জামাকাপড় ছিড়ে ফেলে এবং এক পর্যায়ে তার কান্না থেমে যায়। এক পর্যায়ে তাকেও টেনে বের করে এবং ধারাল অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে। এক পর্যায়ে সে জ্ঞান হারায় এবং জ্ঞান ফিরে পেটে প্রচন্ড ব্যথা অনুভব করে। তার পরনের প্যাণ্ট ছিন্নভিন্ন অবস্থায় পান তিনি। পরে এক ঘরে গিয়ে আশ্রয় নেন এবং তাদের সেবার মাধ্যমে কিছুটা সুস্থ হন। পরে তার শশুর খবর পেয়ে তাকে এসে নিয়ে যান।
রায়ে মোমেনা বেগমের বরাদ দিয়ে তাদের পরিবারের যে ঘটনার বর্ণনা করা হয়েছে তার সংক্ষিপ্ত চিত্র এটি।
রায়ে আরো বলা হয়েছে, এ ঘটনায় একজনমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী জীবিত সাক্ষী এবং ক্ষতিগ্রস্ত হলেন মোমেনা বেগম। তার এভিডেন্সকে পাশ কাটানো যায়না বা সন্দেহ পোষণ করা যায়না।
রায়ে আসামী পক্ষের দাবি উল্লেখ করে বলা হয়েছে, আসামী পক্ষ দাবি করেছে মোমেনা বেগম হযরত আলী লস্করের মেয়ে নন। তিনি যে হযরত আলী লস্করের মেয়ে সে মর্মে রাষ্ট্রপক্ষ কোন ডকুমেন্ট হাজির করেনি।
আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে মোট ছয়টি অভিযোগে চার্জ গঠন করা হয় এবং এর মধ্যে পাঁচটি অভিযোগে কারাদণ্ড প্রদান করা হয় আব্দুল কাদের মোল্লাকে। হযরত আলী হত্যা ঘটনাটি ছিল ছয় নম্বর অভিযোগ এবং এ অভিযোগসহ আরো একটি অভিযোগে যাবজ্জীবন প্রদান করা হয়। হযরত আলী আওয়ামী লীগ করার কারণে এবং স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেয়ার কারণে আব্দুল কাদের মোল্লা বিহারী এবং আর্মিদের সাথে নিয়ে তাকেসহ পরিবারের লোকজনকে হত্যা করে মর্মে অভিযোগ করা হয় রাষ্ট্রপক্ষ থেকে।
রাষ্ট্রপক্ষ ট্রাইব্যুনালে আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মোট ছয়টি অভিযোগ এনেছিল। ছয়টি অভিযোগের মধ্যে ট্রাইব্যুনাল আব্দুল কাদের মোল্লাকে দুইটি অভিযোগে যাবজ্জীবন, তিনটি অভিযোগে ১৫ বছর করে কারাদ- দেয়। একটি অভিযোগ থেকে খালাস দেয়।
আপিল বিভাগের রায়ে একটি যাবজ্জীবন সাজা বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। এ অভিযোগটি হলো মিরপুরে কালাপানি লেনে হযরত আলী, তার ছেলে, মেয়ে, স্ত্রীকে হত্যা ও মেয়েদের ধর্ষণের ঘটনা। এটি ছিল আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আনীত ছয় নং অভিযোগ।
এছাড়া ট্রাইব্যুনালের অপর চারটি অভিযোগে প্রদত্ত সাজা বহাল রাখা হয় আপিল বিভাগের রায়ে। অপরদিকে একটি অভিযোগ থেকে ট্রাইব্যুনাল আব্দুল কাদের মোল্লাকে খালাস দিলেও আপিল বিভাগ ওই অভিযোগে যাবজ্জীবন সাজা দেন। অর্থাৎ ছয়টি অভিযোগেই আপিল বিভাগ সাজা দেয় আব্দুল কাদের মোল্লাকে।
বৃহস্পতিবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০১৩
BDR হত্যাকান্ডের গোপন অধ্যায়গুলো
আমি এখন যেই লেখাটা আপনাদের দিতে যাচ্ছি তা আমি এর মধ্যেই পৃথিবীর অনেক দেশের বাংলা সংবাদ মাধ্যম ও ইংরেজী সংবাদ মাধ্যমে পাঠিয়ে দিয়েছি। আমার লেখাটি অনেকেই বিশ্বাস করবেন আবার অনেকেই বিশ্বাস করবেন না। এই দুইটি সম্ভাবনার ফলাফল আমার ঘাড়েই বর্তায়। তারপরেও সে কথা বিবেচনায় রেখে আমি আমার গত দুই বছরের তদন্ত আপনাদের সামনে তুলে ধরছি। পিল খানায় বিডি আর হত্যাকান্ড যারা কেবল একটি বিদ্রোহ ও হত্যার মধ্যে দেখেন, আমি সেই চিন্তাধারী নই। দীর্ঘ অনেক বছর বাংলাদেশ আর্মিতে আমার চাকুরীর সুবাদে আমার অনেক বন্ধু এখানে আছে, আছে শুভাকাংখী। আমি এমন সব সূত্র থেকে এসব খবর আজ আপনাদের দিতে যাচ্ছি যেসব সূত্র আমি আপনাদেরকে বলতে পারব না। এই একটা বড় দূর্বলতা আমার লেখাতে থেকেই যাবে। আমি তার জন্য ক্ষমাপ্রার্থী।
যাদের থেকে আমি গত দুই বছরে সংবাদ সংগ্রহ করেছি তাদের সবাই সেই সংবাদ দেয়ার ক্ষেত্রে ছিলেন যোগ্য ও যোগ্যতর। যাদের মধ্যে আছেন সরকারের উচ্চপদস্থ সামরিক অফিসার, গোয়েন্দা অফিসার, রাজনীতিবিদ, রাজনীতি বিশ্লেষক। আমি আমার পরিচয় দিতেও আপনাদের কাছে অপারগ। আমার পারিবারিক জীবন ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনা করার ফলেই সেই অপারগতা। সে জন্যও আমি ক্ষমা প্রার্থী।
বি ডি আর হত্যাকান্ডে যাদের যাদের সম্পৃক্ততা আছে তাদের যাদের নামই তদন্তে এসেছে আমি কারো নামই লুকাইনি। আওয়ামীলীগের মির্জা আজম, নানক, তাপস রা এই ঘটনার মূল টুলস হিসেবে ব্যাবহার হয়েছে। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা “র” এর পৃষ্ঠ পোষকতা এর সবচাইতে বড় অংশ।
নাগরিক ব্লগে এই লেখা প্রকাশের কারন একটি। তা হোলো রেফারেন্সের মাধ্যমে। আমার আরেক শুভাকাঙ্খীর মাধ্যমে আমি জানতে পারি বাংলা অন লাইন ব্লগের ভেতর রাজনৈতিক আলোচনার ব্লগ হিসেবে নাগরিক ব্লগ এখন পরিচিত। তাই এখানে এই লেখাট প্রকাশের ইচ্ছা প্রকাশ করেছি। আআমার এই তদন্ত রিপোর্টের কলেবর অনেক বৃহৎ। তাই কিছু খন্ডে এই রিপোর্টটি সমাপ্ত হবে বলে আশা করছি। আমার এই লেখা যদি আপনাদের ব্লগের প্রতি কোনো হুমকি বা সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় তবে লেখাটি আপনারা মুছে দিতে পারেন। উল্লখ্য যে, পিলখানা হত্যাকান্ডের পর পরি আর্মির গোয়েন্দা বিভাগের মাধ্যমে একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয় যা আলোর মুখ দেখতে পারে নাই। সরকারের উচ্চপদস্থ মন্ত্রী, এম্পিদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অনুমতি দেয় নি এবং চাকুরী হারিয়েছে শতাধিক সেনা অফিসার। রহস্য জনক বিমান দূর্ঘটনায় মারা গিয়েছে অনেক অফিসার। আজ আমি সেই কথাই বলতে এসেছি।
বিশ্বাস এবং অবিশ্বাসের ভারটুকু আপনাদের হাতে। আমি শুধু মনে করি, এই সত্য সবাই জানতে পারুক। আমি আমার দায়িত্ব পালন করছি। একজন প্রাক্তন সেনা অফিসার হিসেবে আমি আমার দায় থেকে মুক্ত হতে চাই।
___________________________________________
বি ডি আর হত্যাকান্ডের সেই গোপনীয় অধ্যায়গুলো-১ম খন্ড
নভেম্বর ২০০৮, অর্থাৎ সাধারণ নির্বাচন তথা শেখ হাসিনার ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র দু’ মাসের মাথায় পিলখানা বিদ্রোহ ও হত্যাযজ্ঞের প্রচারণা শুরু হয়েছিল। বিস্ময়কর হলেও সত্যি যে, তাঁর ও পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের সম্মতি ও সহায়তায় তা সংঘটিত হয়েছিল। স্মরণ করা যেতে পারে, শেখ হাসিনার নির্বাচিত সরকার সাবেক আমলা ও বিশ্বব্যাঙ্ক কর্মকর্তা ফখরুদ্দীন আহমেদের যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের স্থলাভিষিক্ত হয়েছিল, ভারত, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্থটনীতিকদের সহায়তায় কমিশনে তার শপথ ও সংবিধান লঙ্ঘন করে তাকে ক্ষমতায় বসিয়েছিলেন সেনাবহিনী প্রধান জেনারেল মইন ইউ. আহমদ। শেখ হাসিনার দুর্বার রাজনৈতিক আন্দোলন তথা তাঁর সম্মতিতেই তা হয়েছিল। শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে তার হাসো্যাজ্জ্বল উপস্থিতিতে তিনি যাকে প্রকাশ্যে তার রাজনৈতিক প্রাপ্তি বলে আখ্যায়িত করেছেন।
অন্যদিকে জেনারেল মইন ও তার কতিপয় বিদেশী প্ররোচণাকারী এই বলে তাদের কর্মকান্ডের ফিরিস্তি দিতে থাকেন যে, একটি গৃহযুদ্ধ থেকে বাংলাদেশকে রক্ষার জন্য তারা বদ্ধপরিকর ছিল। এর সবই ছিল পাগলামি। নিজেদের জাতীয় স্বার্থেই এ সকল ক্থটনীতিক বাংলাদেশে একটি দুর্বল পরাশ্রয়ী সরকার চেয়েছিল এবং তার মোক্ষম হাতিয়ার হিসাবে শেখ হাসিনার দুর্বার আন্দোলনকে ব্যবহার করেছিল। চূড়ান্ত পুরস্কারের প্রতিজ্ঞা করে তারা মইনের সেবা লাভ করেছিল যে সে নিজেই গণতান্ত্রিকভাবে অভিনন্দিত হতে পারবেন যার মানে হচ্ছে:
(১) শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া উভয়কে ধ্বংস করে ফেলা
(২) তাদের ঘনিষ্ঠ সমর্থকদেরকে বাগে আনা অথবা তাড়িয়ে দেয়া; এবং
(৩) নূতন কোন দল গঠনের দ্বারা তার উধর্্বারোহণের পথ তৈরি করা
রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে বহুল প্রচারিত দুর্নীতি দমন আন্দোলন দ্বারা এর পথ সুগম করা হয়েছিল। তবে এর কোনটি অর্জনেই তিনি সফল হতে পারেননি। ইতোমধ্যে যেহেতু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আয়ুষ্কাল ২০০৮ এর অধিক প্রলম্বিত করা নিয়ে নানা মহলে ক্ষোভের বিসতৃতি ঝুকিঁবহূল হয়ে উঠেছিল, শেখ হাসিনা অথবা খালেদা জিয়াকে বেছে নেয়া ছাড়া অন্য কোন বিকল্প বাদেই বিদেশী শক্তিকে তা ত্যাগ করতে হয়েছিল। ভারতের চাপে অবশ্য তারা নমনীয় শেখ হাসিনার প্রতি ঝুঁকেছিল। এটি অবশ্য মইনের জন্যও একটি পরিত্রাণ ছিল কারণ খালেদা জিয়ার প্রতি তার অনেক ভীতির কারণ ছিল, যিনি তাকে সেনাবহিনী প্রধান করেছিলেন এবং যার দু’ছেলে তার লোকজনের দ্বারা শারীরিকভাবে নিগৃহীত হয়েছিল। এভাবে প্রকৃত নির্বাচনের দ্বারা সাধারণ নির্বাচনকে আড়াল করা হয়েছিল।
এই প্রেক্ষাপটে পিলখানা বিদ্রোহের প্রস্তুতি ভারতীয় র’ এবং ইসরায়েলী মোস্যাদের আওতায় নিয়ে আসা হয়, যাতে মার্কিন সিআইএ’র সংশ্লিষ্টতা পর্যন্ত ছিল। নভেম্বর ২০০৮ এ সজীব ওয়াজেদ জয় ও জনৈক কার্ল সিভাকোর নামে যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে জয় ও তার মাকে পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞ নিয়ে এগিয়ে যাবার প্রস্তুতির ইঙ্গিতের কথা বলা হয়। হাজার হাজার ইসলামী মৌলবাদী জঙ্গী নিয়োগের জন্য ঐ নিবন্ধে জয় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীসহ অন্যান্য সামরিক ও আধা- সামরিক বাহিনীকে অভিযুক্ত করেন। সাধারণ নির্বাচনের প্রচারণার মধ্যভাগে প্রতিশ্রুতিশীল একজন প্রধানমন্ত্রীর ছেলের এ জাতীয় রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতা বহির্বিশ্বে দলটির নির্বাচনী ভাবমূর্তি ও তার নেতাদের ক্ষমতালাভের আশাকে ক্ষুণ্ন করেছিল। তবে বাংলাদেশে তা হয়নি, শেখ হাসিনা ও তাঁর আওয়ামী লীগ বরাবরই ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ তাদের নেতৃত্বে হয়েছে বলে দাবী করে আসছেন এবং সে কারণে দেশ শাসনে তাঁর ও তাঁর দলের অধিকারকে তারা যৌক্তিক মনে করছেন। প্রকৃতপক্ষে তাঁদের দাবীর জোরালো সমর্থনে তাঁরা তাঁদের বিরোধীদের দেশদ্রোহী ও স্বাধীনতাবিরোধী বলে অভিযুক্ত করেছেন। তাছাড়া, যখনই যুক্তরাষ্ট্র তথাকথিত ইসলামী সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে এবং ভারত ও ইসরায়েল সেই ক্রুসেডে যোগ দিয়েছে তারা তা অনুধাবন করতে পেরে তার একনিষ্ঠ সমর্থক বনে যান।
জেএমবির কুশীলবদের তৎপরতা বাংলাদেশে ইসলামী সন্ত্রাসবাদের নামে ভিত্তিহীন আশঙ্কা ও ভীতির সঞ্চার করে। বস্তুতপক্ষে জয় তার নিবন্ধে এ বিষয়টি পরিষ্কার করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীসহ অন্যান্য সামরিক ও আধা- সামরিক বাহিনীকে ইসলামী সন্ত্রাসবাদমুক্ত করে পুনর্বিন্যাস করার প্রতি জোর দিয়েছিলেন যাতে করে তারা স্বাধীনতাবিরোধীদের নিকট থেকে জাতিকে উদ্ধারে আওয়ামী লীগের প্রচেষ্টায় কখনও বাধা সৃষ্টি করতে না পারে এবং একটি অসামপ্রদায়িক পরিবেশ তৈরি করা যায়। সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয়ে মইনের প্রতিশ্রুতির কারণে দেশের নিরাপত্তা বাহিনীকে ক্লীব বা জড় করতে শেখ হাসিনা ও তাঁর পুত্রের ইঙ্গিত প্রদানের পথ সুগম হয়েছিল। তার নিবন্ধে ইহুদী স্ত্রীর স্বামী জয় ভারত- ইসরায়েলী প্রকৃতিকে ব্যক্তিগত নিশ্চয়তা প্রদান করেছিলেন যে, অসামপ্রদায়িক বাংলাদেশে আগামী ২০ বছরে তিনি একজন হিন্দু প্রধানমন্ত্রী দেখতে চান। ক্ষমতার জন্য মরিয়া শেখ হাসিনার উদগ্র বাসনা এবং সেনাবাহিনীর প্রতি সর্বজনবিদিত ভীতি ও অবিশ্বাসের বদৌলতে তার সমর্থন পাওয়া গিয়েছিল। তবে তার বাস্তবায়নে র\’ ও মোস্যাদ পরিকল্পনাকারীরা বাংলাদেশকে হেয় করতে সেনাবাহিনীকে ক্লীব বা জড় করতে চেয়েছিল । ১৯৯০ এর দশক থেকেই র\’ এ লক্ষ্যে কাজ করে আসছে। এ সময়কালে বাংলাদেশের বেশ কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা গোয়েন্দা কর্মকর্তা প্রকাশ্যে এ বিষয়ে মুখ খুলেছেন। মজার বিষয় হচ্ছে, সে সব সতর্কতায় কান না দিয়ে বর্তমান সেনা প্রধান ও তার কতিপয় লেফটেন্যান্ট আমাদের শত্রুদের সাথে এ ধ্বংসলীলায় মেতেছিলেন।
বাংলাদেশে জরুরি অবস্থার পর থেকে জেনারেল মইন ও তার লেফটেন্যান্টদের অসঙ্গত কর্মকান্ড সাধারণ মানুষের কাছে সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ন করেছে। শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় বসাতে সেনাবাহিনী প্রধান ও তার লেফটেন্যান্টদের তৎপরতা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের অজ্ঞতার সুযোগে বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে তার অনুসারীরা নূতনভাবে সেনাবাহিনীকে গড়ে তোলার প্রচারণা জোরদার করার সুযোগ পায়। ফেব্রুয়ারিতে অকস্মাৎ জেএমবি’র নেতারা কয়েক স্থানে ধরা পড়লে কিছু মিডিয়া ইসলামী জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে বিষোদগার শুরু করে যদিও তাদের লক্ষ্য ছিল সেনাবাহিনী। ভারতের সাথে দীর্ঘদিন ধরে সংশ্লিষ্ট লন্ডনভিত্তিক আওয়ামী লীগপন্থী কলামিস্ট আব্দুল গাফফার চৌধুরী পর্যন্ত বলেছেন, সেনাবাহিনীতে যদি ৩০ শতাংশ পর্যন্ত হিন্দু নিয়োগ করা যায়, তাহলে কোন সমস্যা থাকবে না। এ বক্তব্যের অনুসরণ করে সাবেক সিভিল সার্ভিস সদস্য তথা ক্থটনীতিক ওয়ালিউল ইসলাম, যার স্ত্রী আওয়ামী লীগের একজন প্রাক্তন এমপি, তার গবেষণায় পেয়েছেন বলে দাবী করেছেন যে, গত ৭ বছরে সেনাবাহিনীর সব ধরনের নিয়োগে এক তৃতীয়াংশ মাদ্রাসা শিক্ষিতদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে। যা প্রতিষ্ঠা করা এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য তা ছিল:
(১) ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সন্ত্রাসবাদের সূতিকাগার;
(২) সেনাবাহিনী হচ্ছে তার গডফাদার; এবং
(৩) বাংলাদেশকে সন্ত্রাসমুক্ত রাখতে হলে উভয়কে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
২৪ ফেব্রুয়ারি এ প্রচারণা তুঙ্গে উঠে যে, বিদ্রোহের একদিনমাত্র আগে মহিউদ্দীন খান আলমগীরের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যগণ সেনাবাহিনীর তীব্র নিন্দা করেন যে তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে । বিদ্রোহের সময় আমাদের একদল পন্ডিত একই ধরনের প্রচারণা চালাতে থাকে এবং তার অব্যবহিত পরেই বাণিজ্য মন্ত্রী লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অবঃ) ফারুক খান সজীব ওয়াজেদ জয়ের বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করেন।
বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়লে বিডিআরে দায়িত্ব গ্রহণের জন্য একজন নূতন ডিজি, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মইনুল ইসলাম অপেক্ষা করতে থাকেন। বিদ্রোহের পরপরই তার যোগদানের পরে তাকে মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি এবং বিদ্রোহের তদন্তে গঠিত সরকারি তদন্ত কমিশনের সদস্য নিয়োগ করা হয়। কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি প্রচার করতে থাকেন যে, তার নিরাপত্তা বহিনীকে নূতনভাবে নামকরণ করা হবে এবং নূতন পোশাক ও ব্যাজ বা প্রতীক দেয়া হবে। সেনাবাহিনী থেকে একে বিচ্ছিন্ন করা উচিৎ এবং সিএসসি নিযুক্ত একটি নূতন ক্যাডার কর্মকর্তাদের কমান্ডে তা পরিচালিত হবে। কমান্ডের ক্ষেত্রে সেনাবাহিনী থেকে পুনর্গঠিত সীমান্ত রক্ষী বাহিনীকে দূরে রাখার তার এ প্রস্তাব বিদ্রোহীদের অন্যতম দাবী ছিল; যাতে এক্ষেত্রে একটি নূতন যুক্তির অবতারণা করা হয়েছে; তদন্ত কমিশনের কাজ শুরুর পূর্বেই সরকার নিয়োজিত তদন্ত কমিশনের একজন সদস্য যা বলেছিল। অধিকন্তু, তত্ত্বাবধায়ক সরকার অনির্দিষ্ট কালের জন্য বার্ষিক বিডিআর সপ্তাহ উদযাপন স্থগিত করেছিল। নূতন সরকার আরেকবার তাতে উৎসাহ যুগিয়েছে যখন হবু ডিজির নিয়োগ চূড়ান্তপ্রায় হয়েছিল এবং সেনাকর্মকর্তাদের হত্যাযজ্ঞের মধ্য দিয়ে বিডিআর সপ্তাহ শেষ হয়েছিল। পরিষ্কারভাবেই বোঝা যাচ্ছে বিডিআর বিদ্রোহ কোন সাধারণ বিদ্রোহ ছিল না; নূতন ডিজির আগাম নিয়োগ বা তার দ্রুত প্রেসক্রিপশন প্রদান তার সাথে বেমানান ছিল।
পিলখানা হত্যাযজ্ঞের পরিকল্পনা ছিল দ্বিমুখী; এক নং পরিকল্পনা ছিল প্রকাশ্য; যাতে বিডিআর সপ্তাহ′ ২০০৯ উদযাপনকালে বিডিআর দরবার হলে জিম্মি পরিস্থিতির সৃষ্টি করা যায় । সে পরিকল্পনানুসারে বিক্ষুুব্ধ বিডিআর জওয়ানদের উপস্থিত সকল অফিসারকে ২৫ তারিখের জিম্মিদশায় রাখা এবং রেশন, বেতনভাতা, জাতিসংঘ কমিশন ইত্যাদিসহ কমান্ডিং অবস্থান থেকে সেনা কর্মকর্তাদের দূরে রাখার বিষয়ে তাদের ২২ দফা দাবী পেশ করার কথা ছিল । প্রধানমন্ত্রী তখন সেনাবাহিনী প্রধান মইন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন এবং এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবীর নানককে বিদ্রোহের নেতাদের সাথে আলাপ- আলোচনার জন্য পাঠাতেন যাতে জওয়ানদের দাবী- দাওয়ার সুরাহা হয়, তাদের মধ্যস্থতাকারীরা নেতা বনে যান।
এ পরিকল্পনার কিছুটা বর্তমান ডিজি মেজর জেনারেল শাকিল জানতেন তবে ঝুঁকি নেয়া ছাড়া তার কোন গত্যন্তর ছিল না। অন্যথায় ২০০৮ সালের শেষ দিকে ৬ কোটি টাকাসহ তাকে তার স্ত্রীর দেশত্যাগের ব্যর্থ প্রচেষ্টার ঘটনায় বিচারের মুখোমুখী হতে হত। জেনারেল মইনের স্ত্রী নাজনীন মইন তাকে এবং তার স্বামীর স্টাফ অফিসার মেজর মাহবুবকে উদ্ধার করেছিলেন। মাহবুবকে পরে কমিশন থেকে অবসর তথা দেশত্যাগে অনুমতি প্রদান করা হয় । সে অর্থে মইনের অবশ্যই ভাগ ছিল এবং স্বামীর ক্ষমতার অপব্যবহারে তার স্ত্রীর ভূমিকা, দুষকৃতিকারীর উদ্ধারে তার তৎপরতা তথা এ অন্যায়কে ধামাচাপা দেয়া তাকে ও তার স্ত্রীকে ফৌজদারি বিধানে দন্ডিত করার যেত। বিডিআর ডিজির অজ্ঞাত এ পরিকল্পনার কুশলী দিকটি ছিল যে, অবিলম্বে জওয়ানদের দাবী মানা না হলে ডিডিজি ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বারী ও তার পায়ে গুলি করা হবে।
জেনারেল মইন, মেজর জেনারেল মোল্লা ফজলে আকবর ( ডিজি, ডিজিএফআই), মেজর জেনারেল মনির ( ডিজি এনএসআই), লেফটেন্যান্ট জেনারেল সিনা ইবনে জামালী (সিজিএস), লেফটেন্যান্ট কর্নেল কামরুজ্জামান (কমিউনিকেশন ইন চার্জ বিডিআর), লেফটেন্যান্ট কর্নেল শামস্ (সিও ৪৪ রাইফেলস্), লেফটেন্যান্ট কর্নেল মুকিম এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল সালাম (প্যারা মিলিটারি শা্খা ডিজিএফআই) ১ নং পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতেন। পিলখানায় দায়িত্বরত অধিকাংশ বিডিআর জওয়ান এ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতেন। সেনা কর্মকর্তাদের প্রত্যাহার এবং অন্য ২১ দফা দাবীর বাস্তবায়নে একটি জিম্মি পরিস্থিতির সৃষ্টিতে তারা প্রস্তুত ছিলেন। সেনাকর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তাদের ক্ষোভ একটি কাগজে লিখে লেফটেন্যান্ট কর্নেল মুকিম ২৫ ফেব্রুয়ারি তারিখে তা সেনাপ্রধানের সচিবালয়, ডিজি, ডিজিএফআই অফিস, প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য সরকারি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে ফ্যাঙ্ করবেন তবে এ পরিকল্পনাটি প্রাথমিকভাবে ছিল একটি কৌশল।
মেজর জেনারেল শাকিল আগেই বুঝতে পেরেছিলেন যে ষড়যন্ত্র চলছে। লেফটেন্যান্ট কর্নেল আমীন ( সিও রাইফেলস্ সিকিউরিটি ইউনিট), যিনি পরে শহীদ হয়েছিলেন, ২১ তারিখ সকালে জওয়ানদের লিফলেট পেয়েছিলেন। তিনি দ্রুত তার কাছে ছুটে যান এবং লিফলেটটি দেখান। তিনি তাকে দ্রুত একটি কাউন্টার লিফলেট তৈরি করে তা বিলি করার পরামর্শ দেন। ২৩ তারিখে জানা যায় যে, অস্ত্রাগার থেকে তিনটি এসএমজি খোয়া গেছে। এ কথা্ জানাজানির পরে কর্মকর্তাদেরকে অস্ত্রাগারের দায়িত্ব দেয়া হয় যাতে বোঝা যায় পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক না হলে কখনও সতর্কতা অবলম্বন করা হত না। তখনও পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী ২৪ তারিখের পিলখানা পরিদর্শন করেননি ।
মানসম্মত ব্যবস্থা হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী যখন কোন সামারিক বা আধা- সামরিক বাহিনী পরিদর্শন করেন যেথায় ব্যবহৃত সকল অস্ত্রের ফায়ারিং পিন সরিয়ে ফেলা এসএসএফ নিশ্চিত করবে। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর গার্ড কমান্ডার হিসাবে দায়িত্বরত কর্মকর্তা এমন কোন অস্ত্র হাতে নিতে পারবেন না যা দিয়ে গুলি করা যায়। কেবলমাত্র পিজিআর এবং এসএসএফ কর্মকর্তাগণ সশস্ত্র অস্ত্র ব্যবহার করতে পারেন। প্রধানমন্ত্রীর পরিদর্শনে এরূপ নিরাপত্তা ব্যবস্থায় প্রশ্ন জাগা স্বা্ভাবিক যে কিভাবে প্রধানমন্ত্রী পিলখানা পরিদর্শন করেছিলেন? সেই লিফলেটগুলো কোত্থেকে এসেছিল এবং তিনটি এসএমজি কিভাবে খোয়া গিয়েছিল? ২৪ তারিখে প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা নিয়ে মেজর জেনারেল শাকিলের উদ্বিগ্ন হবার প্রয়োজন ছিল না; তিনি জানতেন যে, প্রধানমন্ত্রী তার নিজের বিষয়ে সতর্ক থাকবেন এবং ২৬ তারিখে তার নির্ধারিত ডিনার বাতিল করবেন। তা তিনি করতে পারবেন কারণ অপেক্ষমাণ নাটকের আদ্যোপান্ত তার জানা।
নেপথ্যের কুশীলবদের নিজস্ব পরিকল্পনা ছিল; যে গুপ্ত পরিকল্পনাকে অনুধাবনের সুবিধার্থে আমি ২ নং পরিকল্পনা বলে অভিহিত করছি, তা ছিল র\’ য়ের। জানা গেছে, পুরো কার্যক্রমের জন্য র\’ ৬০ কোটি রুপী দিয়েছে, সেনা কর্মকর্তাদের হত্যার জন্য প্রায় ১৫ জন বিদেশী বন্দুকধারী ভাড়া করা হয়েছিল। র\’ পরিচালনাকারী ও তাদের বাংলাদেশী প্রতিপক্ষ যারা অর্থের যোগান দিয়েছিলেন, তারা শেখ হাসিনার ক্ষমতায় আসার পরপরই ঢাকার গুলশানের একটি আন্তর্জাতিক ক্লাবে সাক্ষাৎ করেছিল । সেই সভায় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সোহেল তাজের ছো্টভাইও উপস্থিত ছিলেন্ । ভাড়াকরা খুনীদের দাতা ও সংগঠকরা যাদের মধ্যে কয়েকজন ভারতীয় ও লাজার শিবাজান নামে রাশিয়ার অপরাধ জগতের এক নেতা ছিল যারা ১৯ তারিখ বা ঠিক তার আগে দুবাইয়ের হোটেল বাব- আল- শামসে বৈঠক করেছিল। সেখানে তারা ভাড়াকরা খুনীদের অপারেশন ও পারিশ্রমিকের ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করেছিল।
ঢাকার কয়েকটি দৈনিকে প্রকাশিত রিপোর্টে অনুযায়ী ভাড়াকরা বন্দুকধারীরা ১১ তারিখে নয়, ১৯ তারিখের পরে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিল। উভয় দেশের মানুয়ের শুভেচ্ছা বিনিময়ের জন্য যখন প্রায় ৫ ঘন্টা সীমা্ন্ত খোলা ছিল তখন তাদের কয়েকজন ২১ তারিখে বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ঢুকেছিল; একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে পশ্চিমবঙ্গ সরকার কর্তৃক প্রদত্ত ১,০০,০০০ মিষ্টির মধ্যে তারা ১৬,০০০ মিষ্টি ঢাকায় নিয়ে এসেছিল। তবে অন্যরা কিভাবে বা কোন সীমান্ত দিয়ে ঢুকেছিল তা এখনো অজ্ঞাত । পরিকল্পনাটি ভয়াবহ হলেও সহজ ছিল বৈকি। ভাড়াকরা বন্দুকধারীরা অপারেশনের পূর্বে বিডিআরের ইউনিফর্ম ও অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহার করবে; বিডিআর জওয়ানরা যখন ১ নং পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে, সেই ভীতি ও ত্রাসের সুযোগে খুনীরা তাড়াতাড়ি প্রেবশ করবে এবং লাল ফিতেধারীদের ( কর্নেল ও উপরস্থ) অর্ধেককে খতম করবে। তারপরে তারা অন্য বিদ্রোহীদেরকে তাদের সাথে হত্যালীলায় যোগ দেবার জন্য শক্তি প্রয়োগ করবে। তারা একটি বেডফোর্ড ট্রাক ব্যবহার করবে এবং ৪ নং গেট দিয়ে প্রবেশ করবে। একটি পিক-আপ দিয়ে তাদের ব্যবহার্য অস্ত্রশস্ত্র বহন করা হবে।
বিডিআরের কুশীলব, আওয়ামী লীগ এম.পি মির্জা আজম, হাজী সেলিম, জাহাঙ্গীর কবীর নানক, ফজলে নূর তাপস এবং মহীউদ্দীন খান আলমগীর বেশ কয়েকটি বৈঠকে মিলিত হন এবং তোরাব আরী বিডিআর জওয়ান ও তাপস, নানক, আজম ও সোহেল তাজের মধ্যে সংযোগ রক্ষা করেন।
বি ডি আর হত্যাকান্ডের সেই গোপনীয় অধ্যায়গুলো-২য় খন্ড
স্থানীয় এম.পি. হবার সুবাদে তাপসের সংশ্লিষ্টতা গুরুত্বপূর্ণ ছিল; নির্বাচনী প্রচারণার সময় তিনি জড়িত হয়েছিলেন। তাপসের ঢাকা- ১২ আসনে প্রায় ৫,০০০ বিডিআর ভোটারকে নিবন্ধিত করা হয়েছিল। বিডিআরের কুশীলবরা সাবেক বিডিআর হাবিলদার ও ঢাকার ঢাকা- ১২ আসনের অন্তর্ভুক্ত ৪৮ নং ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগের সভাপতি তোরাব আলীর মাধ্যমে যোগাযোগ বজায় রাখত। তারা তাপসকে নিশ্চয়তা দিয়েছিল ঢাকা- ১২ আসনে নৌকা জিতবে এবং সকল বিডিআর ভোটার তাকে ভোট দিবে।
নির্বাচনী প্রচারণার সেই সময়ে যখন খালেদা জিয়া শেখ হাসিনার চেয়ে জনসভায় অনেক বেশী দর্শক শ্রোতার সমাগম হত, ৫,০০০ ভোট মানে অনভিজ্ঞ আওয়ামী লীগের প্রার্থীর কাছে অনেক যিনি প্রখ্যাত আইনজীবী ও বর্তমান এম.পি. খোন্দকার মাহবুব উদ্দীনের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতা করেছিলেন। তার বিনিময়ে বিডিআর প্রতিনিধিরা তাদের দাবী পূরণ করতে চেয়েছিল যাতে তা্পস সম্মত হন। বিদ্রোহের পরিকল্পনা যখন চূড়ান্ত করা হয়, তাপস সম্মতি দেন যে, তিনি বিডিআর জওয়ানদেরকে সহায়তা যোগাবেন যাতে তারা বিদ্রোহে নিরাপদ থাকে তথা তাদের দাবী আদায় করা যায়। শেখ পরিবারের সদস্য এবং শেখ ফজলুল হক মণি, যিনি পচাত্তরের পনেরই আগস্ট তারিখে তরুণ সেনা কর্মকর্তাদের অভূ্যত্থানে নিহত হয়েছিলেন এবং সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যার বিরূপ ধারণা ছিল, তার পিতৃহীন পুত্র হবার কারণে সে এমনটি করতে পেরেছিলেন। বিদো্রহ ও হত্যাযজ্ঞের পূর্বে সবশেষ বৈঠকটি হয়েছিল ২৪ তারিখে সন্ধ্যায় তোরাব আলীর বাড়িতে; একই্ রাত্রে তাপসের ধানমন্ডির বাড়িতে প্রায় ২৪ জন বিডিআর খুনী তাদের চূড়ান্ত শপথ গ্রহণ করে।
এ গুপ্ত পরিকল্পনাটি প্রধানমন্ত্রী, তার চাচাতো ভাই তথা তাপসের চাচা শেখ সেলিম এম.পি, আব্দুল জলিল এম.পি. নানক, তাপস, সোহেল তাজ, মির্জা আজম, হাজী সেলিম, মহীউদ্দীন খান আলমগীরসহ প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ট অন্য কয়েকজন সদস্যের জ্ঞাত ছিল। ১৩ তারিখ শেখ সেলিমের বনানীর বাসায় অন্ততঃ একটি বৈঠক হয়েছিল; বনানীর বাসিন্দা সোহেল তাজ সেখানে যোগ দিয়েছিলেন; এতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সহ সোহেল তাজের দায়িত্ব স্থির করা হয়েছিল। অকারণে শেখ সেলিম ২৫ ও ২৬ তারিখে বাসার বাইরে রাতযাপন করেননি।
আলমগীর, নানক ও আজম বরাবরই সেনা কর্মকর্তাদেও ধ্বংস করার পক্ষে ছিলেন। তারা যখন প্রধানমন্ত্রীর নিকট পরিকল্পনা উত্থাপন করেন তখন তিনি প্রথমত সম্পূর্ণভাবে গণহত্যার ব্যাপাওে দ্বিধাম্বিত্#৮২০৬; ছিলেন। তবে তিনি ভয়াবহ বিদ্রোহের সপ্তাহখানেক পূর্বে ডিজি, তার স্ত্রী ও কর্নেল মুজিবকে ( সেক্টর কমান্ডার , ঢাকা) অপসারণের সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন। ১২ এপ্রিল গ্রেফতারকৃত বিডিআর কুশীলবদের জিজ্ঞাসাবাদে টিএফআই সেলে র্যাবের কর্মকর্তারা এ সকল তথ্য উদ্বৃত করেন এবং পরে তার সত্যতা প্রমাণ করেন। তারা আরও জানতে পারেন যে, ডিজি, তার স্ত্রী আকস্মিক গুলিতে মারা গেলে জেনারেল মইনকে আবেগায়িত না হতে বলা হয়েছিল; তার মৌনতা এ প্রস্তাব মানা ও অনুমোদনে সায় দিয়েছিল। ডিজি ও তার স্ত্রীকে হত্যায় ফাঁদে আটকে পড়া জেনারেলের অনুমোদন দানের যথেষ্ট কারণ ছিল; কারণ তাতে অবৈধ অর্থ উপার্জনে চোরাচালানের ব্যর্থ প্রচেষ্টায় তার অংশীদারের মৃতু্য। তখন কেউ ঐ অপরাধের সাথে তাকে ও তার স্ত্রীকে জড়াতে পারবেনা। ডিএডি তৌহিদ, জলিল ও হাবিবসহ বিডিআরের প্রধান হোতারা ২ নং পরিকল্পনা সম্পর্কে জানত।
পিলখানায় সেনা কর্মকর্তাদের পূর্ণাঙ্গ ধ্বংস নিশ্চিত করতে জাহাঙ্গীর কবীর নানকের দায়িত্ব ছিল অন্যদিকে ফজলে নূর তাপসের দায়িত্ব ছিল হাজারীবাগ ও ঝিগাতলা এলাকা দিয়ে বিডিআর খুনীদের পলায়ন নিশ্চিত করা। তাপসের সাথে নানকের বাড়তি দায়িত্ব ছিল ২৫ তারিখ রাতে ভাড়াকরা খুনীদের এমবুলেন্সে করে নিরাপদে যেতে দেয়া এবং ২৬ তারিখের মধ্যে সকল খুনীর পলায়ন নিশ্চিত করা। তাদের এয়াপোর্টে যাবার পথে খুনীদেরকে মাইক্রোবাসে স্থানান্তর করা হবে। তাদের মধ্যপ্রাচ্য, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে নিরাপদ পলায়নে নিশ্চিত করার দায়িত্ব ছিল সোহেল তাজের। সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল দেরী হলে প্রয়োজনে এ উদ্দেশ্যে বিজি ০৪৯ ফ্লাইট ব্যবহার করা হবে।
২নং পরিকল্পনার সাফল্য নিহিত ছিল-
১.সেনাবাহিনীকে কোন সামরিক সমাধানে নিবৃত্ত করতে সরকারের সক্ষমতা এবং ;
২. পীলখানা হত্যাযজ্ঞের প্রমাণাদি যত বেশী সম্ভব নিশ্চিহ্ন করে ফেলা
এ জন্যই নানককে দায়িত্ব দেয়া হয়। ঠান্ডা মাথায় হত্যাকান্ড সংঘটনের জন্য নানক সুবিদিত যে জরম্নরী অবস্থাকালীন সময়ে ভারতে তাদের গোয়েন্দা সংস্থার নিরাপদ হাউস এর অন্যতম মেহমান ছিল। তাকে ২৫ তারিখ দুপুর থেকে পীলখানার অভ্যনত্দরের সামগ্রিক কমান্ডের দায়িত্ব দেয়া হয়; যা স্থানীয় সরকারের মন্ত্রনালয়ের ডেপুটি মন্ত্রী হিসেবে তার দ্বায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। নানক এটা নিশ্চিত করেছিল যে বিদ্রোহে নিহত সেনা অফিসারদের লাশ ২৫ ও ২৬ তারিখের রাতে গণকবরে পুতে ফেলা ও দরবার হলকে ধুয়ে মুছে সাফ করা, যাতে হত্যাযজ্ঞের কোন চিহ্ন না থাকে। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে সেনাপ্রধানের নিকট থেকে সামরিক বাহিনীকে বিদ্রোহ দমনে তৎপর করা ছিল সবার প্রত্যাশা। তার সেই ব্যার্থতার প্রেৰিতে বিদ্রোহের পরবর্তী পরিকল্পনা আাঁটা হয় বিদ্রোহ প্রশমনে সম্ভাব্য সামরিক কর্মকর্তাদের চাকুরীচ্যুত করে বিডিআর এর সমসত্দ ফাঁড়ি গুলোতে সেখানকার সেনা অফিসারদের হত্যা করা। এটা বাসত্দবায়িত হলে সরকার দেশে যুদ্ধাবস্থা ঘোষনা করতো আর সেই সুবাদে আকাশ পথে বাংলাদেশে ভারতীয় সেনা অবতরণ শুরম্ন করতো। এই লক্ষ্য সাধনেই সরকারের প্রতি আনর্ত্দজাতিক সহমর্মীতা অর্জনে হাসিনার পুত্র জয় ২৬ তারিখ সকালে আনর্ত্দজাতিক মিডিয়াকে এই মর্মে অবগত করায় যে বিদ্রোহের পিছনে সেনা অফিসারদের দূনর্ীতিই দায়ী।
বিদ্রোহী বিডিআর জওয়ানরা যাতে যথাযথ লক্ষ্য হাসিলে সর্বাত্মকভাবে তৎপর হয় তার জন্য ফেব্রুআরীর শুরু থেকে শেষ পর্যনত্দ প্রায় ১৫ থেকে ১৭ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়। প্রতিটি সেনা অফিসারকে হত্যার জন্য ৪ লক্ষ্য টাকার এ্রনাম নির্ধারন করা হয়। রিং লীডারদের অর্থের পরিমাণ ছিল আরও অনেক বেশী। হত্যাকারীদের সাথে অতি উৎসাহী হয়ে যারা পরবর্তীতে হত্যাকান্ডে সম্পৃক্ত হয় তাদেরকে বিদ্রোহের বা ধ্বংস যজ্ঞের আগে পরে অতিরিক্ত কোন অর্থ প্রদাণ করা হয়নি। পরিকল্পনা -১ এর সাথে সম্পৃক্তরা এমপি তাপস এর মাধ্যমে আর ডি এ ডি’র অনুগতরা নানকের চ্যানেলের মাধ্যমে সংগঠিত হয়। সোহেল তাজ ও জয় ভাড়া করা খুনীদের অর্থ প্রদান করে। হত্যাযজ্ঞ সংঘটনে প্রথম দিকে কিছু আগাম অর্থ দুবাইয়ের হোটেল বাব-আল-শামস এ প্রদান করা হয়।
পরিকল্পনার মধ্যে সম্ভাব্য আপদকালীন পরিস্থিতি তথা যদি সেনাবাহিনীকে পীলখানা বিদ্রোহ দমনের কাজে নিবৃত্ত করা না যায় কিংবা যদি ঘটনার সাথে আওয়ামীলীগের সম্পৃক্তি জনাজানি হয়ে যায় তাহলে কি করতে হবে তাও আগাম পরিকল্পনা করে রাখা হয়। পরিকল্পনা ছিল যদি শেখ হাসিনা সেনা অভিযান বন্ধ করতে ব্যর্থ হয় তাহলে প্রধানমন্ত্রী ভারতে এস ও এস বার্তা প্রেরণ করবে এবং তার প্রেক্ষিতে আকাশ পথে ভারতীয় সেনা অভিযান চালানো হবে। আর তেমন পরিস্থিতিতে সারাদেশের বিডিআর ইউনিট সমুহ ভয়াবহ অভিযান চালিয়ে পুরো দেশকে অস্থিতিশীল করে তুলবে। তখন বহিবিশ্ব দেখবে যে বাংলাদেশ এ গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছে অতএব সে অবস্থায় তারা হাসিনা সরকারকে বাঁচানোর জন্য যথাযথ পদক্ষেপ প্রহণ করবে।
ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রনব মুখার্জী ঘোষণা দেন যে শেখ হাসিনা ও তার সরকার বিপর্যসত্দ অবস্থায় পতিত হলে সেই সরকারের সহযোগিতায় ভারতীয় সেনাবাহিনী এগিয়ে আসবে। ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমের সূত্র মতে সেই সময় আসামের জোরাট বিমান ঘাটিতে বড় ও মাঝারি ধরনের এয়ারফোর্স বিমান সহ প্রায় ৩০ হাজার ভারতীয় সেনাকে প্রস্তুত রাখা হয়। অবশ্য কোন ঐশ্বরিক ক্ষমতা বলে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রী বিদ্রোহের শুরুতে এমন ভবিষ্যত বাণী করেছিল তার বর্ণনা প্রনব বাবু প্রদন করেনি।
ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমও এ নিয়ে কোন উচ্চবাচ্য করেনি। বিদ্রোহীরা কিন্তু সরকার উৎখাতের কোন কথাই বলতে গেলে প্রদান করেনি। বিদ্রোহ অকার্যকর করার আশংকা বিদ্রোহীরা করেছিল কেবলমাত্র সেনাঅভিযান দিয়ে। বস্তুত: বিদ্রোহ অকার্যকর হবার আশংকা যে ভারত করেছিল তার প্রমানই হচ্ছে তাদের উপরিউলি্লখিত সামরিক প্রস্তুতি। যদি সামরিক অভিযান বন্ধ না করা যেতো তাহলে আপদকালীন পরিকল্পনা ছিল তেমন অবস্থায় সেনাপ্রধান সহ সামরিক অভিযানের কমান্ডে নিয়োজিত জেনারেলদের অবিলম্বে অপসারন করা এবং সেনাপ্রধানকে অপসারনপূর্বক তাকে সরকারী নির্দেশ অমান্য করা সহ জরুরী অবস্থাকালীন সময়ের বিভিন্ন অপরাধের জন্যে বিচারের কাঠগড়ায় নিক্ষেপ করা হতো। তেমন ধরনের বিচার ব্যবস্থার পাশাপাশি সরকারের ধামাধরা সাংবাদিকদের দিয়ে এই মর্মে এক ভয়াবহ ক্যাম্পেইন চালানো হতো যে, সেনা কর্মকর্তারা আইনগত ও একটি বৈধ সরকারের নিষেধাজ্ঞা যৌক্তিক দাবী দাওয়া উত্থাপনও অমান্য করে অসংখ্য বিডিআর জওয়ানকে হত্যা করে যা সরকারের ভারমুর্তিই ক্ষুন্ন করা নয়; সরকারের পতন ঘটানোর অপচেষ্টাতেও সিক্ত হয়। এই ধরনের ক্যাম্পেইন চালানোর জন্য ৫ কোটি টাকা আলাদা করে রাখা হয়।
এর পাশাপাশি সেনা অভিযানের ও হত্যাযজ্ঞের সাথে জেএমবি, জামাত ও বিএনপির যোগসাজসের কল্পিত কাহিনী উক্ত ক্যাম্পেইনে তুলে ধরা হতো। এই ক্যাম্পেইনকে মজবুত করার জন্য সরকারের পক্ষে সহায়ক কর্মকর্তাদের র্যাব, ডিজিএফআই, পুলিশ সহ সংশিস্নষ্ট প্রতিষ্ঠান সমুহকে নিয়োগ করা হতো। সম্ভাব্য তেমন আপদকালীন অবস্থায় যাতে হাসিনা সরকার পার পেয়ে যায় তার জন্য অনভিজ্ঞ সাহেরা খাতুনকে গুরম্নত্বপূর্ন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব প্রদান করা হয়। বিদ্রোহ ঘটানোর হোতাদের হোটেল ইম্পেরিয়াল ব্যবহার করতে দেয়া হয় যে হোটেলের মালিক হচ্ছে সাহারা খাতুনের এক ভাই। ঐ হোটেলে ষড়যন্ত্র বাসত্দবায়নের বহু গোপন সভা অনুষ্ঠিত হয়। এটা ছিল সাহারা খাতুনের জন্য এক ফাঁদ। যদি ভুলক্রমে কোনভাবে বিদ্রোহের সাথে সরকারের সম্পৃক্ততার কথা জানাজানি হয়ে যায় তাহলে বলির পাঁঠা বানানো হতো এই সাহেরা খাতুনকে। তাকে অপসারন করে সোহেল তাজকে বসানো হতো পূর্ন মন্ত্রীতে।
আপদকালীন পরিকল্পনা সহ ১ ও ২ পরিকল্পনা মোতাবেকই পীলখানা হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয়। কেউ পছন্দ না করলেও এটা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে পরিকল্পনাকারীরা তাদের পরিকল্পনা বাসত্দবায়নে একেবারে নির্ভুল ছিল .
বি ডি আর হত্যাকান্ডের সেই গোপনীয় অধ্যায়গুলো- ৩য় খন্ড
সমগ্র পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয় অতি বিস্ময়কর চালাকী ও নিষ্ঠুরতার সাথে। বাংলাদেশকে দীর্ঘসময় ধরে এহেন ভ্রাতৃঘাতী ঘটনার বেদনাদায়ক মর্মবেদনায় ভুগতে হবে। আমাদের ৯ মাসের স্বাধীনতা যুদ্ধে সর্বসাকুল্যে সেনাবাহিনীর ৫৫ জন অফিসার শহীদ হয়। তাদের মধ্যে সবাই যুদ্ধে নিহত হয়নি; কেউ কেউ সড়ক দূর্ঘটনা সহ অন্যবিধ কারনেও মৃতু্যবরণ করে। সেনা বাহিনীর কোন সেক্টর কমান্ডার এই মৃতু্য তালিকায় ছিল না। অথচ বিডিআর বিদ্রোহে মাত্র দুই দিনের মধ্যে হত্যা করা হলো ২ জন মেজর জেনারেল, ২ জন ব্রিগেডিআর জেনারেল, ১৬ জন কর্ণেল, ১০ জন লেন্ট্যানান্ট কর্ণেল, ২৩ জন মেজর, ২ জন ক্যাপ্টেন, মেডিক্যাল কোরের ৩ জন অফিসার। বিদ্রোহে উপস্থিত সেনা অফিসারদের দুই তৃতীয়াংশই নিহত হলো। এই পৈশাচিক উপখ্যানের সূদুরপ্রসারী পরিণতি নিয়ে ভাববার আগে দেখা যাক বাংলাদেশী ষড়যন্ত্রকারী ও তাদের সাঙ্গাতরা কে কিভাবে এই হত্যাযজ্ঞ সংঘটনে ভূমিকা রেখেছে।
২৪শে ফেব্রম্নয়ারী রাত ১০টা থেকে ১১ টার মধ্যে ঢাকার ঝিকাতলাস্ত একটি ফিলিং ষ্টেশনের মালিক আতাউর তার মোবাইল থেকে বিডিআর এর ডিজিকে একটি ফোন করে বিডিআর এর ডিজি শাকিলকে এই মর্মে জানায় যে, স্যার আপনাকে কালকে পীলখানায় মেরে ফেলবে। আপনি কালকের অনুষ্ঠানে যাবেননা্ তার এই ফোন কল, র্যাব হেড কোয়াটার আড়িপেতে শুনে এবং কিছু সময়ের মধ্যে আতাউরকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয়। ঘটনার পর তাকে অবশ্য ছেড়ে দেয়া হয়। র্যাব এবং এডিজি কর্ণেল রেজা নুর অনুষ্ঠানিকভাবে এই তথ্য টিএফআই সেলকে প্রদান করে। এতদসত্বেও আমার জানা মতে এমন একটি তথ্য কোন তদনত্দ রিপোটেই উল্লেখ করা হয়নি। এটা মেনে রীতিমত অবিশ্বাস্য যে টি এফ আই সেল এমন একটি গুরম্নত্বপূর্ন তথ্য ধর্তব্যের মধ্যে তথা তাদের বিবেচনায় আনেনি। কিভাবে এমন একটি তাৎপর্যময় তথ্য গোপন করা হলো তা নির্ণয় করা সম্ভব না হলেও এটা সন্দেহাতীতভাবে বলা যায় যে, কোন একটি ফন্দি-ফিকির করে সেই তথ্যটিকে চাপিয়ে ফেলা হয়েছে। আমরা দেখব যে সরকারের ভিতর থেকে কিভাবে এমনি ধরনের ছল-চাতুরী পূর্ন ব্যাপক তৎপরতা চালিয়ে অপরাধীদের রক্ষা ও দেশকে প্রতারিত করা হয়েছে। ২৫ তারিখ সকাল পৌনে নয়টার সময় গোয়েন্দা সংস্থা এন এস আই এই মর্মে প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করে যে কয়েক মিনিটের মধ্যেই পীলখানায় বিদ্রোহ শুরু হবে। একই তথ্য সেনাবাহিনী প্রধানকেও দেয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী কোনরম্নপ পাল্টা ব্যবস্থা প্রহন করেনি। সেনাপ্রধানও বিষয়টাতে নীরবতা অবলম্বন করে। তাদের পাল্টা পদক্ষেপ গ্রহণ করা থেকে প্রধানমন্ত্রী ও সেনাপ্রধানের নিবৃত্ত থাকা ও নীরবতা অবলম্বন থেকে এটা ষ্পষ্টতই প্রতীয়মান হয় যে বিদ্রোহ পরিকল্পনামাফিক বাস্তবায়িত হবার ব্যাপারে তারা আগ্রহী ছিলেন। পীলখানায় বিদ্রোহের শুরুতেই বিডিআর এর ডিজি প্রধানমন্ত্রী, সেনাপ্রধান ও ডিজিএফআই এর ডিজিকে ফোন করলে তারা অবিলম্বে তাকে সাহায্য করার অঙ্গীকার করে। কর্ণেল গুলজার (?) সেনাবাহিনীর সিজিএস এবং ডিএমও’র সাথে কথা বলে এবং র্যাব-২ এর কমান্ডিং অফিসার লে: ক: জামান এর সাথে কথা বলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে অবিলম্বে সেনাবাহিনী প্রেরনের অনুরোধ জানায়। তারা বিডিআর এর ডিজির সাথে ধোঁকাবাজি করে এবং ঢাকা সেক্টরের কমান্ডার মজিব ৩৬ রাইফেল ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার লে: কর্ণেল এনায়েত ও লে: কর্ণেল বদরুল ও অন্যান্য সিনিয়র অফিসারদের তাদেও ইউনিট এ গিয়ে জওয়ানদের শানত্দ করার নির্দেশ জ্ঞাপন করে।
বিডিআর এর মহাপরিচালক যদিও জানতো যে একটা গন্ডগোল হবে; কিন্তু এটা যদি জানতো যে তাদেরকে উপর মহলের প্রদত্ত আশ্বাস হবে স্রেফ ধোঁকাবাজি এবং তাদেরকে বলির পাঁঠা বানানো হবে তাহলে অবশ্যই তারা ভিন্ন ভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য সচেষ্ট হতো। তাদের মধ্যে অনেক নাম করা কমান্ডো অফিসার ছিল। তারা সহজেই কিছু এসএমজি ছিনিয়ে নিয়ে ছোট ছোট গ্রুপে বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে পাল্টা আক্রমন চালিয়ে বিদ্রোহ সর্বাত্বকভাবে দমন করতে না পারলেও অনত্দত বিদ্রোহীদের বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারতো। ভাগ্যাহত অফিসারদের অনেকের স্ত্রী বিদ্রোহ শুরু হলে সেনা প্রধান মঈনের স্ত্রীকে সাহায্যের জন্যে ফোন করলে মঈনের স্ত্রী এ মর্মে ফোনে বকবকনো করতে থাকেন যে, ইনকামিং কল তিনি কিছুই শুনতে পারছেননা। তার এই চাতুর্যপূর্ণ ভূমিকা থেকে এটা আরো একটু বুঝা যায় যে বিদ্রোহে তার স্বামীর ভূমিকা ছিল সন্দেহজনক।
সকাল সাড়ে দশটায় র্যাব ১০ এর অফিসাররা পীলখানার ৫নং গেট সংলগ্ন নিচু উচ্চতার দেয়ালের নিকটে পেঁৗছে যে দেয়াল দ্বারা সনি্নহিত বেসামরিক এলাকা থেকে বিডিআর সদর দফতরকে আলাদা করা হয়েছে। ঐ জায়গাটা ছিল বিদ্রোহ দমনে ঝটিকা অভিযান শুরু করে সদর দফতরকে মুক্ত করার সবচাইতে উপযুক্ত জায়গা। কিন্তু সাড়ে এগারটার দিকে র্যাব এর এডিজি কর্ণেল রেজা নূর র্যাব-১০ অফিসারদের অধিনায়ককে পীলখানা থেকে ৩ মাইল দূরে বেড়ী বাঁধ এলাকায় গিয়ে অবস্থান গ্রহনের নির্দেশ জ্ঞাপন করে। এটা স্বভাবতই জিজ্ঞাস্য যে কার নির্দেশে কিংবা পরামর্শে এবং কেন কর্ণেল রেজা সে নির্দেশ প্রদান করেছিল? বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে তদনত্দ কর্যক্রমে এই সব দিক মোটেই আমলে নেয়া হয়নি। কর্ণেল রেজা নূর এর চাচাতো ভাই হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ট সহকারী বাহউদ্দীন নাসিম। সে কারনে প্রধানমন্ত্রী তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে চিনে। যথাসম্ভব হয় প্রধানমন্ত্রী নিজে অথবা তাঁর ঘনিষ্ট মহলের কেউ রেজা নূরকে দিয়ে ঐ কাজটি করিয়ে থাকবে। র্যাব -১০ কে ওখান থেকে সরিয়ে নেয়ায় বিদ্রোহ পরিকল্পনা বাসত্দবায়নে অনেক অনুকুল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
ঐ পথ দিয়েই বিদ্রোহীরা সদর দফতরের অস্ত্রাগার লুন্ঠন করে তার আওয়ামীলীগের কমিশনার তোরাব আলীর বাসভবনে স্থানানত্দর করে যা ছাত্রলীগের ক্যাডারদের মধ্যে বিতরন করা হয় এবং তার চাইতেও বড় সুবিধা যে সে পথ দিয়ে বিডিআর এর হত্যাকারীরা নিরাপদে হাজারীবাগ ও ঝিকাতলা এলাকা দিয়ে বিনা বাধায় পালিয়ে যায়। র্যাব-১০ এর মোতায়েনকে পুন বিন্যস্থ করা ছিল স্পষ্টতই বিদ্রোহীদের অনুকুলে একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। আরো উল্লেখ্য যে, র্যাব ১০ এর পাশাপাশি র্যাব ২ এবং ৩ কে ধানমন্ডি এলাকায় মোতায়েন করা হলেও তাদেরকে দিয়ে বিদ্রোহ দমনে কোন উদ্যেগই নেয়া হয়নি। তাদেরকে নড়চড়হীন করে রাখা হয়।
বিডিআর এর ডিজি নিহত হয় সকাল সাড়ে দশটায়। ভারতীয় টিভি চ্যানেল ‘চবি্বশ ঘন্টা’ বিষ্ময়করভাবে অতি অল্পসময়ের মধ্যে বিডিআর ডিজি ও তার স্ত্রী নিহত হবার সংবাদপ্রচার করে সকাল এগারটায়। ভারতের আর একটি চ্যানেল এনডি টিভি সংবাদ শিরোনামে দেখায় ১২টার সময় এবং আরও সংবাদ প্রচার করে ১২.১৫ মি: এর সময়ে। কিন্তু বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যমে এই বিদ্রোহের সংবাদ চাপা রাখা হয় ২৬ তারিখ অপরাহ্ন পর্যনত্দ। অথচ কর্ণেল মজিব ও লে: ক: এনায়েত এর লাশ উদ্ধার করা হয় ২৫ তারিখ বিকেল আড়াইটার সময়। এদিকে বিকেল ৩.৩০মি: এর সময় বাংলাদেশের মিডিয়া ঘটা করে নানক কতর্ৃক নিয়ে আসা ১৪ জন বিডিআর বিদ্রোহীর সাথে চা বিস্কুট খেতে প্রধানমন্ত্রী তার সরকারী বাসভবনে বৈঠক করার খবর প্রচার করা হয়। উক্ত সভা চলে ১৫০ মিনিট। মাঝপথে প্রধানমন্ত্রী একটি টেলিফোন কল রিসিভ করার পর তিনি বিডিআর বিদ্রোহীদের প্রতিনিধিদলকে বলেন, তোমরাতো বিডিআর এর ডিজিকে মেরে ফেলেছো, এই সময় বিডিআর এর ডিএডি তৌহিদ বলে উঠে যে, তাহলে সম্ভবত ডিজি মারা গেছেন এটা রীতিমত অবিশ্বাস্য যে তখন পর্যনত্দ প্রধানমন্ত্রী ও তার মেহমান হিসাবে আসা বিদ্রোহীরা জানতোনা বিডিআর এর ডিজির হত্যাকান্ডের খবর অথচ সকাল ১১ টা থেকে ভারতীয় টেলিভিশনের পর্দায় বিডিআর কর্মকর্তাদের হত্যাকান্ডের খবর অবিরত প্রচার করা হচ্ছিল আর ইতিমধ্যে সমগ্র রাজধানীতে এটা নিয়ে ব্যপক আলাপ আলোচনা হচ্ছিল অথবা এটা কি সত্যিই বিশ্বাস করা যায় যে বিদ্রোহীদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর তেমন জিজ্ঞাসা নিতানত্দই উদাসীনতা বশত করা হয়েছিল? সম্ভবত প্রধানমন্ত্রীর তেমন অজ্ঞতাসূলভ (?) জিজ্ঞাসার মধ্যে বিদ্রোহীদের প্রতিনিধি দলের জন্য একটি বার্তা নিহিত ছিল।
উক্ত ফোন কলের বার্তা লাভের পরও বিদ্রোহীদের সাথে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক থেকে এটা স্পষ্টতই মনে হয় যে আসলে তেমন কোন ঘটনাই তথা হত্যাকান্ড বা রক্তপাত তখন পর্যনত্দ ঘটেনি। সভার বাকী সময় অতি শানত্দভাবে কেটে গেলেও একবারের জন্যও প্রধানমন্ত্রী ডিজির স্ত্রী ও তাদের ছেলে মেয়ে ও অন্যান্য অফিসার ও তাদের ছেলে মেয়েদের ভাগ্য সম্পর্কে কোন খোঁজ খবর নেয়নি। অথবা সে তাদের নিরাপত্তা বিধানের কোন আহবানও বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী রাখেননি। অথচ দরবার হলে হত্যাকান্ড শুরুর পর থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষনে নিয়োজিত ন্যাশনাল মনিটরিং সেল থেকে অফিসারদের পরিবার পরিজনদের নির্যাতনের কথা প্রধানমন্ত্রীকে বহু বার জানানো হয়। সেনা প্রধানকে বিডিআর বিদ্রোহীদের সাথে বাইরের লোকজনের কথাবার্তার বিষয়ে জানানো হয়। কিভাবে বিদ্রোহীরা অফিসারদের হত্যা করছে এবং তাদের পরিবার পরিবার পরিজনদের উপর অত্যাচার নির্যাতন চালাচ্ছে সেই সব কথাবার্তায় তার বিবরণ শুনা যায়। সেনাপ্রধান এহেন বর্বরতা মোকাবেলা করার মত কোন পদক্ষেপ গ্রহনের বদলে ন্যাশনাল মনিটরিং সেল এর অফিসারদের শানত্দ থাকার এবং কোনরুপ আবেগ তাড়িত হতে নিবৃত্ত থাকার নির্দেশ জ্ঞাপন করেন।
বিদ্রোহের সাতে প্রধানমন্ত্রী ও সেনাপ্রধানের মৌন সম্মতির সাথে সঙ্গতি রেখে বিডিআর হত্যাকারীদের জন্য সাধারন ক্ষমা ঘোষনা ও তাদের দাবী দাওয়া মেনে নেয়ার আশ্বাস প্রদান করা হয়। রাত নেমে আসার সাথে সাথে আত্মতৃপ্তিতে বলিয়ান বিডিআর বিদ্রোহীদের প্রতিনিধি দল নানককে সাথে নিয়ে বিডিআর সদর দফতরে প্রত্যাবর্তন করেন। নানক একজন সাহসী নেতা ও বিদ্রোহীদের কাজকে সমর্থন জ্ঞাপনে সাফল্য অর্জনকারী হিসেবে বিদ্রোহীদের দ্বারা সমাদৃত হন। কিছু সময় পরই সাংসদ তাপস সংবাদ মাধ্যমকে জানায় যে ডি এডি তৌহিদ এখন থেকে বিডিআর এর মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করবেন। প্রধানমন্ত্রীর নাতির এমন ঘোষনা টিভির পর্দায় ভাসতে থাকে হত্যাকারী ও তাদের দুষ্কর্মের সহায়তাকারীরা বুঝতে পারলো যে সেনা অভিযানের আশংকা দূরীভূত হয়ে গেছে। পরবর্তীতে তাপস বিডিআর সদর দপ্তরের অভ্যনত্দরে গিয়ে বিদ্রোহেিদর সবকিছু ধুয়েমুছে সাফ করে ফেলার নির্দেশ জ্ঞাপন করে। কার্যক্ষেত্রে এটা ছিল হত্যাকান্ডের জন্য লাইসেন্স প্রদান করা। সেই লাইসেন্স সে অর্থহীন ছিলনা পরবর্তীতে তা সবাই বুঝতে পারে।
দরবার হলের একটি টয়লেট এ কর্ণেল এমদাদ জীবিত ছিলেন। সেখানে সে জোহর এর নামায আদায়ের পর তার স্ত্রীরর সাথে মোবাইলে কথা বলেন। রংপুরের সেক্টর কমান্ডার কর্ণেল আফতাব তার সহকর্মী একজন ব্রিগেডিয়ার ও দুইজন কর্ণেল এর নিকট বিকেল সাড়ে চারটার সময় এই মর্মে তিনটি এসএমএস প্রেরণ করেন যে আমি দরবার হলে বেঁচে আছি। আমাদের দয়া করে বাচাঁও। গুরম্নতর ভাবে আহত মেজর মোসাদ্দেকের অতি উদ্বেগজনক ও অব্যাহত ফোন কল এ তাঁকে বাঁচানোর আশ্বাস প্রদান করা হলেও কার্যক্ষেত্রে কিছুই করা হয়নি। অতিরিক্ত রক্তক্ষরনে সে সাড়ে ৫টার দিকে ইনত্দেকাল করে। সেনা অফিসারদের বাচাঁনোর কোন উদ্যোগই গ্রহন করা হয়নি। তাদেরকে বাঁচানোর দ্বায়িত্ব যাদের ছিল তারা অন্যদের পৃষ্টপোষকতায় ব্যাসত্দ ছিল।
সন্ধ্যা রাত্রির দিকে পীলখানা থেকে এ্যাম্বুলেন্স যোগে আহতদের স্থানানত্দরের কাজ শুরু হয়। কিন্তু এটা ছিল একটা বাহানা। ঐ এ্যাম্বুলেন্স এ করে ভাড়াটে খুনীদের বধ্যভূমি থেকে নিরাপদে সরিয়ে নেয়ার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। পীলখানা থেকে এ্যাম্বুলেন্স এ বের করে তাদেরকে পূর্ব নির্ধারিত পয়েন্ট এ অপেক্ষমান মাইক্রোবাসে উঠিয়ে দেয়া হয়। বাংলাদেশ বিমানের বিজি০৫৯ নং বিমানে তাদেরকে মধ্যপ্রাচ্য, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন গনত্দব্যে পেঁৗছিয়ে দেয়া হয়।
ঐ দিন বিকেলে পুলিশের আইজি নূর মোহাম্মদ পীলখানা থেকে তার সদ্য বিবাহিত কন্যাকে উদ্ধারের জন্য মরিয়া হয়ে উঠে। সে পীলখানা প্রবেশের জন্য কয়েকবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনের অনুমতি প্রার্থনা করে। কিন্তু তার প্রার্থনা না মঞ্জুর করা হয়। বিক্ষুদ্ধ আইজি মরীয়া হয়ে একাই যাওয়ার সিদ্ধানত্দ গ্রহন করে। এমতাবস্থায় সাহারা অস্ত্র সমর্পন ও অফিসারদের পরিবার পরিজনদের উদ্ধারের নাটক শুরু করে। সাহারা কেবলমাত্র ওটোশী ভবন থেকে আইজির কন্যা ও বিদ্রোহের ষড়যন্ত্রে জড়িত কর্ণেল কামরুজ্জামানের স্ত্রী ও মিসেস আকবরকে উদ্ধার করে নিয়ে আসেন। এমনকি উক্ত ভবনের দোতালার উপরে তিনি যাননি। উক্ত ভবনের উপরের দিকে অবস্থানকারীরা সহ অন্যান্য আবাসিক ভবনের সবাইকে তাদের ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দিয়ে আসা হয়।
সাহারা খাতুন পীলখানা ত্যাগ করার পর পরই কর্ণেল আফতাবকে হত্যা করা হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর আগমনে তার মনে হয়তো এই বিশ্বাস হয়েছিল যে বিদ্রোহের নিষ্পত্তি হয়েছে এবং তাই তিনি তার গোপন স্থান থেকে বের হয়ে এসে তার স্ত্রী ও কন্যার সাথে সাক্ষাত করতে যায়। সে জানতো যে তারা অফিসারস মেসে আছে। কোয়াটার গার্ড অভিমুখে যাওয়ার পথেই তাকে গুলি করা হয়। কর্ণেল রেজাকে হত্যা করা হয় রাত ৩টার পরে। সাহারা খাতুনের প্রত্যাবর্তনের পর কর্ণেল এলাহীকেও হত্যা করা হয়। সে একটি ম্যানহোলে পালিয়ে ছিল। সেখান থেকে বের হলেই তাকে হত্যা করা হয়। এই ভাবে বেশ কয়েকজন অফিসারকে রাতে হত্যা করা হয়। সরকার প্রধান ও নিজেদের সেনাপ্রধানের বিশ্বাসঘাতকতায় জাতীর নিরাপত্তা বিধানে নিবেদিতপ্রাণ এইসব অফিসারদের জীবন প্রদীপ অতি অল্প সময়ে নিভে যায়। সেনাবাহিনীতে কর্মরত তাদের অসহায় ও অবমানিত সহকর্মীদের পক্ষে তাদের বাঁচানোর কোন ফুরসতই ছিলনা।
বি ডি আর হত্যাকান্ডের সেই গোপনীয় অধ্যায়গুলো-৪র্থ খন্ড
এই লেখার ১ম-২য়-৩য় খন্ডের পর- এই জঘন্য হত্যাকান্ড যখন চলছিল তখন মীর্জা আজমকে অনবরত বিদ্রোহীদের সাথে সেল ফোনে কথা বলতে শুনা যাচ্ছিল। সে হত্যাকারীদের সুনির্দিষ্ট ভাবে কর্ণেল গুলজারের চোখ তুলে ফেলতে এবং গুড়িয়ে দেয়ার নির্দেশ জ্ঞাপন করে। কর্ণেল গুলজারকে ঐরুপ বীভৎসভাবে হত্যা করার জন্যে মির্জা আজমের নির্দেশের পিছনে কারন ছিল তার বোনের স্বামীর মৃত্যুর প্রতিশোধ গ্রহণ করা। কর্ণেল গুলজার তখন, র্যাব গোয়েন্দা শাখার পরিচালক ছিলেন। তার নেতৃত্বে মির্জা আজমের বোনের স্বামী জেএমবির প্রধান আবদুর রহমানকে তার গোপন আসত্দানায় র্যাব অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করে এবং পরবর্তীতে তাকে ফাঁসি দেয়া হয়। কর্ণেল গুলজার ইতিহাসে সিলেট আওয়ামী লীগের এক নেতার ভাড়াকরা বাড়ী থেকে আব্দুর রহমানকে গ্রেফতার করে।এছাড়াও কর্ণেল গুলজার যুবলীগ প্রেসিডেন্ট নানক ও জেনারেল সেক্রেটারী আযমের ব্যক্তিগত আক্রোশের মুখে ছিল উল্লেখ্য যে আওয়ামীলীগ আহুত হরতালের সময় প্রথমবারের মত বাংলাদেশে হরতালে গান পাউডার ব্যবহার করে হোটেল শেরাটনের সনি্নকটে ১১ জন যাত্রীসমেত একটি বিআরটিসি বাস জ্বালিয়ে দেয়ার ঘটনার সাথে নানক ও আযমের সম্পৃক্তির প্রমানাদি কর্ণেল গুলজার প্রতিষ্টা করে। শেখ হাসিনা তখন যুবলীগের এই দুই নেতাকে এই মর্মে নির্দেশ জ্ঞাপন করে যে ‘হয় সরকারী ক্ষমতার নিকট বশ্যতা স্বীকার করো; না হলে রাজপথ জনগনের রক্ত রঞ্জিত করে দাও।’ ২০০৮ সালে র্যাবের কাছে আটক থাকার সময় শেখ সেলিম বাস জ্বালানোর সে লোমহর্ষক কাহিনী কর্ণেল গুলজারের নিকট ব্যাক্ত করেন এবং ঘটনা্র সাথে নানক ও আযমের সরাসরি সম্পৃক্তির কথা গুলজারকে জানান। শেখ সেলিমের সে স্বীকারোক্তির অডিও টেপ ইউটিউব এ প্রচার করা হয়। গুলজারকে অমন বীভৎস মৃত্যু ঘটানোর মধ্য দিয়ে নানক আযমরা কেবল যে প্রতিশোধই গ্রহন করেছিল তাই নয় তাদের সেই ঔদ্ধত বাংলাদেশে সৎ ও দেশপ্রেমিক লোকদের জন্য এক ভয়াবহ হুমকি হিসেবেও প্রতিষ্টা লাভ করেছে।প্রধানমন্ত্রীর বাড়ীতে বিকেলের দোদুল্যমান বৈঠক যখন চলছিল তখন নানক লাউড স্পীকার এ পীলখানা বিডিআর সদর দফতরের তিন কিলোমিটার এলাকার মধ্যে অবস্থানকারী সকল শহরবাসীকে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র অবস্থান নেবার নির্দেশ প্রদান করে। পরে রাতের দিকে বিডিআর সদর দফতরের বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়া হয়। সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশ দরকার ছিল ভাড়াটে ও স্থানীয় হত্যাকারীরা যাতে নিরাপদে সরে যেতে পারে। তোরাব আলী ও তার ছেলে অবৈধ অস্ত্রের ডিলার, সন্ত্রাসী লেদার লিটন এর মাধ্যমে বেসামরিক পোষাক পরিচ্ছেদ সরবরাহ সহ হত্যাকারীদের পালিয়ে যাবার খরচাদি প্রদান করা হয়। উক্ত লিটনকে র্যাব এর আটকাবস্থা থেকে তাপস ও নানকের হসত্দক্ষেপে জানুয়ারী মাসে মুক্ত করা হয়। ঐ দিন রাত ৭টা থেকে ৯টার মধ্যে স্পীড বোট যোগে হত্যাকারীদের বুড়িগঙ্গা নদী পার করিয়ে দেয়া হয়। এই পারাপারে হাজী সেলিমের সহায়তায় তার সিমেন্ট ঘাটকে ব্যবহার করা হয়। হাজী সেলিম এই কাজে পুরোপুরি সমন্বয় সাধনের দ্বায়িত্ব পালন করে। হাজী সেলিমের লোকজন সেই সময় স্থানীয় লোকজনকে সেখান থেকে সরিয়ে দেয়। ঢাকার একটি টিভি চ্যানেল ২৫ তারিখ রাত ১টার সংবাদে উক্ত ঘটনার খবর প্রচার করে। সেই রিপোটে ঘটনার কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য তুলে ধরে বলা হয় যে বেশ কিছু স্পীডবোর্টকে তারা আসা যাওয়া করতে দেখেছে; কিন্তু তারা কাছাকাছি যেতে পারেনি যেহেতু কিছু রাজনৈতিক কর্মী তাদেরকে সেদিকে যেতে বাধা দেয়।হাজী সেলিম ফেব্রুয়ারীর মাঝামাঝি সময়ে বেশ কিছু গোলাবারুদ ক্রয় করে যা বিদেশী ভাড়াটে খুনীরা প্রথমে ব্যবহার করে। ঢাকার দৈনিক প্রথম আলোর এক সাংবাদিক এটা জানার পর সে এন এস আইকে এই মর্মে অবহিত করে যে পীলখানায় কোন ধরনের ষড়যন্ত্রের প্রস্তুতি চলছে যার সাথে বিডিআর ও আওয়ামীলীগ রাজনীতিবিদদের কেউ কেউ জড়িত। ষড়যন্ত্রের নীল নকশামত উক্ত সাংবাদিককে এনএসআই থেকে বলা হয় যে তিনি যেন আর কারো সাথে বিষয়টা নিয়ে আলাপ আলোচনা না করেন। বিষয়টির সত্যাসত্য যাচাই বা তদনত্দ না করে এনএসআই গোটা বিষয়টি চাপিয়ে যায়।পরের দিন সকালে সদর দফতরের কিছু বাসাবাড়ী থেকে উদ্ধার করতে ভাগ্যাহত অফিসারদের পরিবার পরিজনকে জাহাঙ্গীর কবির নানক ও মীর্জা আযম এই মর্মে সতর্ক করে দেয় যে তারা যেনো কেেেনা অবস্থাতেই সংবাদ মাধ্যমকে কিছু না বলে কেননা তখনও তাদের স্বামীরা বিদ্রোহীদের হাতে আটক আছে। নতুন করে এই ধরনের ভয়-ভীতি আতংক ভাগ্যাহতদের পরিবার পরিজনের মনে ঢুকিয়ে দেয়া এবং তার সাথে কিছু আশার সংমিশ্রন ঘটানোর পিছনে সেই দু’ব্যক্তির লক্ষ্য ছিল।(১) পীলখানার অভ্যনত্দরে বর্বর হত্যাকান্ডের পাশাপাশি পরিবার পরিজনদের নির্যাতন, ধর্ষন সহ অন্যান্য অপরাধের খবর যেন দেশবাসী খুব সত্বর জানতে না পারে।
(২) এটা নিশ্চিত করা যে সেনা অভিযান যেন না করা হয় এবং মৃতদেহগুলো সরিয়ে ফেলা সহ রক্তপাত ও ধ্বংসযজ্ঞের সকল চিহ্ন মুছে ফেলার জন্যে যেন প্রয়োজনীয় সময় ও সুযোগ পাওয়া যায়।
২৬ তারিখ রাতেও নানকের নির্দেশে পীলখানায় বিদ্যুত সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়। সেই সময় সকল ধরনের প্রমাণাদি নিশ্চিহ্ন করার জন্যে হত্যা করা সেনা অফিসারদের লাশ পুড়িয়ে ফেলা সহ হত্যার প্রমানাদি মুছে ফেলার কাজে বিডিআর এর হিন্দু জওয়ানদের নিয়োজিত করা হয়। বর্তমানে আটকাবস্থাধীন মনোরঞ্জন নামে এক হিন্দু জওয়ান ঐ কাজে জড়িত ছিল।হিন্দু জওয়ানদের এই জন্যই এই কাজে নিয়োগ করা হয় তেমন আশংকায় যে মুসলমান জওয়ানরা লাশ পুরে ফেলার ব্যাপারটা নাও মানতে পারে। এই রাতে সব কিছু ধুয়ে মুছে সাফ করা সহ বাকী বিদ্রোহীরা নিরাপদে সড়ে পড়ে। সব পরিকল্পনা অতি সাফল্যের সাথে সম্পন্ন করা হয়।
অপরাধ ঢেকে ফেলা দুইদিন পরে তথা ২৭ তারিখে সরকারী সন্ধানকারী দলকে ভিতরে প্রবেশ করতে দেয়া হয়। এ্যাম্বুলেন্সযোগে নিহত ও আহতদের পারাপার করতে দেখা যায়। কিন্তু বিডিআর এর প্রধান প্রবেশ পথ দিয়ে ৩ দিন ধরে অপেৰমান বিডিআর এর নিকট আত্নীয় স্বজনদের কাউকেও প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি কিংবা ভেতর থেকেও কাউকেও বের হতে দেয়া হয়নি। এমন অবস্থা বজায় রাখার মধ্যেও যে অন্য কোন লক্ষ্য লুকায়িত থাকতে পারে এটা শোকাতুর ও হতভাগ্য লোকদের বুঝার কোন উপায় ছিলনা। এটা তাদের নিকট যৌক্তিক বলেই মনে হয়েছে যে ভাগ্যাহত মৃত ব আহতদের যথাযথভাবে সরিয়ে না ফেলা পর্যনত্দ এবং হত্যাকারীদের ধরতে তলস্নাশী অভিযান ও হত্যাকান্ডের প্রমাণাদি সংগ্রহ না হওয়া পর্যনত্দ বধ্যভূমি এলাকায় সাধারনের প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ থাকাই শ্রেয়। এতবড় ধ্বংসযজ্ঞের পিছনে যে সরকার ও সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ পযর্ায়ের কর্মকর্তা জড়িত এটা কারোর পক্ষে আঁচ করা সম্ভব হয়নি। বরং দেশের বিভিন্ন স্থানে বিডিআর ইউনিট সমুহ বিদ্যমান উত্তেজনার জন্য সাধারন্যে উদ্বিগ্নভাব স্পষ্টতই পরিলক্ষিত হতে পারে।
আসলে সেই সময়ও নিঃসন্দেহ জনগণ এটা বুঝতে পারেনি যে সরকার ও সেনাবাহিনীর উচ্চ মহল যারা এমনিতেই একটা বিশেষ সুবিধাভোগী এবং যারা তাদের সেই অবস্থার সুযোগে জাতির সাথে যে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে সেই বিশ্বাসঘাতকতাকে বেমালুম চাপিয়ে রাখার জন্যই ২৭ তারিখও তারা তৎপর থাকে। এই বিশ্বাসঘাতকতার চিহ্ন মুছে ফেলার জন্য প্রয়োজনছিল গোটা ষড়যন্ত্র বাসত্দবায়নের চাইতে আরও নিষ্ঠুর ও ভয়ংকর পদক্ষেপ। একই দিন অর্থাৎ ২৭ শে ফেব্রুয়ারী যখন দ্বিতীয় গণকবর আবিস্কারের মধ্যদিয়ে বিদ্রোহীদের নৃশংস মহা অপরাধের মানচিত্র প্রমানিত হতে শুরু করে তখন নানক ডিজিএফআই এর ডাইরেকটর (সিআইবি) ব্রিগেডিআর জেনারেল মামুন খালেদকে এই মর্মে পরামর্শ দেয় যে প্রচার মাধ্যমকে না জানিয়ে কোন রুপ রাষ্ট্রীয় দাফন অনুষ্ঠান ব্যতিরেকই যেন নিহতদের বিচ্ছিন্ন ও ক্ষতবিক্ষত লাশ অবিলম্বে আত্নীয়স্বজনদের নিকট হসত্দানত্দর করা হয়। নানকের সেই প্রতারনাপূর্ন পরামর্শের কথা সেই সময় উপস্থিত অন্যান্য সেনা কর্মকর্তাদের নজর এড়ায়নি। এমন পরামর্শে ইনি্জিনিয়ারিং কোরের এক অফিসারতো রাগের মাথায় রীতিমত নানককে আক্রমন করতেও সচেষ্ট হয়। অন্য সেনা কর্মকর্তারা তাকে অবশ্য নিবৃত্ত করে। পরিস্থিতি আরও অগি্নশর্মা হয়ে উঠতে পারার আশংকায় নানক দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।
অপেক্ষমান বিডিআর এর নতুন ডিজি বিগ্রেডিআর জেনারেল মঈনুল ইসলামও জেনারেল হেড কোয়াটার এ বসে বসে এই ষড়যন্ত্রের বাকী নীল নকশা বাসত্দবায়নে তৎপর হয়ে উঠে। তিনি পীলখানার ঘটনা নিয়ে আলোচনার জন্য সেনাবাহিনীর একদল অফিসারকে একটি বৈঠকে জড় করেন। তিনি তাদেরকে বলেন যে ব্যক্তিগতভাবে তিনি মনে করেন যে পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার ও সেনাপ্রধান সম্পূনভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। না হলে সেনাবাহিনীর এত জন অফিসার এমনভাবে নিহত হতোনা।
তিনি তার বক্তব্যের সমর্থনে কিছু কিছু যুক্তি তুলে ধরেন। বৈঠকে উপস্থিত সেনা অফিসাররা যখন তাদের মতামত উপস্থাপন করতে শুরু করে তখন তিনি তাদেরকে তাদের বক্তব্য লিখিতভাবে তার নিকট প্রদানের কথা বলে এই মর্মে আশ্বাস প্রদান করেন যে তিনি তাদের বক্তব্য সেনাবাহিনীর উচ্চ মহলে পেশ করবেন। তিনি সেইসব মতামত অবিকলভাবে তখন সিজিএম পদে কর্মরত লে: জে: আমিনুল করিম এর নিকট দাখিল করে এবং তাদের সাথে সেনাপ্রধানের একটি বৈঠক অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা গ্রহনের অনুরোধ জানায়। মঈনুল পরের দিন সেনাকুঞ্জে অনুষ্ঠিত সেনা প্রধানের বৈঠকে সংশ্লিষ্ট অফিসারদেরকে ………..তাদের বক্তব্য উপস্থাপনের পরামর্শ জ্ঞাপন করে। সেই বৈঠকে অফিসাররা সেনাপ্রধানের মুখের উপর তার কঠোর সমালোচনা করলে বৈঠকে চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয় এবং এক পর্যায়ে সেনা নিরাপত্তা ইউনিট এর সহায়তায় আতংকগ্রসত্দ সেনাপ্রধান সভা স্থল ত্যাগ করে। সে বৈঠকের পর পরই পূর্ব নির্ধারিত জানাযায় অংশপ্রহনের জন্যে সেনাপ্রধানকে তার পরিচ্ছেদ বদল করতে আসতে হয়। পরিহাসের বিষয় হচ্ছে সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষুদ্ধ সেনা অফিসারদের উত্তেজিত করার দায়ে মঈনুল এর বদলে দায়ী করা হয় আমিনুল করিমকে। তাকে অবিলম্বে চাকুরী থেকে বরখাসত্দ করা হয়। একজন সম্মানীয় দেশপ্রেমিককে সেনাবাহিনী থেকে হটিয়ে মঈনুল বিডিআর পুনর্গঠনে তার নির্ধারিত দায়িত্ব পালনে মশগুল হয়ে পড়েন।
সরকারের বিরুদ্ধে সেনা অফিসারদের উস্কিয়ে দেয়ার কল্পিত ষড়যন্ত্রের তদনত্দের সাথে মইনুল করিমকে জড়ানোর পাশাপাশি সেনাবাহিনীর অভ্যনত্দরে সক্রিয় বিদ্রোহের হোতাদের যোগসাজসে সরকার আরও একটি ঘটনাকে সঙ্গোপন করে রাখে। ঘটনাটি ছিল ঐ দিন উপ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সোহেল তাজ পীলখানায় হত্যাযজ্ঞে নিয়োজিত বিদেশী কিলারদের অতি নিরাপদে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেয়। উল্লেখ্য যে ১৮ই ফেব্রুয়ারী থেকে ২৫ ফেব্রুয়ারী পর্যনত্দ সোহেলকে তার অফিস কিংবা জনসমুক্ষে দেখা যায়নি। কোন কোন সংবাদ মাধ্যমে এই মর্মে সংবাদ প্রকাশিত হয় যে ২৫ ও ২৬ শে ফেব্রুয়ারী সে তার পরিবারের সাথে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছিল। এটা ছিল সম্পূর্ণ মিথ্যাচার। সে ১৮ই ফেব্রুআরী গোপনে ভারত সফরে যায় এবং দুই বা তিন দিন পর সে ফিরে এসে পরিকল্পনা মোতাবেক ২৫ তারিখ রাতে বিদেশী ভাড়াটে খুনীদের বিমানযোগে নিরাপদে বিদেশে পার করে দেয়ার কাজে সহায়তা করে। ২৮ তারিখ সন্ধায় সেনাবাহিনীর একটি পরিবহন হেলিকপ্টারে করে সোহেল তাজ সিলেট যায় এবং সে রাতেই ওসমানী বিমান বন্দর থেকে একটি বেসামরিক বিমানে সে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমায়। সেনাবাহিনীর লে: ক: শহীদ সে হেলিকপ্টার চালায় যে কিছুদিন পর নিহত হয়। সে ও ৫৫ পদাতিক ডিভিশনের মেজর জেনারেল রফিকুল ইসলাম সহ একটি রহস্যময় হেলিকপ্টার দূর্ঘটনায় টাঙ্গাইলের সনি্নকটে তারা নিহত হয়। হেলিকপ্টার বিধসত্দ হওয়ার ঘটনাটি ছিল নাশকতামূলক। সোহেল তাজ এর দুষ্কর্ম গোপন রাখতে নিরাপরাধ শহীদকেই কেবল হত্যা করা হলোনা; সেই সাথে হত্যা করা হলো আরো একজন দেশপ্রেমিক সেনা কর্মকর্তাকে।
পরবর্তীতে ডিজিএফআই এর ব্রিগেডিআর জেনারেল মামুন খালেদকে দায়িত্ব দেয়া হয় সেই সব অফিসারের তালিকা প্রনয়নের জন্য যারা সেনাকুঞ্জের বৈঠকে সেনাপ্রধানের সামনে দাড়ীয়ে অভিযোগ জানানোর সাহস দেখিয়েছিল। এমন ৫০ জন অদ্ভূত অফিসারের তালিকা প্রস্তুত করা হয়; যাদের অনেককে ইতিমধ্যে চাকুরীচ্যুত করা হয়েছে আর বাকীদের ঢাকার বাইরে গুরুত্বহীন পদ সমূহে বদলী করা হয়।
পীলখানা হত্যাযজ্ঞ থেকে যে কয়েকজন নিরাপদে বেরিয়ে আসে তাদের মধ্যে ৪৪ রাইফেল ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে: ক: শামস একজন এবং তাকেই কেবলমাত্র টেলিভিশনে উপস্থাপন করা হয় এবং সাধারন্যে তিনি আকস্মাৎ একজন প্রসিদ্ধ ব্যক্তি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। মিডিয়া সমুহে তিনি তার ভাই ভাগ্যাহত অফিসারদের হত্যাকান্ড ও তাদের অত্যাচার যন্ত্রনা সম্পর্কে কেবল গীত গেয়েই ক্ষানত্দ হলেন না; তিনি বলে দিলেন যে সকল অফিসারকে ২৫ তারিখ সকাল ১১টার মধ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। তার চাক্ষুস বর্ণনা প্রধানমন্ত্রী ও সেনাপ্রধান কতৃক সেনা হসত্দক্ষেপ ছাড়া বিদ্রোহ দমনের গৃহীত নীতির যৌক্তিকতা নিরুপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অর্থাৎ সেনা অফিসাররাতো ১১টার মধ্যেই নিহত হয়ে যায়। অতএব তার পর বিদ্রোহ দমনে সেনাবাহিনী এগিয়ে গেলে আরো কিছু জীবন হানী ও রক্তপাত ছাড়া আর কি হতো? এদিকে প্রধানমন্ত্রীর সাাঙ্গাতরা বিদ্রোহ মোকাবেলায় প্রধানমন্ত্রীর গৃহিত বুদ্ধিদ্বীপ্ত সিদ্ধানত্দের প্রশংশাস সারা দেশকে মাতোয়ারা করার জজবায় মেতে উঠে। প্রধানমন্ত্রী ও সেনাপ্রধান কর্ণেল শামস এর প্রদত্ত ভাষ্যের ঋন খুব দ্রুতই পরিাশোধ করে। তাকে এলিট এস এফ এফ এ বদলী করা হয়।
বিদ্রোহ সম্পর্কে গঠিত সেনা তদনত্দ টীম শুরু থেকেই বিদ্রোহের ভিন্ন চিত্র পেতে শুরম্ন করে। তারা এটা বের করে ফেলে যে পীলখানা বিদ্রোহীদের মূল উৎস কর্ণেল শামস এর ৪৪ ব্যাটালিয়ান এবং উক্ত ব্যাটালিয়ানের কোন কমান্ডিং অফিসারকে তথা কর্ণেল শামস মেজর মাহাবুব এবং মেজর ইসতিয়াক কে হত্যা করা হয়নি।
কিংবা তদের অফিসও অন্যান্য নিহত অফিসারের অফিস এর ন্যায় লন্ড ভন্ড করা হয়নি। তদনত্দে আরও গুরুতর যে তথ্য ফাস হলো তা হচ্ছে মিনিট কয়েক পূর্বে বিডিআর এর ৫ নং গেট এর সনি্নকটে কর্ণেল শামস কে একদল বিডিআর সেনাকে কি যেনো ব্রিফিং করতে দেখা যায়। যখন কেউ একজন চিৎকার দিয়ে উঠে যে অফিসাররা সৈনিক থেকে আলাদা হয়ে যাও তখন সে খুব তাড়াতাড়ি তার ব্রীফিং সমাপ্ত করে দ্রুত সরে পড়ে। ৪৪ রাইফেল ব্যাটালিয়ানের গ্রেফতার কৃত বিদ্রোহীদের কেউ কেউ জিজ্ঞাসাবাদে এই মর্মে উল্লেখ করেছে যে বিদ্রোহ পরিকল্পনার ব্যাপারে কর্ণেল শামসকে জিজ্ঞাসা করা হোক। তারা পরিকল্পনার কথা কিছুই জানেনা বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানায়। সেনা তদনত্দ বোর্ড এই ব্যাপারে কর্ণেল শামসকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য অনুমতি চাইলে প্রধানমন্ত্রির অফিস সে অনুমতি প্রদানে অসম্মতি জ্ঞাপন করে।
আবার বিডিআর এর যোগাযোগ ইউনিট এর কোন অফিসারও নিহত হয়নি। এর অধিনায়ক কর্ণেল কমরুজ্জামানকেউ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সেনা তদনত্দ বোর্ডের অনুরোধ প্রধানমন্ত্রীর অফিস প্রত্যাখান করে।
সেনা তদনত্দের প্রাথমিক পর্যায়ে র্যাবের নিম্ন পদস্থ অফিসাররা যখন বিদ্রোহের আগে পরের সন্দেহভাজনদের ফোন কল রেকর্ড পরীক্ষা শুরু করে তখন এমন অনেক তথ্য তারা লাভ করে যার মধ্যে বিডিআর হত্যাযজ্ঞের সাথে আওয়ামীলীগ নেতাদের জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়। আওয়ামীলীগ নেতা তোরাব আলী বিদ্রোহের পরিকল্পনা সম্পর্কে বিদেশে কারো সাথে তাদের পরিচয় গোপন করে ব্রিগেডিআর জেনারেল হাসান নাসির এর বেনামে বহু চিঠি অনেক সেনা কর্মকর্তার নিকট প্রেরন করে। এটা অনেকটাই নিশ্চিত যে হাসান নাসিরকে খুব দ্রুতই বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হবে। নিয়মিত যোগাযোগ করতো কিংবা সরকার সাহায্য না করায় বিদেশের সে ফোন ও তার সাথে জড়িত ব্যক্তির পরিচয় ও হদিস বের করা সেনা তদনত্দ বোর্ডের পক্ষে সম্ভব হয়নি।
এমনিতর ঘটনা সমুহের অন্যতম একটি উল্লেখ্য ঘটনা হচ্ছে ২৪ শে ফেব্রম্নয়ারী ফোনে ডিএ ডি তৌহিদের সাথে নানকের ২০৪ মিনিটের কথোপকোথন। এই কথোপকোথন ও নানকের আরো কিছু দোষনীয় কার্জকর্মের প্রমাণ পওয়া যায় এবং ২৫শে মার্চ রাতে যখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সাহারা খাতুন পীলখানায় অস্ত্র সংবরণ নাটক মঞ্চস্থ করছিল তখন নানক কি করছিল তা জানার জন্য নানককে সেনা তদনত্দ বোর্ড জিজ্ঞাসাবাদের প্রস্তুতি গ্রহণ করলে নানক তা থেকে বাঁচার জন্যে হটাৎ বুকের ব্যথার ভান করে ল্যাবএইড হাসপাতালে ভর্তী হয়। এবং দ্রুত সেখান থেকে সিঙ্গাপুর চলে যায়। হত্যাযজ্ঞের দিন কয়েকপর ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিব মেনন এক অনির্ধারিত সফরে ঢাকায় আগমন করে এবং জরুরী ভাবে প্রধানমন্ত্রী ও সেনা প্রধানের সাথে গোপন শলা পরামর্শে মিলিত হয়। এদিকে সেনা তদনত্দ বোর্ড ঘটনা তদনত্দে নানকের সাথে কথা বলা দরকার এটা প্রধানমন্ত্রীকে জানানো হলে তিনি তা সরাসরি প্রত্যাখান করেন। শুধু তাই নয় ব্রিগেডিআর জেনারেল হাসান নাসির যিনি সেনাতদনত্দ বোর্ডের সদস্য ছিল এবং তিনি নানককে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিল বিধায় তাকে সেনা তদনত্দ টীম থেকে সরিয়ে ফেলা হয়। নানক যখন জানতে পরলো যে তাকে জিজ্ঞাসা বাদ না করার ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করা হয়েছে এবং তাকে আইনের উর্দ্ধে রাখা হবে তখনই সে দেশে ফিরে আসে। আর অত্যনত্দ পরিশ্রমী ও দ্বায়িত্ববান অফিসার নাসিরকে প্রতিহিংসার শিকার হতে হলো।
র্যাবের আরেকটি কল রেকর্ড থেকে জানা যায় যে, লেফটেন্যান্ট কর্নেল আব্দুল মুকিম সরকার (সিও ২৫ রাইফেল ব্যাটেলিয়ন, পঞ্চগড়) যিনি পিলখানায় দরবারে যোগ দিয়েছিলেন এবং অক্ষতভাব বেচে গিয়েছিলেন, তাকে ২৫ তারিখ রাত সাড়ে ন’টায় সুবেদার মেজরকে বলতে শোনা গিয়েছিল, ” আমাদের নির্দেশ হলো সৈনিকদের যাতে কোন ক্ষতি না হয়। যারা পালিয়ে গেছে তো গেছে– আপনারা ডিএডি সাহেবকে নিয়ে ভাল থাকেন; আর কোন বাহিনী যাতে ভিতরে ঢুকতে না পারে । ডিএডি সাহেবকে এনাদের সাথে কথা বলতে বলবেন–। ” যা ডিএডি তৌহিদকে ভারপ্রাপ্ত ডিজি হিসাবে তাপসের ঘোষণার কিছু পরে হয়েছিল। স্পষ্টভাবেই সরকার এ ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিল; তবে সে কোন আদেশ দিয়েছিল? ঘটনা হচ্ছে, লেফটেন্যান্ট কর্নেল শামস্ ও কামরুজ্জামানের মত লেফটেন্যান্ট কর্নেল সরকার অক্ষত ছিল বলে বোঝা যায়।
তাদের প্রাথমিক তদন্তকালে ভাড়াটে বিদেশী খুনীরা যে জাল ইউনিফর্ম পরিধান শেষে ফেলে গিয়েছিল তার প্রস্তুকতকারী দর্জি ও দর্জির দোকান র্যাবের কর্মকর্তারা খুজে পেয়েছিল। সে সকল খুনীদের পিলখানা থেকে পলায়নে ও এয়ারপোর্টে যাবার কাজে ব্যবহৃত এমবুলেন্স ও মাইক্রোবাস সম্পর্কে তারা তথ্য নিতে পারত। মাইক্রেবাসগুলোতে ভূয়া নম্বর প্লেট ছিল এবং সেগুলোর চালক ও মালিকদের খুজে বের করা কঠিন ছিল। তবে নিদেনপক্ষে তারা এ ঘটনা বুঝতে দিয়েছিল যে, আওয়ামী লীগের একজন সহানুভূতিশীল ব্যক্তি রেড ক্রিসেন্ট হাসপাতালকে সামাল দিয়েছিল এবং প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসকের মেডিকেল ক্লিনিক থেকে এমবুলেন্স সরবরাহ প্রশ্নসাপেক্ষ ছিল।
পিলখানা হত্যাকান্ডের প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসতে শুরু করলে ডিজি ডিজিএফআইয়ের ফজলে আকবর ব্যক্তিগত ব্রিফিংয়ে ঘটনার সাথে আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্টতা বাদ দিয়ে তদন্ত কার্যক্রম চালানোর জন্য তার কর্মকর্তাদের নির্দেশ দানের কথা জানান। কিছু জুনিয়র কর্মকর্তা গুঞ্জন করতে থাকেন, যারা বিরোধী বলে চিহ্নিত তাদেরকে দু্রত ডিজিএফআই থেকে অন্যত্র সরিয়ে দেয়া হয়; বাকীদের কাছে সংবাদটি অক্ষুণ্ন থাকে। মার্চের শুরু থেকে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মামুন খালেদের নেতৃত্বে ডিজিএফআই টিম সকল টিভি চ্যানেল ও সংবাদপত্রে কাজ শুরু করেন যাতে অপ্রিয় সত্য বেরিয়ে আসতে না পারে।
র্যাবের লেফটেন্যান্ট কর্নেল মজিদ এবং মেজর হামিদ বিদ্রোহ ও হত্যাকান্ডে আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্টতার দৃঢ় প্রমাণ সংগ্রহ করেছিলেন। মজিদকে সরিয়ে প্রধানমন্ত্রীর চাচাতো ভাই শেখ হেলাল এম.পির ঘনিষ্ট আত্মীয় মেজর আজিমকে র্যাবের গোয়েন্দা বিভাগের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক করা হয়েছিল, একইসাথে হামিদকে র্যাব থেকে বদলী করা হয়েছিল। দায়িত্ব নিয়ে আজিম, যিনি পরবর্তী পদে পদোন্নতি লাভের অযোগ্য বলে বিবেচিত ছিলেন, মেজর আতিককে পিলখানা হত্যাকান্ডের সাথে জেএমবি, বিএনপি অথবা অন্য কোন সামরিক সংস্থার সাথে যোগাযোগ করতে নির্দেশ দেন। তাছাড়া মজিদ ও হামিদের সংগৃহীত সকল অবৈধ রূপে প্রতীয়মাণ আলামত তিনি ধ্বংস করে ফেলেন।
সে সময়ে নানকের উপরস্থ এলজিআরডি মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম প্রকাশ্যে বিদ্রোহের সাথে জেএমবি বা কোন স্বাধীনতা বিরোধী চক্রের যোগসাজশের প্রমাণ না পাওয়ার জন্য আর্মি তদন্ত বোর্ডকে তিরস্কার করেন। আজিমের নেতৃত্বে র্যাবের গোয়েন্দা শাখা মোকদ্দমাটি অনুসরণ করতে থাকে। হঠাৎ মাওলানা আব্দুস সোবহানকে নিরাপত্তা হেফাজতে নিয়ে র্যাবের হেফাজতে রাখা হয়। প্রধানমন্ত্রী যাকে তদন্ত সমন্বয়ের দায়িত্ব দিয়েছিলেন সেই লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অবঃ) ফারুক খান দু্রত দাবী করেন যে, বিদ্রোহে কিছু ইসলামী সন্ত্রাসী জড়িত রয়েছে। আজিমের পরিকল্পনা ছিল মাওলানা সোবহানকে চাপ প্রয়োগ করে মিথ্যা জবানবন্দি নেয়া যে, হত্যাকান্ডে ইসলামী জঙ্গীরা জড়িত রয়েছে। সে সময় ঢাকার একটি দৈনিকে তদন্ত প্রতিবেদনে মন্ত্রীর দাবীর বিরুদ্ধে বেশ কিছু তথ্য প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়। প্রতিবেদনটি ছিল যথার্থ; যাতে হত্যাকান্ডে সাথে ইসলামী জঙ্গীর জড়িত থাকার বিষয়টি সরকারকে পরিত্যাগ করতে বলা হয়। তখন আব্দুস সোবহানকে নিরাপত্তা হেফাজত থেকে ছেড়ে দেয়া হয়। কিছুদিন পরে কয়েকজন দলীয় সদস্য নিয়ে সে প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করে সরকারের সাথে সংহতি প্রকাশের ঘোষণা দেন।
বি ডি আর হত্যাকান্ডের সেই গোপনীয় অধ্যায়গুলো-৫ম খন্ড
তাদের এ অভিযানের ধারাবাহিকতায় এলপিআর থেকে আব্দুল কাহহার আকন্দকে ফিরিয়ে এনে সিআইডির তদন্ত টিমের প্রধান করা হয়; যিনি প্রধানমন্ত্রীর একজন চেনা সমর্থক বলে পরিচিত। দু’দশক আগে একদল তরুণ সামারিক কর্মকর্তা কর্তৃক প্রধানমন্ত্রীর পিতার হত্যাকান্ডের এফআইআর তদন্তে তার সাফল্য তেমনটি ছিল না। বিগত সাধারণ নির্বাচনে একটি আসনে প্রার্থিতার জন্য তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়েছিলেন তবে এলপিআর এ থাকার কারণে তিনি দাড়াতে পারেননি । তাই স্পষ্টতঃই তার দলীয় আনুগত্য ও তদন্তকারী হিসাবে অলৌকিক দক্ষতা প্রদর্শনকে অস্বীকার করার জো নেই; পিলখানা হত্যাযজ্ঞে তার দায়িত্ব ছিল সহজ; যাতে সামরিক তদন্তের পা্রমাণ্য আলামত থেকে বেরিয়ে আসা সকল গুরুত্বপূর্ণ আলামত ধ্বংস করা যায়।
সরকারের এ সকল পূর্বনির্ধারিত নীতি ও খেলার কারণে সামরিক তদন্ত সংস্থা তেমন কোন সঠিক কাজ করতে পারেনি। তারা কেবল সম্মানজনক একটি কাজ করতে পেরেছে যে, প্রতিবাদ করে অবসরে যাওয়া। তবে তা করলে দেশ আরও গভীর সঙ্কটে নিপতিত হত এবং তদন্ত সংস্থার সদস্যরা হেরে যেত যেখানে তাদের অনেক ক্ষমতাধর সহকর্মী সমর্থনের দোষে দুষ্ট ছিল তদন্ত বোর্ডের প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী ( কিউএমজি জিএইচকিউ) তার সততা ও নিষ্ঠার জন্য পরিচিত আবার তিনি বেশ সাবধানী ব্যক্তি। তাই আশ্চর্য হবার কিছু নেই যে, জাহাঙ্গীর ও তার বোর্ড সদস্যরা যেমনটি উচিৎ ছিল তেমনটি ঘাটতে যাননি। এমনকি যখন প্রতিবেদনটি আমাদের কাছে দেয়াও অনিশ্চিত ছিল।
ব্যক্তিগতভাবে আমার মতে সত্য ও প্রকৃত তথ্য উদঘাটনে জাহাঙ্গীর ও তার বোর্ড সদস্যদের ব্যর্থতার জন্য আমার দুঃখ হচ্ছে; কারণ আমরা সেনা কর্মকর্তারা দেশ ও জাতির পক্ষে শপথ নিয়ে কাজ করি। তাই প্রয়োজনে আমরা চরম ত্যাগ স্বীকার করে থাকি। আমার ভয় হয়, আমরা আমাদের শত্রুর মোকাবেলায় আগ্রহী না হলে আমাদের জাতির কি দশা হয় কে জানে।
৪. পুরস্কার আব্দুল কাহহার আকন্দ ও তার সিআইডির তদন্ত টিমের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সামরিক ট্রাইবুনাল ছাড়া হয়ত এক দু’জন বিডিআরের বিচার হবে; তাদের কয়েকজনের ফাসীও হতে পারে । তবে হত্যাকান্ডের পরিকল্পনা ও সংঘটনে জড়িত রাঘব বোয়ালরা প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে হয়ত ধরাছোয়ার বাইরেই থেকে যাবে। এ ্ অপরাধে প্রধানমন্ত্রী, তার পুত্র জড়িত সহযোগীদেও ন্যায় বিচারের স্বার্থে আত্ম- রক্ষণাত্মক হওয়া উচিৎ ছিল। পিলখানা হত্যাকান্ডের বিদেশী প্ররোচকদের বাংলাদেশী হোতাদেও বিচার থেকে রক্ষা একটি ব্যবহারিক কাজ ছিল। /তারা তাদের খেলা শেষ করতে নয় বরং হত্যাকান্ডকে ু্সকে দিয়েছিল। অবশ্য এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, প্রধানমন্ত্রী, তার পুত্র ও এ অপরাধে জড়িতদেও উদ্দেশ্য সফল হয়েছে কিনা তা জানতে কোন আপত্তি ছিল না। অন্যথায় তার সম্মত না হলে প্রথম অবস্থানে তার বিদেশী প্ররোচকদের উদ্দেশ্য কি ছিল?
যেহেতু ভারতীয় র’ ছিল প্রধান প্ররোচক, বিদেশী প্ররোচকদের উদ্দেশ্য বিশ্লেষণে আমি প্রথমেই পিলখানা হত্যাকান্ডে তাদের উদ্দেশ্য দিয়ে শুরু করব। র’ এর উদ্দেশ্য বিবেচনায় পাঠককে বিডিআরকে ধ্বংস করার কথা ভুললে চলবে না, যাতে তা এমনভাবে পুনর্গঠনের কথা বলা হয়েছে যাতে ভারতীয় বিএসএফের সুবিধা হয়। বিদ্রোহের সময় প্রধানমন্ত্রীর তনয় সজীব ওয়াজেদ জয় ওয়ার্ল্ড প্রেসকে বলেছেন সেনা কর্মকর্তাদের দুর্নীতির কারণে তার দরকার ছিল। তবে বিদ্রোহীদের চাহিদার বিবেচনায় সুস্পষ্ট ছিল যে, দুর্নীতির কারণে নয় তবে তাদের বৈষয়িক লাভের জন্য যাতে অবৈধ উপার্জনের সাথে পেশাগত উধর্্ব পদ লাভ হতে পারে। আরও স্পষ্ট যে, শেষোক্ত চাহিদার পরিবর্তনে যা ছিল বিদ্রোহীদের সবচেযে জোরালে দাবী যে বিডিআরের কমান্ড থেকে সেনাবাহিনীর প্রত্যাহার যা প্ররোচকদেও দ্বারা বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। এর পেছনে অসৎ উদ্দেশ্য ছিল যে, মই্নুল ইসলামের মাধ্যমে দেশ পনর্বর্িক্রি করা। তাহলে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, বিদ্রোহের নেপথ্যেও কুশীলবদের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল, সেনা কর্মকতর্া ছাড়া আমাদের দেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর পুনর্গঠন। এ দাবী জোরালো তথা সোচ্চার করতে তাদের সহকর্মীরা সীমান্ত রক্ষী বাহিনীতে নিয়োগ নেবার চেয়ে সেনা কর্মকর্তাদের হত্যা করা হয় , তাদের স্ত্রী ও কন্যাদেও অত্যাচার করা হয। প্রশ্ন হচ্ছে, কার জন্য বা কার স্বার্থে?
যেহেতু ভারতীয় র’ ছিল প্রধান প্ররোচক, বিদেশী প্ররোচকদের উদ্দেশ্য বিশ্লেষণে আমি প্রথমেই পিলখানা হত্যাকান্ডে তাদের উদ্দেশ্য দিয়ে শুরু করব। র’ এর উদ্দেশ্য বিবেচনায় পাঠককে বিডিআরকে ধ্বংস করার কথা ভুললে চলবে না, যাতে তা এমনভাবে পুনর্গঠনের কথা বলা হয়েছে যাতে ভারতীয় বিএসএফের সুবিধা হয়। বিদ্রোহের সময় প্রধানমন্ত্রীর তনয় সজীব ওয়াজেদ জয় ওয়ার্ল্ড প্রেসকে বলেছেন সেনা কর্মকর্তাদের দুর্নীতির কারণে তার দরকার ছিল। তবে বিদ্রোহীদের চাহিদার বিবেচনায় সুস্পষ্ট ছিল যে, দুর্নীতির কারণে নয় তবে তাদের বৈষয়িক লাভের জন্য যাতে অবৈধ উপার্জনের সাথে পেশাগত উধর্্ব পদ লাভ হতে পারে। আরও স্পষ্ট যে, শেষোক্ত চাহিদার পরিবর্তনে যা ছিল বিদ্রোহীদের সবচেযে জোরালে দাবী যে বিডিআরের কমান্ড থেকে সেনাবাহিনীর প্রত্যাহার যা প্ররোচকদেও দ্বারা বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। এর পেছনে অসৎ উদ্দেশ্য ছিল যে, মই্নুল ইসলামের মাধ্যমে দেশ পনর্বির্ ক্রি করা। তাহলে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, বিদ্রোহের নেপথ্যেও কুশীলবদের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল, সেনা কর্মকতর্া ছাড়া আমাদের দেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর পুনর্গঠন। এ দাবী জোরালো তথা সোচ্চার করতে তাদের সহকর্মীরা সীমান্ত রক্ষী বাহিনীতে নিয়োগ নেবার চেয়ে সেনা কর্মকর্তাদের হত্যা করা হয় , তাদের স্ত্রী ও কন্যাদেও অত্যাচার করা হয। প্রশ্ন হচ্ছে, কার জন্য বা কার স্বার্থে?
বিডিআর কর্মকান্ড সম্পর্কে ওয়াকিফহাল যে কেউ জানে যে, আমাদের এ আধা- সামরিক বাহিনীর দায়িত্ব হচ্ছে:
(১) সীমান্তে চোরাচালান নিরোধ এবং
(২) আন্তর্জাতিক সীমান্তে যে- কোন প্রতিবেশী দেশের অনুপ্রবেশ প্রতিরোধ।
এ দুটো প্রাথমিক দায়িত্বের মধ্যে প্রথম ও দ্বিতীয়টিতে যথাক্রমে আনসার ও সেনাবাহিনী সহায়তা করে থাকে এবং উভয় কাজে তাদেরকেই সম্মুখ সারি রক্ষর দায়িত্ব পালন করতে হয়। পরবর্তী দায়িত্বেও জন্য প্রোথমিকভাবে শুরু থেকেই সেনাবাহিনী কমান্ডের দায়িত্ব পালন করে আসছে। বিডিআর কোন ব্যতিক্রম নয়। সেনা কর্মকর্তারা ঘনিষ্ঠ শত্রু বিএসএফকেও কমান্ড করে থাকে।
এ ধরনের বিন্যাসের সুবিধা চিহ্নিত করা কঠিন কিছু নয়, কোন বাংলাদেশী কি কখনও শুনেছে যে বিএসএফের ভেতওে বা বাইরে তার কমান্ড অবস্থানে কোন পরিবর্তনের কথা উচ্চারণ করেছে? কেউ যদি এর প্রত্যুত্তরে বলে যে, আমাদের চাহিদা ও অভিজ্ঞতা নির্বিশেষে আমরা ভারতীয় উদাহরণকে অনুসরণ করতে আগ্রহী নয়, পাঠককে মনে করিয়ে দিতে চাই যে, যখনই বিডিআর বিএসএফ দ্বারা আক্রান্ত বা বা পার্বত্য এলাকায় শান্তিবাহিনীর দ্বারা আক্রান্ত হয় , কমান্ডিং অফিসারের অনুপস্থিতিতে প্রায়শই তারা তাদের অস্ত্র ফেলে পালিয়ে আসে। অন্যদিকে সেনা কর্মকর্তাদের কমান্ডে তারা ঠিকই শক্ত হাতে যুদ্ধ করে থাকে। এ কথার সত্যতা যাচাইয়ে স্থানীয় লোকদের সাথে আলোচনা করা যেতে পারে তারা একই কথা বলবে।
কেউ এ সত্যকে এখনও মানতে না চাইলে পদুয়া ও রৌমারীর ঘটনার কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যাতে ২০০১ সালে বিডিআর জওয়ানরা সেনা কর্মকর্তাদের কমান্ডে যুদ্ধ করেছিল এবং বিএসএফকে বিতাড়িত করতে সঙ্ম হয়েছিল যারা কিনা বাংলাদেশের অভ্যন্তওে বিডিআর ক্যাম্প দখল করতে এসেছিল। উভয় ঘটনায় আগ্রাসীরা কেবল বিতাড়িত হয়নি অনেক আক্রমণকারী প্রাণও হারিযেছিল। পরবর্তী ঘটনায় চারজন সেনা কর্মতকর্তা- একজন মেজর ও তিনজন ক্যাপ্টেনসহ বিডিআরের জওয়ানরা বি্েসএফকে তাড়ি য়ে দিতে পেরেছিল। পদুয়া ও রৌমারীর ঘটনায় যথাক্রমে ১৫ ও ১৫০ জন বিএসএফ জওয়ান নিহত হয়েছিল। রৌমারীতে ১২৮ টি মৃতদেহ স্থানীয় বিএসএফের কাছে হস্তান্তও করা হয়’ অবশিষ্ট ২২ টি মৃতদেহ ঢাকা থেকে ফেরৎ প্রদান করা হয় যা টিভি ক্যামেরায় পরিষ্কাররূপে দৃশ্য প্রদর্শন করা হয়েছে। এখনো ইটিভির সুপন রায়ের উপস্থাপনা মনে আছে।
এ সকল মোকাবেলায় বিডিআর জওয়ানদের তৎপরতার পার্থক্য হচ্ছে যে সেনা কর্মকর্তাদেও কমান্ড ছাড়া আমাদের আধা-সামরিক বাহিনী আমাদের সীমান্ত রক্ষায় পারঙ্গম নয়, বিদেশী অনুপ্রবেশকারীদের নিকট থেকে যেমন। এমন নয় যে বিডিআর জওয়ানদের সাহসের কোন ঘাটতি রয়েছে। তবে কমান্ডিং অফিসারদের নির্দেশে আক্রমণ সংগঠিত করার কৌশল ও দক্ষতা রয়েছে তাছাড়া যুদ্ধকে।সত্রের নেতৃত্বেও একটি বিষয় রয়েছে । বেসামরিক কর্মকর্তাদেও নিকট থেকে তার প্রত্যাশা বাতুলতা ছাড়া কিছু নয়। এ প্রস্তাবের অসারতা বুঝতে স্বীকার করতে অন্য একটি ঘটনা বিবেচনা করতে হবে। আমাদেও সীমান্তে যদি কোন সংগঠিত আক্রমণের আশঙ্কা ব্যতিরেকে কোন সামর্থ ছাড়াই তারা দাড়াতে পারত, তারা আনসার বাহিনীর হত যা আমাদের ইতোমধ্যেই রয়েছে। তাহলে কেন আনসারদেরকে সীমান্ত রক্ষায় নিয়োগ করা হচ্ছে না? সেনাকর্মকর্তাদের কমান্ড ছাড়া আনসার বাহিনী্ তার যথাযোগ্য কিন্তু দেশদ্রোহী বিশ্বাসঘাতকরা প্রকাশ্যে তেমন প্রস্তাব দেবে না; কারন তাতে তাদের চক্রান্ত ফাঁস হয়ে যাবে। এমনকি আমাদেও দেশের যারা দূরহ ইসু্যতে আগ্রহী নয়; তারাও এমন প্রস্তাবকে চরম ধোঁকাবাজি বলেই গণ্য করবে বস্তুত: আমাদেও ঘুমন্ত জাতিকে সুখ নিদ্রায় বিভোর রাখার জন্যে দেশদ্রোহী বিশ্বাসঘাতকরা তদেও বিদেশী প্রভূদেও সহায়তায় আনসার এর মত একটি দন্ত বিহীন অনুজীব বাহিনী আমাদেও সীমান্ত রক্ষায় নিয়োজিত করার অপচেষ্টা চালায়। আমাদের নূতন বিডিআরের ডিজির যুক্তি অনুসরণ করলে তা বিদ্রোহীদেও সকল কুকীর্তি মুছে যায়।
এখানে জিজ্ঞাস্য হচ্ছে: কেন র’ বাংলাদেশকে একটি দন্তহীন সীমান্ত রক্ষী বাহিনী হিসাবে পেতে চায়? তাদের হীন উদ্দেশ্য একটি নয়, একাধিক। ২০০১ সালের পদুয়া ও রৌমারীর মত অনেক ঘটনায় সেরকম উদ্দেশ্য বা মতলব দেখা যায়। সিলেট সীমান্তের ৫০০ একর আয়তনবিশিষ্ট পদুয়া ১৯৭১ সালে ভারতীয় সেনাবাহিনী কর্তৃক মুক্তিবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ ক্যাম্প হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছিল। যুদ্ধ শেষ হলে মুক্তিবাহিনী চলে গেলে ক্যাম্প খালি হলে পরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর নিকট থেকে বিএসএফ তার দখল নেয় এবং তাদের দখলে রাখে। অনেকবার পতাকা বৈঠকে বিএসএফ তা ফেরৎ দেবার কথা বলেছে তবে বরাবরের মতই তারা তাদের কথা রাখেনি। ২০০১ সালে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও মুক্তিযোদ্ধা বিডিআরের ডিজি মেজর জেনারেল ফজলুর রহমান আমাদের স্থানীয় বিডিআরের কমান্ডারকে পদুয়া থেকে বিএসএফকে বিতাড়নের নির্দেশ দেন। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের সাথে আলোচনাক্রমেই তিনি এ নির্দেশ দিয়েছিলেন।
বিডিআরের ডিজির পরিকল্পনা অনুমোদনের পূর্বে নাসিম প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে আলোচনা করেন। তিনি এ বিষয়ে কিছু না বলে আসন্ন সাধারণ নির্বাচনের বিষয়ে কথা বলেন। তার অবিরোধিতাকে নাসিম তার অনুমোদেনের সম্মতি হিসাবে বিবেচনা করে ফজলুর রহমানকে অগ্রসর হতে বলেন। সে অনুসারে চাপ প্রয়োগে পদুয়া থেকে বিএসএফকে বিতাড়নে করা হয়েছিল এবং তাদের জীবিত ও মৃত সৈন্যদেরকে ফেরৎ প্রদান করা হয়েছিল। তাদের অবৈধ দখল পুনরুদ্ধারের পরিবর্তে কিছুদিন পরে বিএসএফ বিপুল সৈন্য ও অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে রৌমারী আক্রমণ করে। ভারতীয় সামরিক শক্তির বিস্ময়ে হতবাক করে আক্রমণকারীরা পুরোপুরি পরাস্ত হয়। প্রতি আক্রমণে সিও সংগঠিত করেন এবং বিএসএফ কর্মকর্তাদেও হতবাক করেন। স্থানীয় জনগণ বর্ষা ও অস্ত্র নিয়ে অনেক পলায়নপর অনুপ্রবেশকারীকে খুুন করেছিল। আগেই যেমন বলেছি রৌমারীতে তারা ১৫০ জনকে হারায় যেখানে পদুয়ায় ১৫ জন মারা পড়ে। ভারতের এই শিক।ষাটি বেশ পরিষ্কার ছিল। সেনা কর্মকর্তাদেও কমান্ডে বিডিআর জওয়ানদেও পুশওভার করা যাবে না কাজেই দুর্বল করতে হবে।
আশ্চর্যেরও বিষয় ছিল যে, চরম আত্মত্যাগের জন্য যাদেরকে সম্মানের পরিবর্তে তাদের ডিজি আমাদের দেশের সীমান্তেও কথা ভাবছেন। তখন আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার ভারতীয় প্রতিপক্ষকে টেলিফোন করে দুঃখ প্রকাশ ও পদুয়া ফেরৎ দেবার কথা বলেন, আইনানুগভাবে কোন নির্বাহীই যা পারেন না। তাছাড়া, তিনি বিডিআর কমান্ড থেকে ফজলুর রহমানকে প্রত্যাহার করে বিডিআরের অপারেশনের জিএসও ১ লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেজানুর বর্তমানে র্যাবের কর্নেল ও ডিজি কে রৌমারি অপারেশনের কর্মকর্তাদের বহিষ্কারের নির্দেশ দেন। এটাই কি দেশের সীমান্ত রক।ষায় যথাযোগ্য দায়িত্ব পালনকারী সেনা কর্মর্তার পুরস্কার, যার জন্য তারা কমিশনের সামনে শপথ গ্রহণ করেছিলেন?
Search
Recent Posts
উইকিলিকসের তথ্য: সেনা তদন্ত দলের প্রস্তাব নাকচ করেন শেখ হাসিনা
ছবি কথা বলে শিরোনামে অনেকগুলো ছবি। প্রতি ছবিতে মন্তব্যসহ ….
ঘটনা বি ডি আর হত্যাকাণ্ড এবং কিছু তুলনা …
বিডিয়ার হত্যাকান্ডের পর কিছু স্ক্যান করা পেপার
বিডিআর বিদ্রোহ প্রসঙ্গে প্রধান রহস্যগুলো
Archives
November 2013
October 2013
Categories
BDR MUTINY
BDR MUTINY Highlights
Get involved
Twitter Feeds
@bdrmutiny November 5, 2013
bdrmutiny উইকিলিকসের তথ্য: সেনা তদন্ত দলের প্রস্তাব নাকচ করেন শেখ হাসিনা - http://t.co/tKyWInEgUC http://t.co/zRUaNE8ZFu
@bdrmutiny November 5, 2013
bdrmutiny Waiting for the Verdict : Saquib Rahman - http://t.co/gxXRbvTkq4 http://t.co/6jlGrBZrno
@bdrmutiny November 5, 2013
bdrmutiny MY RESPONSE IN RESPONSE TO COMMENTS ON MY ARTICLE ON BDR CARNAGE - http://t.co/0bRm74coka
@bdrmutiny November 5, 2013
bdrmutiny ছবি কথা বলে শিরোনামে অনেকগুলো ছবি। প্রতি ছবিতে মন্তব্যসহ …. - http://t.co/U4j4o0kFYU http://t.co/nXhiQZ5Z8y
@bdrmutiny November 5, 2013
bdrmutiny ঘটনা বি ডি আর হত্যাকাণ্ড এবং কিছু তুলনা … - http://t.co/jdnCq7mvrk http://t.co/uKvRMDTwff
77
এতে সদস্যতা:
পোস্টগুলি (Atom)







